ধিক আপোসের রাজনীতি

Golam Azamসুমন্দভাষিণী: শেষপর্যন্ত এই স্বাধীন বাংলার মাটিতেই চিরশয্যা নিল এই দেশের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী, যুদ্ধাপরাধের দণ্ডে দণ্ডিত রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযম। যে দেশকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করে গেছেন আমৃত্যু, যে দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যার পিছনে ছিল যার নীলনকশা, সেই ব্যক্তিটিকে প্রতিটি সরকারের আমলেই মাথায় তুলে রাখা হয়েছে, পুনর্বাসন করা হয়েছে রাজার মর্যাদায়।

যে দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অর্থের অভাবে, বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে, সেই দেশেরই একটি হাসপাতালে এয়ারকন্ডিশন্ড রুমে শুয়ে-বসে, বাসা থেকে আনা ২১ পদের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে শেষ নিদ্রা গেছেন গোলাম আযম। শুধু তাই নয়, চারদিকের ব্যাপক হম্বি-তম্বি সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তার শেষকৃত্যও অনুষ্ঠিত হয়েছে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে, শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এই মাটিতেই। অথচ তার মতোন এমন ঘৃণ্য মানুষের তো এইদেশে ঠাঁই হওয়ার কথা ছিল না!

রাগে-দু:খে, ক্ষোভে-অপমানে নিজেকে প্রচণ্ড অসহায় লাগছে আজ। আমরা যারা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআন্দোলন দেখেছি, যারা সবশেষ শাহবাগ আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকেছি, যারা দেশের বিভিন্ন অনিয়ম-অত্যাচারে সবসময় প্রতিবাদে মুখর হয়েছি, তারা ভেবেছিলাম, গোলাম আযমকে কিছুতেই এই দেশের মাটিতে দাফন করতে দেয়া হবে না। প্রিয় প্রজন্ম সঠিক সময়েই জেগে উঠবে। প্রতিহত করে দেবে সব অন্যায় আর সমস্ত আপোসকামিতাকে।

কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, এর কোনটাই হলো না। বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ মিছিল বের করেছে কিছু ছাত্র সংগঠন। কিন্তু যে ব্যক্তি গড় আয়ুরও বেশি বেঁচে স্বাভাবিক নিয়মে, শান্তিতে ‘সব আলাপ-সালাপ’ সেরে চোখ বন্ধ করেছে, তার জন্য আনন্দ মিছিল কেন হবে? কিসের আনন্দ? ল্যাটা চুকেছে বলে? আর দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এমন একজন যুদ্ধাপরাধীকে পুষতে হবে না বলে? কই আমাদের টাকায় একজন মুক্তিযোদ্ধাও তো গোলাম আযমের ছিটেফোঁটা চিকিৎসা সুবিধাও পান না। তারা ভিক্ষা করে, দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে অবশেষে এই দেশ থেকে বিদায় নেন। এগুলো ভাবলেও গলায় কাঁটার মতোন বিঁধে।

শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে গোলাম আযমের লাশ তার পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়। এখানেও দেখি তাদের দম্ভ, আভিজাত্য, আমাদের মতোন ‘সবদিক থেকে মরা’ বাঙালীর প্রতি রাজাকারের পরিবারের বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন। আর এসবই সম্ভব হয়েছে সরকারের ইন্ধনে। বিশেষ রেফ্রিজারেট সিস্টেম সম্বলিত লাশবাহী গাড়িতে বাড়িতেই রেখে দেয়া হয় রাজাকার নেতার শবদেহ। সেখানে দিনভর লাখ লাখ জামাত-শিবির কর্মী তাদের নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আসে। কেউ কোথাও বাধা দেয় না। বরং তাদের চলাচলের সুবিধার্থে ওই বাড়ির আশপাশের এলাকায় গাড়ি চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। কড়া পাহারায় রাখা হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে, যেন মহান রাজাকারের শেষযাত্রায় কোনরকম প্রতিবন্ধতা তৈরি না হয়। এসবই হয় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি যখন ক্ষমতায়, তখন।

