সোভিয়েত নারীর দেশে-২২

peter 2সুপ্রীতি ধর:  ছোটবেলা থেকে দেখতাম কারও কোন অসুখ হলে বা অপারেশনের কথা থাকলে সে এমনিতেই আধমরা হয়ে থাকতো,  আর বাড়ির সবাই তাকে নিয়ে মেতে থাকতো। আমিও কম মনোযোগ পাইনি জন্ম থেকে, তাছাড়া বাসার সবার ছোট বলে মনোযোগটা একটু বেশিই পেতাম মনে হয়। অসুখ হলে তো সোনায় সোহাগা। আমার উদয়াস্ত চাকরিজীবী মায়ের রাতের ঘুমটা হারাম করে ছাড়তাম। মা কিন্তু হাসিমুখেই জেগে থাকতো, আবার পরদিন ওই না-ঘুমা মানুষটাই অফিসে ছুটতো। এতোটুকু উপেক্ষা বা অভিযোগ ছিল না মায়ের। অথচ আজকাল আমরা মায়েরা কত অল্পতেই ছেলেমেয়েদের কাছে অভিযোগ করি।

ছোটবেলায় পর পর দুবছর কুকুরের কামড় খাওয়ার পর পরিবারে আমার আহ্লাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। সেই মানুষটিই রাশিয়ার জীবনে এসে যখন মাত্র ২১ বছর বয়সে অপারেশন টেবিলে গেলাম, মা আমার জানতেই পারলো না। চাইনি অযথা চিন্তায় ফেলতে। তাছাড়া ওই দেশটার চিকিৎসা নিয়ে তো কোনো সন্দেহ ছিল না। আমার মারা যাওয়ার কোনো আশংকা কোথাও ছিল না বলেই একা একা অপারেশন টেবিলে চলে গিয়েছিলাম।

বিহারের মেয়ে ডা. নীলম তখন ডাক্তারি পাশ করে ইন্টার্নশিপ করছে গাইনিতে। সেই আমাকে নিয়ে গেছিল ৬৯ বছর বয়সী একজন ডাক্তারের কাছে। উনিই অপারেশন করলেন। মাথার পাশে সার্বক্ষণিক সহযোগী হিসেবে রইলো নীলম, আমি নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করি এক, দুই, তিন গুনতে গুনতে। জ্ঞান যখন ফিরে আসছে, আবছা কানে আসে কেউ বলছে আমায়, ‘লিপিচকা, আঁখ খোলো, আঁখ খোলো’। মুখের ওপর ঝুঁকে আছে একটি প্রশান্তিময় মুখ, নীলম। মনটা জুড়িয়ে যায়। এই প্রবাস জীবনে এগুলোই তো হিসাবের খাতায় জমা হওয়া আমার অমূল্য সব স্মৃতি।

পোস্ট অপারেটিভ রুমে রেখে আসা হয় আমাকে, তখনও পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি। আরও কিছু প্রিয় মুখ দেখতে পাই দরজার কাছে। রাশিয়ায় কড়া নিয়ম হাসপাতালে প্রবেশের ব্যাপারে। ডাক্তারির ছাত্র বলে পল্লব অ্যাপ্রোন পরে চলে এসেছে। দূর থেকে দেখে চলে যায় সে, একটা স্নেহের স্পর্শ অনুভব করি ওই দেখাতেই। কিন্তু পরক্ষণেই রাজ্যের ঘুম নেসে আসে চোখে। তলিয়ে যাই অতলে।

১৯৯০ সালের ২০ এপ্রিল আমার ওভারির সিস্ট অপারেশন হয়, একটা ওভারি কেটে ফেলে দেয়া হয়। তখনও বিয়ে হয়নি, বাচ্চা হয়নি বলে আরেকটাতে ইনফেকশান থাকার পরও ডাক্তাররা তা ফেলেন না। জানি না সেটা ভাল করেছিলেন ডাক্তার, না খারাপ করেছিলেন। একটা ওভারি নিয়ে দু’দুটো সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু ওদের যোগ্য মা হয়ে উঠতে পারিনি। ওদেরকে শুধু শুধু কষ্ট দেয়া হলো।  মাঝে মাঝে মনে হয়,  শুধু  শুধুই সংসার সংসার খেলতে গিয়ে না হলো সংসার, না হলাম মা।

যাকগে, রক্ত নেগেটিভ হওয়ায় যেকোনো অপারেশনের পরেই জটিলতা তৈরি হয়। প্রচণ্ড জেঁকে জ্বর এলো আমার। সেইসাথে কাশি। পেটের সেলাই ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। টানা পাঁচদিন ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানোর পর ছয়দিনের মাথায় বন্ধ করে দেয়া হয়। মধ্যরাতে অস্থির-ছটফট করা আমি নার্সের কাছে অনেক অনুরোধ করে চেয়ে নিলাম সেই ইনজেকশনটা।

