ঘৃণার গহীনে বসবাস

Farhana Rahman
ফারহানা রহমান

ফারহানা রহমান: বেলা ১২ টায় হোটেলে চেক আউট করে দিল্লী রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম। সেভ দ্য চিলড্রেন এর “লেট চিলড্রেন স্পিক” নামক প্রজেক্টের আমি অ্যাডভোকেসি অফিসার আর সাহানা অ্যাসিস্টেন্ট অ্যাডভোকেসি অফিসার। আমরা দুজন এসেছি দিল্লীতে সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল কো-অপারেশন কনফারেন্স এ যোগ দিতে। চোখের নিমিষে কি করে সাত দিন কেটে গেল?

বিকেল পাঁচটায় রাজধানী এক্সপ্রেস এসে পৌঁছাবে। লকারে জিনিসপত্র রেখে আমি আর সাহানা ম্যাকডোনাল্ডসে গিয়ে ভেজিটেবল বার্গার দিয়ে লাঞ্চ করলাম। ইন্ডিয়া আসার পর থেকে ভেজ আর ননভেজ এর পাল্লায় পড়ে আমরা ভেজ হওয়ার চেষ্টাতেই আছি। ২.৩০ মিনিটের মধ্যেই স্টেশনে ফিরলাম। কিছুক্ষণ ঘরাঘুরি করে শিব খেরার ‘ ইউ কেন উইন’ বইটা কিনে পড়ার জন্য বসার  উপযুক্ত একটা বেঞ্চ খুঁজছি।

এমন সময় দেখলাম ফেইড জিন্স আর ওশান ব্লু শার্ট পরা বেশ স্মার্ট এককথায় সুন্দরী এক মেয়ে বসে বসে অরহান পামুকের ‘মাই নেম ইস রেড’ বইটি পড়ছে।

এক্সকিউজ মি, মে আই সিট হেয়ার?

ওহ! শিওর।

আমার দিকে তাকিয়েই মেয়েটি একটু যেন চমকিয়ে উঠল মনে হয়। পরক্ষণেই হেসে বলল।

আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?

হা হা হা, কি করে বুঝলেন?

একথার কোন উত্তর পেলাম না। বললাম-

হুম। বুঝতে পারছি না, সবাই কি করে বুঝে ফেলছে যে আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

আপনি কি কলকাতা তে থাকেন?

নাহ। আমি ব্যাঙ্গালুরুতে থাকি। আমি কম্পিউটার ইঙ্গিনিয়ার। বাগ্মেন টেকপার্কে কাজ করি। একটা কাজে কলকাতায় যাচ্ছি।

জাহ্নবীর সাথে এভাবেই আমার পরিচয় ,আর একসময় তা গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়। রেল স্টেশনে আড়াই ঘণ্টা আর এরপর রাজধানী এক্সপ্রেসে আরও আঠারো ঘণ্টায় আমরা যেন এক জীবনের সব গল্পই বলে ফেললাম।

জাহ্নবীকে একবাক্যেই অপরূপা সুন্দরী বলা যায়, অন্তত আমার চোখে তাই মনে হয়েছিল। বম্বের নায়িকা টাবুর সাথে কোথায় যেন খুব মিল আছে। বেশ লম্বা-ফর্সা আর ছিপছিপে গড়নের মেয়েটির সবুজ চোখে কোথায় যেন ভীষণ কষ্টের ছায়া লুকানো ছিল, যা আমাকে আজো ওর কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। নানা কালারের শেড করা চুলগুলো পনিটেল করে বাঁধা। শার্টের উপরের দিকটার খোলা চার বোতামের ফাঁক দিয়ে ওর বাস্ট লাইন স্পষ্ট ভেসে উঠছিল দেখে আমি অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। ওর ডেস্পারেট আচরণ দেখে বেশ অবাক হই। মনে মনে ভাবি ইন্ডিয়ার মেয়েরা সত্যি বেশ এডভান্স। অন্তত পোশাক-আশাকে।

