কাজলী মাসিদের নেই রবী ঠাকুর…..

0
Sebika

সেবিকা দেবনাথ

সেবিকা দেবনাথ: কাজলী মাসি। বর্ষাকালে মামার বাড়ি যাওয়া-আসার সময় যার নৌকায় আর অন্যান্য সময় কাঁধে করে যে হরিপদ দাদু আমাকে ও আমার ভাই-বোনদের আনা-নেয়া করতো কাজলী মাসি তার একমাত্র মেয়ে। তার সাথে আমার বয়সের ব্যবধান খুব একটা ছিল না। মামা বাড়ি গেলে ওই ছিল আমার সব সময়ের সঙ্গী।

২৩ অক্টোবর কালী পূজায় মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। মামাদের মন্দিরে বেশ ঘটা করেই পূজা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের উপর ভরসা না থাকায় পূজা উপলক্ষে জেনারেটর আনা হয়েছিল। মন্দির থেকে বাড়ি পর্যন্ত সাজানো হয়েছিল আলো দিয়ে। তবুও যেন অমাবস্যার কালোর প্রাধান্যই ছিল বেশি। মন্দির থেকে দেখলাম মন্দিরের আঙ্গিনায় পাতা চেয়ারের পেছনের সারিতে হ্যাংলা-পাতলা গড়ন, মাথা ভর্তি কালো চুল গিজ গিজ করছে, এমন একজন বসে আছে। কোলে একটা বাচ্চা। চেহারাটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। তবে আমার মন বলছিল ওটা কাজলী মাসি হবে।

মামা বাড়ি যাবার পর থেকেই ওকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিল। প্রায় চার/ পাঁচ বছর হবে ওকে দেখি না। ওকে দেখতে অনেকটা ছুটেই গেলাম ওর কাছে। আমার ধারণা ঠিক ছিল। ওটা কাজলী মাসিই। তবে মাসি অনেক বদলে গেছে। আগে দেখা হলে যেমন জাপটে ধরতো, এবার তেমনটা হলো না। ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা সব সময়কার হাসিটা যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। মাসিকে দেখলে যে কেউ বুঝবে অমাবস্যার সবটুকু কালো বেশ গেড়েই বসেছে ওর জীবনে।

দাদু সর্বস্ব দিয়ে কাজলী মাসির বিয়ে দিলেও সেই বিয়েটা টেকেনি। বিয়ের ৬/৭ মাস পরই ওকে ফিরতে হয়েছে বাবার বাড়ি। সেই থেকে আর কোনদিন ওর শ্বশুর বাড়ি যাওয়া হয়নি। গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে যে কয়েকবার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিল ততবারই ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। মাসির শ্বশুর বাড়ির পক্ষে কারণও ছিল অনেক। কারণগুলো বারবারই আঙ্গুল তুলেছে কাজলী মাসির দিকে। চোহারা মায়ায় টইটুম্বুর হলে কি হবে, মেয়ে যে দেখতে কালো। যে মেয়ের মায়ের মাথায় গণ্ডগোল ছিল, যার মা জীবিত থাকতে সুযোগ পেলেই এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যেতো, মাইকিং করে কিংবা খুঁজে খুঁজে তাকে বাড়ি আনতে হতো এই দায়ওতো ওই মায়ের মেয়ের কাঁধেই বর্তায়।

শুধু কি তাই? যে মেয়ের বাবার বসত বাড়ি, বাড়ির আশেপাশে যৎসামান্য জমি আর ছোট্ট একটু ডোবা ছাড়া আর তেমন কিছুই নাই, এমন মেয়ের সরল মন বোঝার দায় কি কারোও পড়েছে? মেয়ে তো বিদ্যাধরীও না। বিদ্যার দৌঁড় তো কোন রকমে ক্লাস থ্রি, কি ফোর পর্যন্ত। আচার-ব্যবহার, মন-মানসিকতায় মেয়ে ভালো তাতে কি? এত খুঁত যে মেয়ের তাকে কি আর মেনে নেয়া যায়?

সাদা মনের কদর না পেলেও বাইরের কালোর জন্য তাচ্ছিল্ল্য মাসির কপালে ষোল আনাই জুটেছে। জুটবেই বা  না কেন? সবাইতো আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয় যে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কালো মেয়ের গুন খুঁজে বের করবে। কালো কেশ-কালো হরিণ চোখ এখনো গানের পংক্তিতেই ভালো লাগে। বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর।

