দুর্ঘটনা নয়, গণহত্যা

Road Accidentসুপ্রীতি ধর: নাটোরে গত সোমবার ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি। প্রায় সব দুর্ঘটনাই কমবেশি মর্মান্তিক হলেও একইসাথে ৩৬টি প্রাণ ঝরে যাওয়া, এর বর্ণনা দেয়া ভাষারও অতীত। বিশেষ করে যেসব পরিবার স্বজন হারায় তাদের কথা ভাবলেই মনটা নেতিয়ে পড়ে। নাটোরের ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ১৪ জন আছেন। ভাবছি সেই পরিবারটির কথা। এই শোক সামলাবে কি করে অন্য সদস্যরা?

কলেজ শেষ করেছি তখন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী তাজিন আহমেদ। বোন, মা-বাবা সবাই চলে যায় ওই দুর্ঘটনায়। বেঁচে গিয়েছিল একমাত্র ভাইটি। আমার ভাইয়ের ছাত্রী ছিলেন তাজিন। একজন ছাত্রীর মৃত্যুতে একজন শিক্ষকের কষ্ট দেখে নিজেও আবেগতাড়িত হয়েছিলাম সেদিন। হয়তো সেই কষ্টটিই বড় হওয়ার পর প্রথম মনে দাগ কাটা এক দুর্ঘটনা ছিল। ভাবতাম, তাজিন আপার ভাইটি এখন কী নিয়ে বাঁচবে? মা-বাবা ছাড়া ওর পৃথিবীটা কেমন হবে? জানি না ওর খবর। কেমন আছে, কোথায় আছে সে? নিশ্চয়ই বড় হয়েছে, শোক কতটা সামলেছে জানা হয়নি।

গত সোমবার বিকেলে নিউজরুমে বসেই নাটোরের খবরটি পাই। প্রথমে জানতে পারি ২০ জন স্পট ডেড। আহতের সংখ্যা অনেক, মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। আমরাও তৎপর হয়ে উঠি। মনটা এমনিতেই ভেঙে আছে গত কয়েকদিনের নানা বিয়োগ ব্যথায়, সেখানে নতুন করে সংযোজন হলো এই কষ্ট।

এই দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে কত মা-বাবার বুক খালি হলো, কত সংসার ভেঙে গেল, কত পরিবার পথে বসলো, কত সন্তানের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে গেল, কত মানুষ চিরজীবনের মতো পঙ্গু, অথর্ব হয়ে গেল। শারীরিক ক্ষতির চেয়েও এসব দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মারাত্মক। আর অর্থনৈতিক ক্ষতিই ডেকে নিয়ে আসছে সামাজিক অবক্ষয়গুলো। কেউ আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না এসব দুর্ঘটনার ধকল সামলে। দাঁড়ালেও তা আর আগের মতো হয় না।

চোখে ভাসতে লাগলো নিটোলের চেয়ারম্যানের একটি উক্তি, যা কিনা গাড়ির পিছনে পোস্টার হিসেবে লাগানো থাকে। তাহলো, ‘একটি মৃত্যু একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না’। এই পোস্টার হয়তো কারোরই চোখ এড়ায় না, তবুও মৃত্যু আসে নগ্ন পায়ে। আমরা স্বজন হারাই, শোকার্ত হই, দুমড়ে-মুচড়ে বেঁচে থাকি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে।

প্রতিদিনই সারাদেশে আট থেকে ১০ জন নিহত হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। অন্যান্য মৃত্যু তো আছেই। খুন আছে, ধর্ষণ আছে। একটা কষ্ট সামলাতে সামলাতেই আমরা পড়ে যাই নতুন কষ্টের গহ্বরে।

মাত্র গেল শুক্রবারই চলে গেল আমাদের খুব কাছের মানুষ সাবিয়া সিদ্দিকী। কোয়ান্টামে গিয়ে যার সাথে পরিচয়, ধীরে ধীরে সেই পরিচয় রূপ নেয় বন্ধুত্বে, আরও ভাল করতে বললে আত্মার আত্মীয়তায়। আমাদের সবার জন্য যে সবসময় জান-প্রাণ দিয়ে প্রস্তুত থেকেছে, কারও অমঙ্গল চিন্তা যার মাথায় কখনও জায়গাই পেত না, সেই সাবিয়ার জন্য আজ আমরা সবাই ভাবছি, বুকের ভেতরে দীর্ঘশ্বাসটা কেবলই দীর্ঘতর হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই তো আছে সাবিয়া, কোথাও যায়নি। রামপুরা ব্রিজের ওপরে একটা লরির নিচে চাপা পড়ে সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।

একেকটা মৃত্যু ভিতরটা নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তছনছ করে দেয় জীবনযাপন, সব। সাবিয়ার মৃত্যুটাও সেইরকমই। নাটোরের দুর্ঘটনার খবরটাও তাই। জানতাম, এই দুর্ঘটনার পরই আসতে শুরু করবে নানা জীবনের গল্প। কারও বেঁচে যাওয়া, কারও স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার সব কষ্টকর গল্প।

গত কয়েক বছরে এমন কিছু মৃত্যু আমাদের পথচলাকে অমসৃন করে তুলেছে। আমরা নি:শ্বাস নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০১১ সালের জুলাইতে বাসের ধাক্কায় আমাদেরই সাংবাদিক সহকর্মী বেলালের মৃত্যু, একইমাসে মিরেরসরাইতে ট্রাক উল্টে ৪৩টি শিশুর করুণ মৃত্যু, আর তার পরেই ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় বরেণ্য চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ আর চিত্রগ্রাহক-সাংবাদিক মিশুক মুনীরের মৃত্যু।

তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর তাদের বন্ধুদের শোকগাঁথা আবারও বিহ্বল করে দিয়েছিল আমার এই দুর্বল হৃদয়কে। সহ্য হয়নি, জ্বলে উঠেছিলাম। কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি। ফলে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তার দাবিতে গড়ে উঠা সর্বজনসমর্থিত একটি আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পড়েছিল গোটা কয়েকের অসম্ভব, হঠকারিতা, আন্দোলন বিলাসিতা আর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে। সেদিন যদি আন্দোলনটা এগিয়ে নেয়া যেত, হয়তো আজকে নাটোরের মতো শোকে ভাসতে হতো না দেশবাসীকে।

দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই। কিন্তু পালে পালে যখন মানুষ মারা যায়, তখন তাকে ‘গণহত্যা’ বলাই উত্তম। কেবলমাত্র চালকদের অদক্ষতা আর খামখেয়ালির কারণেই যে দুর্ঘটনা ঘটে, তা কিন্তু নয়। নিজের জীবনেও এমন অনেক অভিজ্ঞতা আছে যে, গাড়ির যাত্রীরাও অনেকাংশে দায়ী হন দুর্ঘটনার পিছনে। তারা অনবরত তাড়া দিতে থাকেন চালককে। আস্তে চালালে নানা ধরনের কটূক্তি করতেও পিছপা হন না। হাইওয়েগুলোতে চলাচল করার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, সচেতনতা দরকার সবখানে, সবার মাঝে। যেমন চালকদের, তেমনি যাত্রীদেরও।

আজ যখন এই লেখাটি লিখছি তখনও দেশের নানা জায়গায় মানুষ মরে যাচ্ছে মুড়িমুড়কির মতোন। এই দেশে বেঁচে থাকাটাই আজকাল মনে হয় বিশাল এক দুর্ঘটনা।

এদিকে নাটোরের বড়াইগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে অথৈ পরিবহন, কেয়া পরিবহন, হানিফ পরিবহনের মালিক, চালক ও হেলপারকে দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বাসের সংঘর্ষের পর আহত যাত্রীরা যখন রাস্তায় পড়ে ছিলেন, তাদের চাপা দিয়েই হানিফ পরিবহনের একটি বাস দ্রুত গতিতে চলে যায়। এতে হতাহতের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এখানে বিবেক বলেও কোনকিছু কাজ করেনি কারও? দৃশ্যটা চিন্তা করলেও শিউড়ে উঠছি। কিছু মানুষ আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে থেকে উঠার চেষ্টা করছে, আর তখনই আরেকটি বাস কোথায় থেমে তাদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে, তা না, বরং তাদের চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে গেল! বাসের যাত্রীদের কেউই এর প্রতিবাদ পর্যন্ত জানালো না? কোথায় আমাদের সেই মানবিক মূল্যবোধ?

যে বোধ আমরা দেখি রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সময়, যে বোধ আমরা দেখি সাম্প্রতিক লঞ্চ দুর্ঘটনার সময় সাধারণের এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে, সেই বোধ তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে অনুপস্থিত হয় কি করে?

সড়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দুর্ঘটনার পর চালক ও মালিক উভয়ের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরকম বলাই হয়, কিন্তু আজপর্যন্ত কোনো চালকের শাস্তি হতে আমরা শুনিনি। এই হত্যাকাণ্ডের কোন বিচার হয় না এইদেশে। যে কারণে চালকরা আজ এতোটাই বেপরোয়া।

স্থানীয় পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী অনেকেই এসব ঘটনার জন্য বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। দূরপাল্লার চালকরাও বলছেন, অনেক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের অজ্ঞতা ও অদক্ষতাই দায়ী।

এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট দুর্ঘটনা হয়েছে দু হাজার সাতশর বেশি। সড়ক-মহাসড়কের এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। আর প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই গাড়ি চালকদের অদক্ষতার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কর্তৃপক্ষ বলছেন, চালকদের সচেতন ও দক্ষ করতে ব্যাপক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে আমাদের শান্তি মেলে না।

চাই ইন্স্যুরেন্স। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন যাত্রীদের জীবন বীমা করার ব্যবস্থা থাকে, এখানেও সেইরকমটি চাই। আজ যদি এতোগুলো মানুষের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ দিতে হতো বাস মালিকদের, তাহলে চালক বলেন আর মালিক বলেন, সবাই সঠিক নিয়ম মেনেই রাস্তায় নামতো। এমনকি চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার ক্ষেত্রেও তখন মালিকরা সতর্ক থাকতেন।

সবশেষ কথা, চালকদের গরু-ছাগল না চিনিয়ে মানুষ চেনানো হোক, তাদের মাঝে জাগিয়ে তোলা হোক মানবিকতাময় গুণগুলো। ওরা ভালবাসতে শিখুক নিজেকে-অন্যকে। আর তাদের কাজটিকেও যথাসম্ভব সম্মানিত করার ব্যবস্থা হোক সর্বমহল থেকে। তবেই না যৌথ প্রয়াসে বন্ধ হবে এ ধরনের ‘গণহত্যা’ আর আমরা বাঁচার মতো বেঁচে যাবো সবাই।

লেখাটি বাংলাট্রিবিউনের সৌজন্যে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.