ডিভোর্স বাড়ছে : এগিয়ে নারীরা

0
Jakia

জাকিয়া আহমেদ

জাকিয়া অাহমেদ (বাংলা ট্রিবিউন) : “মেয়েটি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত পরিবারের হলেও তার স্বামী চুরিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এসব কারণে ১০ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি টানতে এল অামার কাছে। কিন্তু মেয়েটি এই দশ বছরে কোনও দিন তার বাবা মায়ের কাছে এসব কথা বলেনি। তারা কিভাবে নেবেন এই ভেবে। কিন্তু যেদিন মেয়েটি তালাক নামায় স্বাক্ষর করার জন্য অামার কাছে এলো সেদিন শুধু তার বাবা মা নয়, মামা, খালা, ফুপু, খালুসহ প্রায় ২০/২৫ জন এসেছিল তার সঙ্গে। বাবা মায়ের কথা ছিল, মেয়ে তো কোনও দিন অামাদের কিছু বলেনি। বললে অগেই ডিভোর্স হয়ে যেত। মেয়েকে তারা বলেন, ‘গো এহেড’, তোমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছি এবং তোমার সন্তান অাছে বলেই সংসার করতে বলবো না।” কথাগুলো বলছিলেন অাইনজীবী ও সমাজকর্মী অ্যাডভোকেট ফওজিয়া করিম।

বাংলাদেশে তালাক বাড়ছে, সংসার ভাঙছে। বিশেষ করে রাজধানীতে মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনী ক্ষমতাবান পরিবারে তালাক বা ডিভোর্সের হার বেড়েই চলেছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বামী স্ত্রীর মানসিক দূরত্ব, বিবাহ বর্হিভুত প্রেম, বিভিন্ন নেশায় অাসক্তি ও অর্থনৈতিক চাহিদা ইত্যাদি কারণে রাজধানীতে বাড়ছে ডিভোর্সের হার।

ফওজিয়া করিম বলেন, “দরিদ্র ও গ্রাম এলাকায় ডিভোর্সের হার কম। সেসব এলাকায় স্বামী স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যায়। উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে ডিভোর্স হয় বেশি। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এই ভাবনা থেকে অাগে বিবাহ বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করতে না পারলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, স্বাবলম্বিতা এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। কাবিননামার ১৮ নং কলামে নারীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।”

সমাজকর্মী ফওজিয়া আরও জানালেন, “বাবা মা অাগে মেয়েদের ডিভোর্সকে সমর্থন না করলেও এখন ‘So Long disturb Family’র চেয়ে ডিভোর্সকেই সমর্থন দিচ্ছে বেশি। মেয়ের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবছেন তারা। অার মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে বলেই তারা স্বামীর নির্যাতন সহ্য করছে না। ফলে ডিভোর্স বেড়েছে এবং দেখা যাচ্ছে ডিভোর্সটা বেশি হচ্ছে মেয়েদের দিক থেকে ।”

সিটি কর্পোরেশনের জরিপ অনুযায়ী শুধু রাজধানীতেই গত জুলাই পর্যন্ত ডিভোর্স হয়েছে ২২ হাজার ৪৮৮টি। অথচ গত বছর ডিভোর্সের ঘটনা ছিল ৮ হাজার ২১৪টি, ২০১২ সালে ৭ হাজার ৬৭২টি এবং ২০১১ সালে ৫ হাজার ৩২২টি। এসবের মধ্যে ৭৫ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ ডিভোর্স দিয়েছেন নারীরাই। তালাকনামায় স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রথম দিকে রয়েছে যৌতুক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং পরনারীতে আসক্তি।