বড় মামীর কাছে শুনলাম, ভোরে সংসারের সব কাজ কর্ম গুছিয়ে রেখে দুই হাতে দুইটা ব্যাগ নিয়ে কাজলী মাসি বের হয় গাঁওয়াল (ফেরি) করতে। এ পাড়া থেকে ওপাড়া, এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করে মেয়েদের সাজসজ্জার জিনিস। তিন বছরের মেয়েটাকে রেখে যায় হরিপদ দাদুর কাছে। ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা হরিপদ দাদু এখন বয়স আর নানান দুঃশ্চিন্তায় অনেকটাই যেন ছোট হয়ে গেছে। এক সময় প্রচণ্ড পরিশ্রমি এই মানুষটা এখন অল্পতেই হাঁপিয়ে যান। মনে হয় হাঁটতেও তার কষ্ট হয়। মাসির মেয়েটা আপন মনে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার দুষ্ট ছানা-পোনাগুলো ওকে মারলে মাটিতে বসে কান্না জুড়ে দেয়। নয়তো কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরে। সন্ধ্যায় মাসি যখন বাড়ি ফেরে মেয়েটা তখন বিবর্ণ এই জগৎ থেকে ঘুমের রাজ্যে। হয়তো কোন রঙিন স্বপ্ন দেখে। যেখানে হয়তো অনেক খেলনা, ভালো জামা, ওর সাথে সাথে মাকে-দাদুকে সুন্দর হয়ে থাকতেও দেখে।

আমি মাসিকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘মাসি চিনতে পারছস আমারে’? অনেকটা জোর করেই যেন মুখে হাসির রেখা ফোটানোর চেষ্টা করলো মাসি। বললো, ‘চিনছি। তুমি হ্যাপি মাসি’। ও কেমন আছে সেটা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তাই আর এই বাহুল্য প্রশ্নটা করতে ইচ্ছা করলো না।

মাসি বললো, ‘মাসি তুমি আগের মতোই আছো। একটুও বদলাও নাই’। আমার ইচ্ছা করছিল ওকে বলি, মাসি তুই অনেক বদলে গেছিস। কিন্তু বলতে পারলাম না। ও যে অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে কিংবা এখনও যাচ্ছে ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে যে কেউ বদলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। মেয়েটার গালে হাত দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এ তোর মেয়ে মাসি’? এক অক্ষরেই উত্তর দিলো, ‘হ’। আমি বললাম, ‘তোর মেয়ের চেহারাটা কি মিষ্টিরে মাসি’|

মাসি বাঁকা হাসলো। আমার মনে হলো মাসির এই হাসিটা ছিল তাচ্ছিল্যের। ও বললো, ‘আর মিষ্টি। হইছে তো মায়ের মতোই কাইল্লা। ভাইগ্যডাও না জানি মায়ের মতো হয়’| এর উত্তরে কি বলবো ভেবে পেলাম না। তবুও কিছু বলার জন্য আমি যেই মুখ হা করলাম, মাসি চট করে কথার প্রসঙ্গ পাল্টালো। বললো, ‘কিছু দিন থাকবানি’? আমার মুখ থেকে শুধু ‘হুম’ শব্দটা বের হলো। মাসিকে দেখে আর ওর কথা শুনে আমার চোখ জ্বালা করে উঠছিল। টের পাচ্ছিলাম শাসন করেও চোখের জলকে আমি আর আটকাতে পারবো না। মাসিকে দেখার জন্য যে অস্থিরতা আমার মধ্যে ছিল ওকে দেখার পর ওর কাছ থেকে পালানোর জন্যও মন অস্থির হয়ে উঠলো। আর মনে ঘুরছিলো অসংলগ্ন কিছু প্রশ্ন। কালো চুল, হরিণকালো চোখের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। তবে গায়ের রং কালো হলে এত সমস্যা কেন? কবি-সাহিত্যিকরা তাদের অনেক রচনায় ‘কালো মেয়ে’ ‘কালো মেঘের’ বন্দনা করেছেন। কালো বলে কি শ্রীকৃষ্ণ আর কালীর বন্দনা কেউ বন্ধ রেখেছে?

মনের কালিমায় ভরপুর আমরা সুযোগ পেলেই মানুষের বাহ্যিক কালোকে অবজ্ঞা করি। কালো মেয়ের মনোকষ্টকে পুঁজি করে বিশেষ বিশেষ কোম্পানি কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। আর এক কোম্পানি কালো মেয়েদের প্রতি একটু সদয় হয়ে সজীবতাকে প্রাধান্য দিলেও পুঁজি কিন্তু ওই একই।

কালো মেয়ের বিয়ে হয় না, ছেলেরা প্রেম করতে চায় না, যোগ্যতা থাকলেও ভালো চাকরি হয় না। অথচ বিশেষ বিশেষ কোম্পানির এটা-ওটা মেখে ফর্সা হলে সাফল্য এসে পায়ে লুটোপুটি খায়। আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত ও সচেতন বলে দাবি করি তারাও হামলে পরি ওসব কোম্পানির পণ্য কেনার জন্য। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম ওসব মেখে হয়তো বাইরের কালোকে সাদা করা যায়। কিন্তু মনের কালিমা? এমন কোন কোম্পানি কি আছে যার বিশেষ কোন পণ্য ব্যবহার করলে মনের কালিমা দূর হবে?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৫২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.