তখনই অনুভব হলো, মানুষ কিভাবে নেশাসক্ত হয়! মাত্র পাঁচদিনেই যা-তা অবস্থা আমার। এর মাঝে একদিন রক্তচাপও নেমে গেলো অস্বাভাবিকভাবে। ডাক্তাররা রীতিমতো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু না, কিছু হয়নি শেষতক। আটদিন পর কানাকড়ি পয়সা খরচ না করেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম ফুরফুরে হাওয়ায়। জয় সমাজতন্ত্রের জয়।  পড়াশোনায় পয়সা লাগে না, চিকিৎসায় পয়সা লাগে না। শুধুমাত্র খাওয়া-পরা। তাও যদি আমাদের অনেকের মতোন চাহিদা কম হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। দেশে ফেরার পর এখানে থেকে বুঝতে পারি, কেন আমাদের মধ্যে এমন বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতা, কেনই বা দুর্নীতি! সীমাহীন চাহিদাই এর কারণ,যা সমাজতান্ত্রিক দেশটাতে থাকার সময় আমাদের মাঝে ছিল না।

বাতাসে তখন বাড়ি যাওয়ার আনন্দ। সেই গ্রীষ্মে হাওয়াই থেকে আসছে দাদা-বৌদি, সঙ্গে অদেখা ভাতিজা। আমারও তখন দেশে ফেরার কথা। চার বছর পর আবার সবার দেখা হবে। সেই আনন্দেই তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা দিয়ে রওনা দিই। এটুকু লিখেই মনটা থমকে গেল আমার। আর কিছু কি লিখবো সোভিয়েত জীবন নিয়ে? নাকি এখানেই শেষ করবো? আমার আনন্দের জীবনের ইতি টানা হয়ে গিয়েছিল ওই গ্রীষ্মেই। এরপরও রাশিয়ায় ছিলাম আমি আরও প্রায় ছয় বছর। সে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অন্যরকম জীবন। বাঁচা-মরা, হাসি-কান্নার জীবন।

ওইবছর দেশে না গেলে হয়তো আমার আজকের এই লেখাটি অন্যরকম হতো, হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতো, হয়তো আমি অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে আজ থাকতাম। সবই ‘হয়তো’, নিশ্চিত আর অনিশ্চিতের দোলাচলে আমার জীবন বয়ে যায়। তাইতো এখন যখন একটুও সুযোগ পাই আমার সোভিয়েত জীবনের স্বাদ নিতে, দ্বিধা করি না, লুফে নেই। এ আমার অনেক না পাওয়ার মাঝে পরম পাওয়া।

অনেকেই ভেবে থাকেন আমাদের সোভিয়েত জীবন মানেই ভদকাময় জীবন। জানি না তারা কাদের সাথে মিশেছেন, কাদের কাছ থেকে পেয়েছেন এই তথ্য। আমরা যারা সমাজতন্ত্রের ওপর আস্থা রেখে পাড়ি জমিয়েছিলাম  দেশটিতে, যাদের একটা পারিবারিক ঐতিহ্যের ইতিহাস ছিল, তারা পড়াশোনাকেই শির:ধার্য করে নিয়েছিলাম। আমরা জানতাম, এই এক পড়াশোনাই আমাদের ভবিষ্যত পাথেয়। তাই তো আমাদের আড্ডা ছিল নির্জলা সরল এক আড্ডা। রান্না-বান্না, একসাথে খাওয়া আর গান-বাজনা নিয়েই আমরা মেতে থাকতাম সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে। বাকি দিনগুলো কাটতো  লাইব্রেরিতে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে। এছাড়া সুন্দর দেশটার প্রতিটা কণা আমরা উপভোগ করেছি। বাদ দেইনি কোথাও। আমাদের সময় কোথায় ছিল সময় নষ্ট করার?

তবে হ্যাঁ, আমাদের ভিতরেরই একটি গ্রুপ ছিল, যাদের হাতে হঠাৎই চলে এসেছিল অনেক অনেক পরিমাণ কাঁচা টাকা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাদের জীবনটাতে অন্য মোড় টেনে দিয়েছিল। সেখানে মদ ও নারীর অনুপ্রবেশ ঘটে খুবই স্বাভাবিক নিয়মেই। আর বেরুতে পারে না। টাকায় কী না হয়!  সেই গ্রুপটার সাথে আমাদের না ছিল যোগাযোগ, না ছিল আন্তরিকতা, দেখলে বরং দূর দিয়ে হেঁটে যেতাম। আমরা তখনও সোভিয়েত বৃত্তির টাকায় দিন চালাই, আর ওরা  (কথিত আছে) টাকার বান্ডিল দিয়ে ভাতের হাঁড়ি নামায়। মুরগি খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে বা  ভালো পোশাক-আশাকের লোভ দেখিয়ে সহজেই ঘরে নিয়ে আসতো উঠতি বয়সী রুশ মেয়েদের। ওদের সাথে আমাদের পার্থক্যটা এখানেই। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.