আমরা যারা আমজনতা, নিজের মাংস দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ধরি, সহ্য করি এসবকিছুই। আমাদের যে করার কিছুই নেই। শুধুমাত্র একজনের এক পাটি জুতা নিক্ষিপ্ত হয় গোলাম আযমের লাশবাহী গাড়িতে। আমরা তাতেই সন্তুষ্ট বোধ করে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলি। কিন্তু বুঝতে পারি না, ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে পুনর্বাসিত হওয়ার পর থেকে এইদেশে  গোড়াকে যেভাবে বিষিয়ে গেছেন এই গোলাম আযম, কেন জানি মনে হয়, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে আরও একটি মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই যোদ্ধারা কোথায় আমাদের? আজও ঘরে ঘরে গোলাম আযমের আদর্শ অনুসৃত হয়, শিশু সন্তানের নামকরণ হয় গোলাম আযম, সেখানে সহসা মুক্তির চিন্তাটি বাতুলতা ছাড়া কিছু না।

আমরা যারা ঘরে বসে কেবলই ধিক্কার জানানোর অধিকার রাখি, তারা তাতেই সীমিত হয়ে সংখ্যালঘুর দলে নাম লেখাই। সংখ্যাগুরু গোলাম আযমেরা তখন বীরদর্পে বাংলার শাসন ক্ষমতাকে থোরাই কেয়ার করে। তাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কিছু মানুষের দীর্ঘশ্বাস বড় বেশি বাজে।

নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলনরত ‘তসলিমা পক্ষ’ নামের একটি গ্রুপ লিখেছে,

“আহা আমি যদি রাজাকার হতাম, দেশে থাকতে পারতাম, যুগের পর যুগ আমাকে নির্বাসনে থাকতে হত না. যদি রাজাকার হতাম, সংসদ সদস্য মায় মন্ত্রীও হতে পারতাম. যদি রাজাকার হতাম আমি, সর্বোচ্চ সরকারী হাসপাতালে বিনে পয়সায় চিকিত্সা হত আমার, একুশ ব্যঞ্জন দিয়ে খেতে পারতাম প্রতিদিন. আর, মৃত্যু হলে জাতীয় মসজিদে আমার নামাজে জানাজা হত. কী নিশ্চিন্তের, নির্ভাবনার, আরাম আয়েশের জীবন হত আমার. আহা যদি রাজাকার হতাম”!

কথাটি মিথ্যা তো নয়ই, বরং বাস্তব প্রেক্ষাপটে নির্জলা সত্য। তসলিমা নাসরিন ধর্মের বিরুদ্ধে, নারী স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে দেশান্তরিত হয়েছেন। কোন সরকারই তাকে আনার মতো সাহস অর্জন করতে পারেনি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোর সাথে আঁতাতের কারণেই। যে আঁতাত আজ গোলাম আযমকেও পরম শ্রদ্ধায় বাংলার মাটিতে জায়গা করে নেয় নিশ্চিন্তে।

ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলায় মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকেও একই শাস্তি ভোগ করতে হয়। কারণ ওই একটাই, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে হাতে রাখা, খুশি রাখা। ধর্মের কাছে যখন পুরো দেশ কুপোকাৎ হয়ে যায়, সেই সুযোগটাই নেয় ক্ষমতাসীনেরা তাদের গদি বাঁচাতে।

একসময়ের অভিনেত্রী লুতফুন নাহার লতা লিখেছেন, একজন ফাঁসির আসামী, ১৯৭১ এর গণহত্যার নায়ক। জল্লাদ, নরপশু গোলাম আযম, সরকার দয়া করে যাকে বয়সের দোহাই দিয়ে ফাঁসি মওকুফ করে দেয়! কারাগারের War-criminal’s death row’ র বদলে সরকারের দয়ায় হাসপাতালে আরামে আয়েসে থেকে যার স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ! আবার সেই সরকারের সহায়তায় তাঁর জানাজা হয় জাতীয় মসজিদে !এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! সরকারের সংজ্ঞা বদলে জনগনের সেবক না হয়ে গোলামের সেবক হয়ে গেল ! ধিক! ধিক! ধিক !!!

