তসলিমাকে নিয়ে চুর্ণি গাঙ্গুলীর ‘নির্বাসিত’

Taslima
তসলিমা নাসরিন

উইমেন চ্যাপ্টার: এইসময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী চুর্ণি গাঙ্গুলীর অভিনয় থেকে ছবি পরিচালনায় একটা নতুন ব্রেক এনে দিয়েছে বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিতা তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে বানানো ছবি ‘নির্বাসিত’। চুর্ণি গাঙ্গুলীর নিজের জীবনের এই পরিবর্তনেও এটা বড়বেশি প্রয়োজন ছিল। ছবিটি করার পর তার মুখেই শুনি, ‘নির্বাসিত’ ছবিটি করার পর  তিনি আরও ছবি পরিচালনায় হাত দিবেন। আত্মবিশ্বাস আর সেইসাথে ‘নির্বাসিত’ ছবির মতোন এমন একটি কাহিনী তাঁকে সেই ভাবনাটি ভাবতে যতেষ্টই সাহায্য করছে।

তসলিমা নাসরিন এবং তার পোষা বিড়াল বাঘিনীকে নিয়ে নির্মিত ‘নির্বাসিত’ ছবিটির প্রিমিয়ার হয়ে গেল এই সপ্তাহেই ১৬ তম মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভালে (এমএমএফ)। সম্ভবত নভেম্বরে কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হবে ছবিটি। ছবিটিতে চুর্ণি গাঙ্গুলী নিজেই তসলিমার নাম চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি জানান, ছবিটি মুক্তির জন্য এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তারিখ ঠিক হয়নি।

অভিনেত্রী হিসেবে প্রচণ্ড সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী চুর্ণি গাঙ্গুলী নির্বাসিত ছবির পাণ্ডুলিপিতে হাত দেন ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। শেষ করেন ২০১৩ সালের এপ্রিলে। এই সময়টাকে তিনি ‘উদ্বেগ’ এর সময় বলে বর্ণনা করেন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন পাণ্ডুলিপিটি তসলিমা নাসরিনকে দেখানোর। তাঁর মতামত এবং অনুমোদনটা জরুরি মনে করেই চূর্ণি দিল্লি গিয়ে নির্বাসিত এই লেখিকার সাথে দেখা করেন। তসলিমা এটি অনুমোদনের পরই চুর্ণি  শুরু করেন ছবি শুটিংয়ের যাবতীয় পরিকল্পনা। কলকাতা এবং সুইডেনকে তিনি বেছে নেন শুটিং স্পট হিসেবে, যেখানে  ছবির মূল কাহিনী যাকে ঘিরে আবর্তিত সেই তসলিমার জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে।  ২০১৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ‘নির্বাসিত’ চলচ্চিত্র রূপ পায়।

পুরো ছবিটিতে একজন লেখকের একাকিত্ব এবং জোরপূর্বক বন্দী জীবন (যা কিনা তসলিমাকে বাধ্য করা হয়েছিল, যিনি গত ২০ বছর ধরেই দৌড়ের ওপরে আছেন), সেইসাথে লেখক এবং তার প্রিয় পোষা বিড়াল, যে তার অনেক বছরের সঙ্গী, তার সাথে বার বার বিচ্ছেদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ছবির লেখক এবং তার বিড়াল দুজনই যার যার জায়গায় বিদ্রোহী, দুজনেই নির্বাসিত। ছবিটিতে কিছু বিষয় স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে, তাহলো সহনশীলতা এবং ভালবাসার মতো মানবিক কিছু গুণাবলি। বিড়াল বাঘিনী তার মাকে (লেখককে) যেমন ‘মিস’ করে সবসময়, তেমনি লেখকও তাঁর মাতৃভূমি এবং নিজের মাকে ‘মিস’ করেন। পুরো মহাদেশজুড়েই তিনি খুঁজে বেড়ান এই দুটো ভালবাসাকে, ছোঁয়া পেতে চান। প্রতীকী ভাবটা লুকিয়ে আছে পুরো কাহিনীতেই।