কিন্তু কথা বলে বুঝতে পারি মানুষ হিসাবে মেয়েটা অসাধারণ। অনেক অনেক কথা হয় ওর সাথে। ওর শৈশবের কথা, কিশোর বয়সে হোস্টেল জীবনের গল্প। ইঙ্গিনিয়ারিং পড়তে অ্যামেরিকা যাওয়ার গল্প। পথের গতি মানুষকে অনুভূতি প্রবণ করে তোলে। সেইজন্যই বোধহয় ও ম্যারেড কিনা এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে গিয়েই নিজের জীবনের সবচেয়ে গোপন কোথাগুলো ও আমার সাথে শেয়ার করতে দ্বিধা করে না।

আমার গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে কিছুদিন আগে ব্রেক আপ হয়ে গেছে।

বয়ফ্রেন্ড কোথায় আছে এখন? কি করতো? আমি ভাবলাম ট্রেনের ভিতর আছি, তাই নিশ্চয়ই শুনতে ভুল করেছি। আমি লেসবিয়ান। আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যই আমি ইন্ডিয়াতে ফিরে এসেছিলাম।

এরপর ওর জীবনের যেসব কথা ও আমাকে বলল সেকথাগুলো শোনার জন্য আমি অন্তত প্রস্তুত ছিলাম না। জাহ্নবী বাবা-মার একমাত্র সন্তান। মা সরকারী সায়েন্টিফিক অফিসার, বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। মার পোস্টিং এর চাকরি, খুব ব্যস্ত থাকতে হত।

বাবার কাছেই জাহ্নবীর বেড়ে ওঠা। বাবার চোখের মণি ছিল ও। আদর ভালবাসা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। সেই ভালবাসাই একদিন দৈহিক ভালবাসায় পরিণত হয়। ছোটবেলা থেকেই ওর বাবা ওকে কাছে নিয়ে ঘুমাত। ঘুমের মধ্যে বাবার হাত যত্রতত্র গোপন স্থানে ঘুরে বেড়াতো বলে ও  ভাবত এটাই বোধহয় আদরের নিয়ম। এভাবেই বোধ হয় বাবারা আদর করে। ক্লাস থ্রিতে ওঠার পর ও হোস্টেলে চলে যায়। ছুটির সময় বাসায় এলেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত। এভাবে চলতে থাকলো কয়েক বছর। ক্লাস সিক্সে পিরিয়ড হওয়ার পর যেবার ও   বাসায় আসলো সেবার থেকেই ওর বাবা ওর সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, আর এভাবেই আরও কয়েক বছর কেটে গেল।

নানা কারণেই মার সাথে একটা দূরত্ব গড়ে উঠেছিল ওর, আর তাই মাকে কখনই বলা হয়নি এসব কথা । তারপর কোন একসময় প্রিয় বান্ধবী নিকিতাকে ও ব্যাপারটা শেয়ার করে আর তখনই বান্ধবীর চরম রিঅ্যাকশনে ও প্রথম অনুধাবন করতে পারে বিষয়টির অবৈধতা আর অস্বাভাবিকতা। আর তখন  থেকেই পুরুষ জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রায় মনে হয় ও যেন এক নিরর্থক জীবনকে শুধু টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যত দিন গড়াচ্ছে এই ঘৃণা গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

পুরুষ মানুষ দেখলেই মনে হয়ে যায় বাবার  ঘৃণিত কার্যকলাপের কথা। কিছুতেই ও আর কোন পুরুষকেই স্বাভাবিক মানুষ ভাবতে পারে না। ক্যান্সারের রোগী ছিল জাহ্নবীর মা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাকে কথাগুলো ও বলতে পারেনি। তবে মায়ের বিষণ্ণ দুঃখী আর গভীর দৃষ্টি দেখেই বোঝা যেত, তিনি হয়ত সবই বুঝতে পেরেছিলেন। মায়ের একান্ত ইচ্ছে আর উদ্যোগে একসময় জাহ্নবী বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যায়।

মা বারবার অনুরোধ করতো যেন ও কখনো দেশে ফিরে না আসে। মাঝে দুবছর বান্ধবীর জন্যই এদেশে থাকা। তবে আবারও অচিরেই দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে ও। আর সেই বাবা নামক ঘৃণিত নরপশুটা কোথায় আছে সেটা ও আর কখনই জানতে চায় না। তবে শুনেছে, লোকটা আবারো বিয়ে করে নতুন সংসার পেতে বসেছে কোথাও।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.