সাংবাদিকতা পেশায় ‘বায়োডাটা’র গুরুত্ব কতটা?

Terrorismস্নিগ্ধা রহমান: সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সিভি বা বায়োডাটার গুরুত্ব আসলে কতটা? আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি? কোনো গণমাধ্যমে চাকরির জন্য গেলেই বলা হয়, সিভিটা রেখে যান, আমরা দেখবো। বা এটাও বলে যে, অ্যাপ্লাই করেন। আমরা বেছে নিয়ে তারপর ‘সুযোগ্য‘ মনে হলে অবশ্যই ‘পরীক্ষা’ দিতে ডাকবো। তো, সেই ডাকা আসলে কেমন ডাকা? কিভাবে ডাকা হয়? কত রূপে ডাকা হয়?

আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে সবারই কম-বেশি অভিজ্ঞতা আছে। বন্ধুরা বলে, ‘তুমি অ্যাপ্লাই কর নাই কেন? অ্যাপ্লাই করলেই তো হইতো! আমি হেসে বলি, অ্যাপ্লাই করলেই হইতো না বইলাই কাগজ নষ্ট করি নাই। অতীত অভিজ্ঞতা আমাকে এরকম একটা ধারণাই দেয়। বন্ধুরা বোকার মতোন তাকিয়ে থাকে।

বেশ কয়েক বছর আগে একটা টিভি চ্যানেলে সিভি জমা দিয়েছিলেন আমাদেরই পরিচিত এক বড় বোন। তাকে বার বার বলা হচ্ছিল সিভি হারিয়ে গেছে, আবার দিন। এই করে করে মোট তিনবার তিনি সিভি দিয়ে এসেছিলেন বাসে এক ঘন্টা জার্নি করে গিয়ে। চাকরিটা তার খুবই দরকার ছিল তখন। শেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, তিন-তিনবার ইন্টারভিউ দিয়ে যখন চাকরিটা হয়েছিল সেই আপু তারই সিভি ওই ভবনের বিভিন্ন তলায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। কুড়িয়ে কুড়িয়ে নিয়ে রেখে দিয়েছিলেন তিনি, নিজের সিভি বলে কথা। কিন্তু তিনি এটাও দেখেছেন যে, ওই চ্যানেলের একটি রুমে সিভির স্তুপ পড়া ছিল, কেউ তা খুলেও দেখেনি। যতজনের চাকরি হয়েছিল, এমনিই হয়েছিল, সিভি দেখে নয়, বলেছিলেন ওই আপু।

সবার চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর আরেক দফা সিভি নেয়া হয়েছিল অফিসের রেকর্ড রাখার জন্য। ওটা ওই আপুর ছিল চতুর্থবারের মতো দেয়া। তবে সিভি চাওয়া কেন? শুধুমাত্র লৌকিকতা রক্ষায়?

একটা অনলাইনের সম্পাদক একবার বলেছিলেন, উনার জানামতে, একটা আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি হতো ওই সংস্থার সম্পাদকের নিজের ইচ্ছায়, তার পছন্দমতো। যতোই পরীক্ষার আয়োজন করা হোক না কেন, সেইসব সিভি নাকি টেবিলের তলায় পড়ে থাকতো। লোক দেখানো পরীক্ষা শেষে সম্পাদকের পছন্দের প্রার্থীরাই ‘শর্ট-লিস্টেড’ হতো, এবং চাকরি পেত বিশেষভাবে ‘লিস্টেড’ ছিল যে দু’একজন, তারাই। কাজেই ওখানে চাকরি করার স্বপ্ন দেখতে বারণ করেছিলেন তিনি।

পত্রিকা থেকে একযোগে পদত্যাগের ঘটনা সাম্প্রতিকই বলা চলে। সেইসব পদত্যাগকারীর কেউ কেউ আগের পত্রিকায় ফিরে আসতে সক্ষম হলেও অধিকাংশই পারেননি। সহকর্মীদের বিরোধিতার মুখেই তা সম্ভব হয়নি। একবার একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে সহকর্মীদের কেউ কেউ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, তার কাজ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই, খুবই ভাল কাজ করেন, কিন্তু আমরা চাই না উনি আসুক’। ব্যস, সেখানে চাকরি বন্ধ।

সহকর্মীদের বিরোধিতার মুখে অনেক জায়গায় অনেক সুযোগ্য সাংবাদিকও চাকরি পান না। একটা টিভি চ্যানেলের বড় দুজন হন্তাকর্তার সুপারিশেও চাকরি হয়নি একজনের। সহকর্মীদের স্পষ্ট উত্তর ছিল, ‘নিউজরুমে তিনি ভুল ধরেন কেবল’। তার মানে কেউ ভুল করলে সেটা শোধরানোও অন্যায় হয়ে যায় কারও কারও ক্ষেত্রে। বিষয়টা আসলে ভুল ধরানোতে না, বিষয়টা কোনো নারী সাংবাদিকের কাছে কিছু শিখতে না চাওয়ার মানসিকতা। এক্ষেত্রে পুরুষ সাংবাদিক যদি আচরণে ‘একনায়ক’ও হন, চিৎকার-চেঁচামেচি করে নিউজরুম মাথায় তুললেও তার চাকরির অভাব হয় না। সমস্যাটা নারী-পুরুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

