বাংলার মাটিতে ঠাঁই নেই গোলাম আযমের

Golam Azamসুমন্দভাষিণী: অবশেষে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস থেকে চূড়ান্তভাবে বিদায় নিল একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামের সাবেক আমীর গোলাম আযম। তার নি:শ্বাসে এখন থেকে আর কোনদিন ভারী হবে না এই বাংলা। যদিও যে বীজ তিনি বুনে দিয়ে গেছেন গত ৪৩ বছরে তা উপড়ানো সহজ নয়। তারপরও আশা করতে দোষ কোথায়!

দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগভোগের পর বৃহস্পতিবার রাতে  তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।  এই দণ্ড  আর সেই সঙ্গে  লাখ লাখ মানুষের অভিশাপ মাথায় নিয়েই তিনি চললেন পরপারে।  এমন ভাগ্য কজনার হয়। মৃত্যু সংবাদটি সাথে সাথেই পৌঁছে যায় অনলাইনের কল্যাণে, আর আনন্দ-বিষাদ নেমে আসে সবার মাঝে। আনন্দ এ কারণেই যে, এই বাংলা থেকে একজন পাপীর বিদায় ঘটলো, বিষাদের কারণ হচ্ছে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তিটুকু আমরা নিশ্চিত করতে পারলাম না।

যা হয়েছে, তাও কম নয়। মৃত্যুর আগে সে নিজেকে অভিযুক্ত জেনে গেছে। কাজেই এই মূহূর্তে আমাদের করণীয় একটাই, এই অভিশাপকে দেশের মাটিতে ঠাঁই দেয়া যাবে না। এই দেশের মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে লাখো শহীদ। তাদের পাশে গোলাম আযমের জায়গা দেয়াটা সমীচীন হবে না মোটেও। শহীদের আত্মাদের শান্তির জন্যই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন এখনই।

আমি নিশ্চিত আমার মায়ের মতো অসংখ্য মানুষের নি:শ্বাসে অভিশপ্ত হয়েছে গোলাম আযমের জীবন।  আর সেই কারণেই আজ এতো উল্লাস প্রতিটি দেশঅন্ত প্রাণে।

এইদেশের মানুষ কোনো মৃত্যুতে এতো উল্লাস করেনি বহুদিন। ৪৩ বছরের দায়মুক্তির আনন্দই আলাদা। হোক না তা কিছুটা পরাজিতের আনন্দ। পরাজিত এ কারণেই যে, যুদ্ধাপরাধের সবচেয়ে বড় অভিযুক্ত ব্যক্তিটির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েও পাওয়া গেল না শুধুমাত্র বয়স বিবেচনায়। তবে জীবদ্দশায় তিনি জেনে গেছেন তাকে দোষীসাব্যস্ত করা হয়েছে, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তার কানের কাছে অনবরত বেজে গেছে তার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান। যেখানে প্রতিনিয়ত তাকে রাজাকার সম্বোধন করে, ‘গ তে গো আযম, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার, পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা পাকিস্তানে চলে যা, দড়ি লাগলে দড়ি নে, কসাইটারে ঝুলিয়ে দে’ জাতীয় স্লোগান শুনতে হয়েছে, এটাও কম শাস্তি নয়। কয়জনের এমন  ঘৃণা  পাওয়ার সৌভাগ্য হয়?

তবে এটা ঠিক যে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির দাবিদার এই সরকারও গোলাম আযমকে শাস্তিটা দিতে পারেনি, যা দিয়ে গেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। কারণ তাঁর বুকে ছিল সন্তান হারানোর ক্ষরণ। সেই ক্ষরণ থেকেই তিনি শক্তি পেয়েছিলেন শাস্তির কথাটা উচ্চারণের। হোক না তা প্রতীকী, ফাঁসির রায় তো দিয়েছিলেন। এই সরকার পারতো কা কার্যকর করতে। কিন্তু রাজনীতির গোলমেলে হিসাবের কাছে আমাদের দাবি অসহায় হয়ে রইলো। আমরা বঞ্চিত হলাম ন্যায্য দাবি থেকে। বিনিময়ে গোলাম আযম মৃত্যুর আগে পেয়ে গেলেন সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা, বা  সোজা  বাংলায় বললে, জামাই আদর।

তার চিকন চালের ভাত আর পোলাউ-মাংস, পায়েসের গল্প শুনে মনে পড়ে যেত একাত্তরে সেই ছোট্ট আমিটা যখন শরণার্থী শিবিরের মোটা-গন্ধ চালের ভাত খেতে পারতাম না, মা আমার জোর করে খাওয়াতে চেষ্টা করতো, যেন প্রাণটা ধুকফুক করলেও বেঁচে থাকে। ততদিনে বাবাকে রাজাকারদের সহায়তায় ধরে নিয়ে গেছে পাকিস্তানী বাহিনী। আমরা কোনরকমে প্রাণ আর সম্ভ্রম বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় চিড়া-গুড় ছাড়া কিছুই জোটেনি। ক্যাম্পে আসার পর গন্ধযুক্ত মোটা চালের ভাতই জুটেছিল ভাগ্যে। অথচ ধরবাড়িতে প্রাচুর্যের অভাব ছিল না। গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল আক্ষরিক অর্থেই।

এই গোলাম আযমদের কল্যাণেই সব ফেলে আমরা সেদিন পথের ভিখারি সেজেছিলাম। বাবাকে হারিয়েছিলাম। সেই ছোট্টবেলা থেকে বাবা হারানোর সেই আক্ষেপ মনে, কোনদিন ক্ষমা করিনি যুদ্ধাপরাধীদের। আপোসের তো প্রশ্নই উঠে না। আজ সেই নাটের গুরুর প্রস্থানে রক্ত আবার টগবগ করে উঠলো।

স্বাধীন বাংলার মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও আমরা পারিনি ৩০ লাখ শহীদের ঋণ  শোধ করতে। এখন তার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, একে কবর দেয়া হবে কোথায়?

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে গোলাম আযমের মৃত্যু সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শুরু হয়ে গেছে তার কবর দেয়া নিয়ে নানা আলোচনা। এতোদিন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সোচ্চার প্রতিটি যোদ্ধাই তাকে এইদেশের মাটিতে কবর দিতে নারাজ। কেউ কেউ তাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিরোধের খবর আসছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। রাতেই সবাই স্ব স্ব উদ্যোগে প্রস্তুতি নিচ্ছে লাশ দাফন প্রতিরোধ করার।

এক বন্ধুর কথার জের ধরেই বলতে হয়, কোন মৃত্যুই আমাকে আনন্দিত করে না, কিছু মৃত্যু স্বস্তিও এনে দেয়। মনে হয় তাদের মৃত্যুতে জাতি ক্লেদ মুক্ত হল। আজ আমাদের ক্লেদমুক্ত হওয়ার দিন, তবে গোলাম আযমকে এই মাটির নিচে শুইয়ে রেখে তা হবে না। প্রয়োজন সর্বাত্মক প্রতিরোধের। চলুন আবার আমরা সবাই একতাবদ্ধ হই। প্রতিরোধ করি এই ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.