এর নাম কি ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল ! নাকি জনগণের হৃদয় নিংড়ানো সরল বিশ্বাস আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশার মুখে ছাই ঢেলে দিয়ে চরম বিশ্বাসঘাতকতা!!!!!!

ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক তার এক লেখার একটি জায়গায় উল্লেখ করেছেন, “গোলাম আযমের দুঃসাহসের আরেকটি উদাহরন তোমাদেরকে দেই-

৯০ এর শেষে এরশাদ পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হওয়ার পরে দেশে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পালা এলো ৯১ সালে। সরকারি দল বিএনপির প্রার্থী আর বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী-দুজনেই গিয়ে ধর্ণা দিলেন গোলাম আযমের বাসায়। দুজনেই দোয়া প্রার্থী হলেন এমন একটা লোকের, ৭১ সনে হত্যযজ্ঞের হোতাদের সর্দারই শুধু নয়, এই লোকটি ছিল মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও বছরের পর বছর ‘পূর্বপাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন‘ এর নামে পাকিস্তানে বসে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের একজন! এই লজ্জা, এই গ্লানির স্মৃতি তোমাদের মনে নেই।

এর কিছুদিন পরে সে দুঃসাহসের চূড়ান্ত দেখিয়েছে। পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ পদে প্রকাশ্যে নিজের নাম ঘোষণা করার সাহস দেখিয়েছে এরা”।

উন্নয়ন কর্মী শিপ্রা বোস এক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, “গতকাল ঢাকায় অনেক তোলপাড় হবে ভেবেছিলাম। গতকাল প্রতিরোধ, প্রতিবাদের উন্মাদনায় ঢাকাসহ সারা দেশ আবার উত্তাল হয়ে উঠবে ভেবেছিলাম। গতকাল শকুন গোলামের কবরের সঙ্গে জামাতিদের কবর রচিত হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু সব ভাবনার সীমানা ছাড়িয়ে গতকাল এক নতুন উপলব্ধি হয়েছে। গতকাল অবাক বিস্ময়ে উপলব্ধি করলাম দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক বড় একটা পরিবর্তন ঘটেছে যার কোনো খবরই আমার কাছে ছিলোনা। দেশের সকল রাজনৈতিক দলই অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে; well এর একমাত্র ব্যতিক্রম জামাত শিবির, জামাতীরা গতকালও তাদের সহিংস চরিত্রের কিছুটা হলেও পরিচয় দিয়েছে; বাঁধন গো -আযম-কে জুতার সম্ভর্ধনা দেয়ার পরে তাদের বাঁধনের প্রতি প্রতিক্রিয়ার তারা তাদের চিরাচরিত প্রতিক্রিয়াশীল, সন্ত্রসী চরিত্রের কিছুটা হলেও demonstration দেখিয়েছে।

যাহোক গতকালের হতাশার মধ্যেও এক নতুন আশার জন্ম হয়েছে। যদি সব রাজনৈতিক দলই অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী হয়ে উঠে তাহলে দেশে আর কিছু না হলেও সন্ত্রাস নির্মূল হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশ এগিয়ে যাবে। আইনের শাসনের কথায় মাথায় একটা প্রশ্ন এলো, প্রশ্নটা হচ্ছে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত, সাজাভুক্ত, প্রমাণিত অপরাধীর কারাগারে মৃত্যু হলে তার শেষ কৃত্যের জন্য “আইনের বিধান অনুযায়ী” সরকার এবং প্রশাসনের দায়িত্ব এবং করণীয় কি এবং কতটুকু?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.