দুটি খবর এবং আমাদের সমাজের নারীরা

Leena 2
লীনা

আলেয়া পারভীন লীনা: সাম্প্রতিক সময়ে দুটি খবরে আমি নিজেকে প্রতিক্রিয়াহীন রাখতে পারছি না। বার বার মনে প্রশ্ন আসছে আসলেই কি আমাদের সমাজে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে? নাকি এই এগিয়ে যাওয়া শুধুই পোশাকী এগোনো? আদতে মন-মানসিকতায় আমরা রয়ে গেছি এখনো সেই পুরনো ধ্যান ধারণা নিয়ে? নিজেকে অসহায় ভাবা, প্রতিবাদহীনভাবে চলে যাওয়া কিংবা অসহায়ত্বের বোঝা কাঁধে বয়ে নিয়ে চলা?

দুটি খবরের বিশেষত্ব আমি বিশ্লেষণ করবো দু রকম ভাবে। দুটিই হচ্ছে আত্মহত্যার খবর। একজন ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর নারী, আরেকজন নওঁগার কলেজ পড়ুয়া সাধারণ একজন।

আমরা সাধারণত ধরে নেই যারা আর্থিকভাবে সমাজে এগিয়ে থাকা শ্রেণীর নারী তারা সমাজের সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে খুব অনায়াসে। আর্থিক সচ্ছলতার কারণে সে চাইলেই নিজের জীবনের গতি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নিজের ইচ্ছায়। আর বোধ হয় একেই আমরা বলি এগিয়ে থাকা নারী (প্রচলিত অর্থে)। এ যদি হয় নারীর এগিয়ে চলা  বা নারীর অগ্রগতি তবে কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো লোপাকে? কেন চলে যেতে হলো মিতা নুরের মত নারীদেরকে? কেন তারা বেছে নিলো নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ নিজের জীবন ত্যাগের মত সিদ্ধান্ত? কেন তারা ভাবলো না তাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধুদের কথা? তাদের নারীছেঁড়া ধন ফুটফুটে সন্তানদের কথা? কিসের অভাব ছিলো তাদের? অর্থ, প্রতিপত্তি, আরাম, আয়েস, খ্যাতি সবই ছিলো। তারা চাইলেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারতো।

হ্যাঁ, তারা তাদের সেই ক্ষমতাকে দেখিয়েছে, তবে তা কোন সঠিক পথে নয়, সম্পূর্ণ বেঠিক এবং পরাজিতের পথে। তারা শিক্ষিত এবং দেশের সবচেয়ে ভালো জায়গায় পড়াশোনা করে আসা। তবে সঠিক শিক্ষা কি তারা গ্রহণ করতে পেরেছে? মানুষ হিসাবে নিজেকে সমাজে একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ হিসাবে ভাবার শিক্ষা কি তারা পেয়েছে?

নওঁগার সেই কলেজ পড়ুয়া বীথি রাণী মন্ডল কেন বেছে নিলো আত্মহণনের পথ? সে সরল মনে ভালোবেসে অন্তরঙ্গভাবে মিলেছিলো তার ভালোবাসার ছেলেটির সাথে। কিন্তু সেই সম্পর্কের যখনই ভাঙ্গন হলো, তখনই ছেলেটি তাদের সেই একান্তের ছবি প্রকাশ করে দিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে ছেলেটি সত্যিকার অর্থে মেয়েটিকে ভালবেসেছিলো? যে ভালোবাসে সে কোনদিন ভালোবাসার মানুষের ক্ষতি চাইতে বা করতে পারে না। মেয়েটি হয়তো ভুল ছেলেকে ভালবেসেছিলো। কিন্তু সে তো একজন শিক্ষিত মেয়ে, কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। তবে সে কেন বেছে নিলো নিজের জীবন ত্যাগের? দোষ তো তার নয়। আসল অপরাধি রয়ে গেলো অক্ষত। কেন মেয়েটি প্রতিবাদের কথা না ভেবে, বা পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা না ভেবে বেছে নিলো আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত?

তাহলে নারী স্বাধীনতায় শিক্ষার ভূমিকা কোথায়? আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থা কি পারছে নারীদেরকে স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বা তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে?

এরকম আরো অনেক ঘটনা এটা অন্তত বুঝিয়েছে নারী স্বাধীনতা বা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন মানে কেবল তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি নয়। তথাকথিত শিক্ষা পেলেই নারীরা সচেতন হয়ে যাচ্ছে সেরকম নয়। নারীর প্রকৃত মুক্তি মানে হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা। মানসিক বয়োঃবৃদ্ধি (মেন্টাল ম্যাচিউরিটি)। যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই নারীদেরকে শৃংখলমুক্ত করতে চাই তার জন্য দরকার ব্যাপক হারে নারীর অংশগ্রহণমুলক কর্মসূচি, যেখানে নারীরা শিখবে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্পর্কে, শিখবে আর্থিক স্বচ্ছলতাকে কিভাবে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হয়? শিখাবে নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে।

আমাদের দেশে বহু নারী সংগঠন আছে যারা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সচেতনতা বৃদ্ধিতে। কিন্তু কখনো কি তারা তাদের প্রচলিত কর্মসূচিগুলোর সঠিক পথে মুল্যায়ন করে দেখেছে তা কতটা কার্যকর বা সেখানে কোথাও কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধনের প্রয়োজন আছে কিনা? তবে আজকাল সব সংগঠনই কর্মসূচি নির্ভর হয়ে পড়েছে, কার্যকারিতা তাদের কাছে বাহুল্য মাত্র।

এভাবে নারী স্বাধীনতা অর্জিত হবে না, হতে পারে না। নাম কা ওয়াস্তেই চলবে। কাজের কাজ কিছু হবে না। হচ্ছেও না। এভাবেই মিতা নুর, লোপা, বীথিরা বেছে নিবে আত্মহননের।

আমাদেরকে আরো নতুন করে ভাবতে হবে, কার্যকর কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে। বাড়াতে হবে নারীদের সচেতনতামুলক কর্মসূচী। এ শুধু গ্রামের নারীদের জন্য নয়, এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সমাজের উচ্চবিত্ত নারীদেরকেও। আনতে হবে ভিতর থেকে পরিবর্তন। বাহ্যিক পরিবর্তনে আর বেশি দূর এগোনো যাবে না। আর এ উদ্যোগে সমাজের সকল মুক্তিকামি নারী পুরুষের অংশগ্রহণ আবশ্যক।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.