চুর্ণি গাঙ্গুলী জানান, সীমানার বাইরে গিয়ে তসলিমা কিছু নতুন বন্ধু অবশ্যই পেয়ে যান। তবে নিজেই পরিচালক হয়ে মূল চরিত্রে অভিনয় করাটা কঠিনই ছিল বটে চূর্ণির জন্য। তিনি বলেন, আমি অনুভব করেছি আর ক্যামেরার সামনে তা দিয়ে গেছি। তাছাড়া আমি পাণ্ডুলিপিটি করার সময় যথেষ্ট সতর্ক ছিলান এবং চরিত্রটাও আমার ভাল জানা ছিল। আমার সহকর্মীরাও জানতো, আমি যখন অভিনয়ে মনোযোগী তখন তাদের কি করতে হবে।

পরিচালককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তসলিমার বিতর্কিত এবং নিষিদ্ধঘোষিত বইগুলোর বিষয়টা কিভাবে তিনি ম্যানেজ করেছেন? পাশাপাশি তিনি সম্পর্কের বিষয়টাই কিভাবে দেখিয়েছেন? চুর্ণি বলেন, ছবিটি আসলে জীবনী নয়। আমি চেষ্টা করেছি লেখকের কবিতার মধ্য দিয়ে তার লেখাগুলো তুলে ধরতে। পুরোটাই প্রতীকী। ছবির মিউজিকও খুবই সম্পর্কিত, পুরো আবহকেই প্রতিনিধিত্ব করে। তসলিমা নাসরিন হচ্ছেন সেইসব নারীর প্রতীক, যিনি সাহস রাখেন, যিনি তার বিশ্বাসের বিরোধিতাকে মেনে নিয়ে নিজের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে পিছপা হন না। ছবিতে যতটুকু সম্ভব বিতর্ককে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, বলছিলেন চুর্ণি।

তাহলে কিভাবে তিনি ছবির মধ্য দিয়ে নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরলেন? চুর্ণি জানান, পুরো ছবিতে রংয়ের বিচ্ছুরণ একটা গতি এনে দিয়েছে। ওপর-নিচ, নাটক, শান্তভাব, এ সবকিছুই চলচ্চিত্রের সাথে যায়, এভাবেই আবহকে, ভাবকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ছবিটির পরিচালক-প্রযোজক স্বামী কৌশিক গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় তৈরি, যিনি অনেকদিন ধরেই স্বপ্ন দেখছিলেন তসলিমাকে নিয়ে ছবি বানানোর।

তসলিমার জীবনে তার বিড়ালের একটা বিশাল ভূমিকা। পরিচাল সেটিই তুলে ধরেছেন তাঁর ছবিতে। কিন্তু একে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো কিভাবে? এর উত্তরে চুর্ণি বলেন, অনেকেই আমাকে কুকুর ব্যবহার করতে উপদেশ দিয়েছিল, যাকে সহজেই প্রশিক্ষণ দেয়া যাবে। কিন্তু মূল ধারণাই ছিল তসলিমার বিড়ালকে উপস্থাপন করা। কৌশিক তো ভয়ই পাচ্ছিল যে, বিড়ালটি যেকোনো সময় জানালা দিয়ে ঝাঁপ দেবে, আর তারপরই শুটিং শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি শেষপর্যন্ত।

ছবিটি এরই মধ্যে ফেস্টিভালে দর্শক প্রশংসা কুড়িয়েছে বেশ। তসলিমা নিজেও দেখেছেন ছবিটা এবং বলেছেন, ন্যায়বিচারই হয়েছে। চুর্ণি মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভাল কর্তৃপক্ষকে ছবিটি দেখানোর জন্যে কৃতজ্ঞতা জানান। প্রতিক্রিয়াও ছিল বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। ভেবেছিলাম, ছবিটি বয়সী নারীরা হয়তো বেশি পছন্দ করবেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী মেয়েরা এটাকে ভালভাবে নিয়েছে। ছবিটিকে চূর্ণি ছাড়াও অভিনয় করেছেন শ্বাশ্বত চ্যাটার্জি, রাইমা সেন প্রমুখ। চুর্ণি বলেন, আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে কলকাতার টপ অভিনেতারা রাজী হয়েছেন এতে কাজ করতে। তাহলে কি অভিনয় ছেড়ে দিয়ে এখন পরিচালনাতেই নাম লেখাচ্ছেন চুর্ণি? না, হেসে দিয়ে বলেন, সঠিক চরিত্রটার জন্যে অপেক্ষা করছি।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.