শরীরটা দান করে গেলেন রেইহানি

Reihane 2
ছবিটি ২০০৭ সালের ৮ জুলাই তোলা। ধর্ষণের চেষ্টার সময় সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে খুন করার দায়ে গ্রেপ্তারের পর তেহরানে পুলিশের সদরদপ্তরে হাতকরা পরা অবস্থায় রেইহানি

উইমেন চ্যাপ্টার: ‘আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সাথে সাথেই যেন আমার হার্ট, কিডনি, চোখ, হাড় এবং যা কিছুই প্রতিস্থাপনযোগ্য তা যেন দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয় আমার শরীর থেকে এবং যার এগুলো প্রয়োজন তাদের যেন উপহার হিসেবে দেয়া হয়। আমি চাই না, কেউ আমার নাম জানুক, কেউ আমার জন্য ফুল কিনে আনুক অথবা কেউ প্রার্থনা করুক’।

রেইহানে চাননি তার শরীরটা কোনো কাজে না লাগুক। তিনি তার মাকে পাঠানো ভয়েস বার্তায় বলেছেন, ‘আমি চাই না মাটির নিচে পচে যাক আমার শরীর। আমি চাই না আমার চোখ অথবা তরুণ হৃদয় বালুতে মিশে যাক। সুতরাং আমার অনুরোধ, আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সাথে সাথেই যেন আমার হার্ট, কিডনি, চোখ, হাড় এবং যা কিছুই প্রতিস্থাপনযোগ্য তা যেন দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয় আমার শরীর থেকে, এবং যার এগুলো প্রয়োজন তাদের যেন উপহার হিসেবে দেয়া হয়। আমি চাই না, কেউ আমার নাম জানুক, কেউ আমার জন্য ফুল কিনে আনুক অথবা কেউ প্রার্থনা করুক’।

ধর্ষককে হত্যার দায়ে শেষপর্যন্ত ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে ইরানের বলিষ্ঠ কণ্ঠ  রেইহানে জব্বারির শেষ ইচ্ছাটা এমনই ছিল। শরীয়া আইন এতোটাই শক্তিশালী যে দেশের ভিতরের-বাইরের কোন চাপই তাকে রক্ষা করতে পারেনি। গত ২২ অক্টোবর ভোরে কার্যকর করা হয় তার মৃত্যুদণ্ড।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি তার মাকে বলে গেছেন, ‘যে রাতে আমি ওই লোকটিকে খুন করেছিলাম সেই রাতে আমার মারা যেতে পারতাম। আমার মৃত শরীরকে শহরের কোন কর্নারে হয়তো ফেলে রাখা হতো। কিছুদিন পর পুলিশ তোমাকে সেখানে নিয়ে আমার দেহ সনাক্ত করতে বলতো, এবং সেখানেই তুমি হয়তো জানতে পারতে যে, আমাকে ধর্ষণও করা হয়েছিল। হত্যাকারীকে কখনও খুঁজে পাওয়া যেত না, কারণ তাদের মতো সম্পদ বা ক্ষমতা কোনটাই আমাদের নেই। তুমি তখন সীমাহীন কষ্ট আর অপমান নিয়েই বেঁচে থাকতে, আর কিছু বছর পর তুমি নিজেও মারা যেতে এই কষ্ট বুকে নিয়ে, এখানেই শেষ হয়ে যেত সব।

কিন্তু কোনো অভিশাপের কারণেই হয়তো গল্পটা অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার শরীর কেউ কোথাও ছুঁড়ে না ফেললেও এভিন কারাগারে ফেলে দিয়ে গেছে। আর এটা কবর-সদৃশ কারাগারই বটে। ভাগ্যকে মেনে নাও, কখনও অভিযোগ করো না। তুমি ভাল করেই জানো যে, মৃত্যুই জীবনের শেষ কথা নয়’।

আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও আদালত দেশটিতে ১৯৭৯ সাল থেকে কার্যকর শরীয়া আইন অনুযায়ী এই দণ্ড কার্যকর করে। ১০ দিন আগেই মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে, এই সময়ের মধ্যে নিহত ওই ধর্ষকের পরিবার তাকে ক্ষমা করলে তিনি হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবেন। কিন্তু সেই ক্ষমা না  করায় রেইহানেকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এসময় তার বয়স হয়েছিল ২৬ বছর।

রেইহানের এই মৃত্যুদণ্ড যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এমনকি খোদ ইরান সরকারের মধ্যে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। বিচারক মোস্তফা পুর-মোহাম্মদি বলেন, ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছে সব। তাকে কোরআনে উল্লিখিত শরীয়া আইন ‘কিসা’ অথবা চোখের বদলে চোখ অনুসারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

২০০৭ সালে টিনএজ থাকাকালে রেইহানেকে তার কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। রান্নাঘরের ব্যবহৃত ছুরি দিয়ে সাবেক ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে তিনি হত্যা করেন। তিনি বিচারে বার বার বলেছেন, আত্মরক্ষার্থেই তিনি বাধ্য হয়েছিলেন খুন করতে, কিন্তু ইরানের সুপ্রিম কোর্টকে টলাতে পারেননি মোটেও। আর এই পুরো সময়টাই তাকে কাটাতে হয়েছে চার দেয়ালে বন্দী অবস্থায়।

রেইহানের সামনে সবশেষ সুযোগ ছিল দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের কাছ থেকে জীবন ভিক্ষা পাওয়া। কিন্তু খামেনেই কখনই এই মামলাটির বিষয়ে মুখ খোলেননি। অথচ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রায়ই ফতোয়া জারি করেন তিনি। কিন্তু রেইহানে নারী বলেই হয়তোবা তিনি কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখাননি।

এমনকি মৃত রেইহানেকে মৃত্যুর পরও খুনি সাব্যস্ত করতে তৎপর ছিল তেহরানের বিচারকরা। তার ফাঁসি কার্যকরের পরপরই তেহরানের রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলিদের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতি দেয়া হয়। যাতে স্পষ্টই বলা হয় যে, ‘এটা ছিল পূর্বপরিকল্পিত খুন। রেইহানে পরে এতে ধর্ষণের অভিযোগ যুক্ত করে একে ভিন্নভাবে পরিচালনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার আনা সব যুক্তি-প্রমাণই মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। তিনি তার এক বন্ধুকে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে খুন করার ইচ্ছার কথা জানান। দুদিন আগে ছুরিও কিনে আনেন’।

তবে রেইহানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দেয়ার পর থেকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে প্রহসনমূলক বিচার বলে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

ফাঁসির আগে মায়ের কাছে পাঠানো এক ভয়েস বার্তায় রেইহানেকে অসম্ভব শান্ত মনে হচ্ছিল। তিনি তার মরদেহ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে দেয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে গেছেন ওই বার্তায়। ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণের কথাও বলেছেন তিনি।

রেইহানে মৃত্যুর আগে তার মায়ের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আমার জন্য তোমাকে আরেকবার একটু কষ্ট করতে হবে। অনেকবার বলেছি, ফাঁসি থেকে বাঁচাতে একবারের জন্যও তুমি কাউকে অনুরোধ জানাবে না। কিন্তু একমাত্র একটা বিষয়েই তুমি যদি কর্তৃপক্ষের কাছে একটু অনুরোধ জানাও, তাহলেও আমি দু:খিত হবো না। আর এটাই ছিল শরীর দানের অনুরোধ তার।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.