একজন সম্পাদককে প্রায়ই আক্ষেপ করতে শুনেছি, ‘অমুক’ অ্যাপ্লাই করে না ক্যান! সেই ‘অমুক’কে পরে একটা অনুষ্ঠানে দেখা যাওয়ার পরপরই ‘অমুকের’ চাকরি নিশ্চিতের খবর পাওয়া যায়। সেই ‘অমুক’ আদতে মূল সাংবাদিকতার সাথে ছিলোই না কখনও, কিন্তু চাকরি তার হয়।

চাকরি হয় আরও অনেকেরই। শুধুমাত্র বিদেশে ডেস্কে চাকরি করে এসে দেশের একটা টিভি চ্যানেলে সরাসরি বার্তা সম্পাদক হতে পারে ‘পুরুষ সাংবাদিক’ বলেই। অথচ দেশে এতো বছর অভিজ্ঞতার পরও একজন ‘নারী সাংবাদিকের’ কপালে প্রমোশন জোটে না। বায়োডাটা সমৃদ্ধ হলেও। সেই পুরুষ বার্তা সম্পাদককে হাতে-কলমে শিখিয়ে-পরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কিন্তু পরে প্রমোশন না পাওয়া নারী সাংবাদিকেরই। ভাগ্য একেই বলে!

এসব অভিজ্ঞতার কথা লিখে শেষ করা যাবে না। উপন্যাস হয়ে যাবে। কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। লোক নেয়া হবে একটি প্রতিষ্ঠানে। ঘোষণাটি শোনামাত্রই বুঝতে পারি, সেখানে কাকে নেয়া হবে। কেন এই ঘোষণা? তাহলে ঘটা করে সবাইকে সম্পৃক্ত করে, সবার পরীক্ষা নিয়ে সেই বিশেষ ‘একজনকে’ নেয়া কেন? একেবারেই সাংবাদিক না, কোনদিন ভুলেও সাংবাদিকতা করেনি, এমন একজনকে শুধুমাত্র পছন্দ থেকেই বাছাই করা হলো একজনকে। যার বেতন ধরা হলো বাজার মূল্যের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু কেন? তার কী আছে, যা অন্য কোনো সাংবাদিকের নেই? প্রতিনিয়ত তাকে শেখানো, লোকজন চেনানো, নিউজের মূল ফোকাস ধরিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে সবই করে দিতে হচ্ছে। তাহলেও নিতে হলো তাকে?

প্রশ্নগুলো মাথায় খেলে কেবল, উত্তর মেলে না। গণমাধ্যমগুলোতে এখন যারা নিয়োগদাতার ভূমিকায়, তাদের কাছে গেলে কার কার চাকরি হবে, আর কার কার হবে না, তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়।

আমাদেরই পুরনো এক বন্ধু সাংবাদিক বলেছিল, ‘পুরুষরা মেয়েদের সেই পরিমাণ ক্ষমতায়নই চায়, যতদিন তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারবে, বড় হও দিদিভাই। কিন্তু দিদিভাইয়ের মাথাটা হাত গলিয়ে বেরিয়ে গেলেই চারদিক থেকে শত হাত এসে গলা চেপে ধরবে, আর বাড়তে দেবে না, কিভাবে টুটি চেপে ধরা যায়, তার সবরকম বন্দোবস্ত করে রাখা হয়েছে মিডিয়া জগতে’।

আর ভোকাল হলে তো ষোলকলাই পূর্ণ। মুখরা রমণী বশীকরণে এখন আর কেউ পরীক্ষা দিতে চায় না, সেই মুখরা হাজার গুণ ভালো সাংবাদিক হলেও। তার চেয়ে নিরীহ, নির্জীব, কচি মেয়ে সাংবাদিকেরাই উত্তম, কাউকে সে ছোবলও দেবে না, কাটবেও না। আর বড় হতে হতেও ঢের সময় লেগে যাবে, ততদিনে কোথাকার জল কতদিকে গড়াবে, তার শেষ আছে? কাজেই বায়োডাটা তাদের চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যাদের চাকরি নিশ্চিত। সেটা চাকরিদাতারা যেমন জানেন, চাকরিপ্রার্থীরাও বুঝে ফেলেন। বোঝে না মধ্যবর্তী কিছু গাধা-গর্দভরা।

 

শেয়ার করুন:
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.