অপরদিকে ২০০০ সালে ঢাকায় ডিভোর্সের ঘটনা ছিল ২৭৫৩টি। ২০০১-এ নোটিস ছিল ২৯১৬টি, যার মধ্যে ডিভোর্স ছিল ২৫৪০টি। ২০০২ সালে নোটিস ছিল ৩,০৭৩টি। এর মধ্যে তালাক হয়েছে ২,৬১৫টি। ২০০৩ সালে নোটিস এসেছে ৩,২০২ এবং তালাক ২৯৬১টি (যার মধ্যে পুরুষ ১০৯টি ও নারী ২১১০টি)। ২০০৪ সালে তালাকের নোটিস ছিল ৩৩৩৮টি, (পুরুষ ১০০২ ও নারী ২৩৩৬) এবং আপস হয়েছে ৩৩৮টি। ২০০৫ সালে ৫,৫১১টি নোটিস ছিল (পুরুষ ১০০২ এবং নারী ৪১৭৯) এবং ২০০৬ সালে মোট ডিভোর্সের নোটিস ছিল ২,৬২৭টি।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশে প্রথমবারের মতো নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ নামের এ জরিপে নারী নির্যাতনের চিত্রই উঠে এসেছে। ২০১১ সালের পরিসংখ্যানে বিবিএস উল্লেখ করে, দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর দ্বারা কোনও না কোনও সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব নারীর ৭৭ শতাংশ বিগত এক বছরেও একই ধরনের নির্যাতন ভোগ করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী কর্তৃক নানাভাবে এভাবে নির্যাতিত হয়ে স্ত্রীরা ডিভোর্স দিতে বাধ্য হন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ৩ গঠিত হয়েছে উত্তরের গুলশান, বনানী, মহাখালী, বাড্ডা, মগবাজার, রামপুরা নিয়ে। এ এলাকায় গত বছর ৫৯৮ দম্পতির ডিভোর্স হয়েছে। এর মধ্যে স্বামী ডিভোর্স দিয়েছে ২৩৫ এবং স্ত্রী দিয়েছে ৩৬৩টি। রাজধানীর সূত্রাপুর, বংশাল, নবাবপুর, কাপ্তান বাজার, নাজিরাবাজার ও লালবাগের অর্ধেক নিয়ে গঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের অঞ্চল-৪। এই এলাকায় গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২৫৮ দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে। এর মধ্যে স্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৭৩ এবং ৮৫ ডিভোর্স হয়েছে স্বামীর পক্ষ থেকে। তার আগের বছর একই এলাকায় ২৯১ দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৪ ডিভোর্স হয়েছে স্ত্রীর পক্ষ থেকে।

তালাকের সংখ্যা কমিয়ে আনতে কাউন্সিলিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ বিচ্ছেদের আবেদন এবং সালিশ করতে হয় সেখানেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ ‌‌‌সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. অানছার অালী খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অাশঙ্কাজনক হারে ডিভোর্স বাড়ছে বলে যে তথ্য প্রচার হচ্ছে বিষয়টি সেরকম নয়। তবে বিবাহ বিচ্ছেদ অাগের তুলনায় বেড়েছে।” কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “নারীরা শিক্ষিত এবং সাবলম্বী হওয়ায় তারা প্রতিবাদ করছে। নির্যাতন সহ্য না করতে পারলে ডির্ভোস দিচ্ছে। অারেকটা বিষয় হলো অামাদের সমাজে এখন পারিবারিক বন্ধনটাও অাগের মতো কাজ করছে না।”

একই মত দিলেন বিএসএমএমইউর সহযোগী অধ্যাপক ও মনরোগ বিশেষজ্ঞ সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে এটা বলবো না। ডিভোর্স অাগেও ছিল তবে সেগুলো এখনকার মতো সংবাদ হতো না। এখন এসব নিয়ে সংবাদ হচ্ছে বলে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে বেশি। তবে বিয়ে যেমন ‘অামরা একসাথে থাকবো’র চুক্তি, তেমনি ডিভোর্স হলো অারেকটা চুক্তি যেখানে বলা হচ্ছে অামরা একসাথে থাকবো না।”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 168
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    168
    Shares

লেখাটি ১,২৩৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.