কোন এক বিষণ্ণ দুপুরের গল্প

Farhana Rahman
ফারহানা রহমান

ফারহানা রহমান: শীতটা যাই যাই করেও যেন যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। আচ্ছা আজ কত তারিখ? একবার মনে হয় তিন তারিখ আবার মনে হচ্ছে, না আজ চার তারিখ। হাসি পায় মল্লিকার এত ভাবাভাবির তো কিছু নেই। মোবাইল ফোনটা চেক করলেই তো হয়। পাশে রাখা ফোনটা হাতে নেওয়ার সাথে সাথে বেজে ওঠে ক্রুইং প্রুইং ট্রুইং শব্দ করে করে। কি একটা উইন্ডোজ ফোন কিনে দিয়েছে শুভটা। দেখতে খুব বড়সড়, কিন্তু রিং টোন যেন ঠিক হাতীর চোখের মত। মিনমিনে কুতকুতে ছোট ছোট। এত আস্তে বাজে যে হাতে ফোনটা না থাকলে বুঝেতেই  পারা যায় না যে রিং হচ্ছে।

হা হা হা কিসের সাথে কিসের তুলনা? একা একাই হাসতে হাসতে ফোনটা রিসিভ করে মল্লিকা।

মল্লিকা? কোথায় তুই?

হুমম! গেস করতো কোথায় থাকতে পারি?

জানি না। আমার কথা আছে তোর সাথে। তুই কি ফ্রি আছিস?

হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ফ্রি। আয় আয়। তোর সাথে গাড়ী আছে তো, না? নাকি আমি হানিফকে পাঠাবো?

ঠিক আছে পাঠিয়ে দে।  তুই তো বাসাতেই আছিস?

আহা, আছি কোথাও, আয় না, তুই শুধু গাড়ীতে উঠে বসে থাক।। হানিফই তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।

আচ্ছা ! রুবির গলাটা এমন ক্লান্ত বিধ্বস্ত শোনাচ্ছিল কেন? মল্লিকার কাছে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে।

দুপুরে একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে মল্লিকা মাসে অন্তত দু’তিন বার এভাবে ফয়েজ লেইকের উঁচু পাহাড়ের উপর একা একা কোন একটা কোনার বেঞ্চে এসে বসে। ঠিক কবে থেকে এখানে  আসা শুরু করেছে সেটা মনে নেই।  চট্টগ্রামের পাহাড়তলিতে  দাদা বাড়ি হওয়াতে, ওখানে বেড়াতে গেলে খুব ছোটবেলা থেকেই কারো না কারো সাথে ও এখানে আসতো।

মনে আছে প্রথম দিকে যখন আসতো তখন কোন টাকা পয়সা লাগতো না জংগলময় পাহাড়গুলোতে  ঘুরে ঘুরে বেড়াতে।  তারপর দুই টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হতো। আস্তে আস্তে সেটা দশ টাকা, তারপর পঞ্চাশ টাকা হলো। তখন থেকেই মল্লিকার খুব কষ্ট হত একথা ভেবে যে ইচ্ছে করলেই আর যখন তখন একটু বাতাস খেতে এখানে আর আসা যাবে না।  তবে  এটাও ঠিক প্রবেশ মূল্য বাড়াতে সব ধরনের লোকের আসা যাওয়া আর অকারণ ভিড়ভাট্টা অনেকটাই কমেছে।  আর এখন তো দাম বেড়ে  আড়াই শ টাকাতে ঠেকেছে। ফয়েজ লেইক এখন রীতিমত একটা কমার্শিয়াল এমিউজমেন্ট পার্কে পরিণত হয়েছে।

দেশে বিদেশে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখার সুযোগ মল্লিকার  হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষের মন যেমন অনেক ভ্রমণের পর একমাত্র নিজের বাসায় এসেই শান্তি পায়, ঠিক তেমনি এ বিশেষ জায়গাটাতে আসলেই মল্লিকার মন প্রশান্ত হয়। তাই সময় সুযোগ পেলেই ও এখানে এসে বসে থাকে। আগে সাথে করে কাউকে না কাউকে নিয়ে আসতো, কিন্তু এখন আর কারো এত সময় নেই তাই ওকে একাই আসতে  হয়।

দূরপাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা লেকের উপর দিয়ে সাদা সারসের মত গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘের ভেলাতে করে মল্লিকাও হারিয়ে যায় দূর অতীতের ছেলেবেলার দিনগুলোতে। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়ে প্রথম যেদিন মল্লিকা ক্লাসের রুমে প্রবেশ করল তখনি ওর চোখ আটকে গিয়েছিল প্রথম সারির কোনার বেঞ্চে বসা পুতুলের মত ফর্সা টুকটুকে রুবির উপর।  রুবি বরাবরই অত্যন্ত শান্ত-ভদ্র আর লক্ষ্মী মেয়ে ছিল। এমনকি এখনো এত বছর পরও ওর সেই শান্ত আর সৌম্য ভাবটা রয়েই গেছে। যদিও সময় বড় নিষ্ঠুর হয়ে মানুষের উপর কি নির্দয় ছাপই না  ফেলে দেয়। সেই চোখ ঝলসানো পুতুল পুতুল মেয়েটা এখন অনেকটা মলিন। সেটাই তো স্বাভাবিক এটাই জীবনের নিয়ম ! ভাবে মল্লিকা।

একই স্কুল আর কলেজ থেকে এস এস সি আর  এইচ এস সি পাস করে রুবি চলে গেল বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে আর মল্লিকা বিয়ে-শাদী করে স্বামীর সাথে চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে সংসার পেতে বসল।  ঢাকাতে একই এলাকার সামনা-সামনি ওদের বাড়ি, তাই রুবি যখনই ঢাকায় আসত মল্লিকাও চেষ্টা করত ঐ সময়টাতে ঢাকায় বেড়াতে আসতে। এভাবেই দুজনের মধ্যে সব সময়ই বলতে গেলে যোগাযোগটা ছিল। রাসেল যেদিন রুবিকে প্রথম প্রপোজ করলো সেদিনই মল্লিকাকে চিঠি লিখে ও জানিয়ে দিয়েছিল। আর বলেছিল, ও কখনো রাসেলের সাথে অ্যাফেয়ার করবে না।  মানে কারো সাথেই কোন সম্পর্কে জড়াতে চায়না। ও বাবা মার পছন্দেই বিয়ে করবে। কিন্তু কয়েকমাস পরই দেখা গেলো রুবি রাসেল বলতে অন্ধ।  দুবছরের মাথায় পরিবারের সবার অমতে রুবির মত অতি নিরীহ লক্ষ্মী মেয়েটাই  রাসেলকে পাগলের মত  ভালবেসে বিয়ে করে ফেললো।

পাস করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে রুবি রাজশাহীতে চলে গিয়েছিল। এরপর গত বিশ বছর ধরে নানা পোস্টিং প্লেস ঘুরে ঘুরে শেষে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে পোস্টিং হয়েছে ছমাস আগে। রুবি চট্টগ্রামে আসছে শুনে মল্লিকা খুশীতে বাচ্চাদের মত করে লাফিয়ে উঠেছিল।

মল্লিকা বিয়ের পর থেকেই স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে আছে। বড় মেয়ে শুভ্রার বিয়ে হয়েছে অামেরিকায়। চার বছর হলো ও সেখানেই স্যাটেল আর ছেলে শুভ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বোনের কাছেই গেছে বছর খানিক আগে। মল্লিকার স্বামী ব্যাবসায়ের কাজে প্রায়ই দেশের বাইরে যায়, তাই মল্লিকার এখন অফুরন্ত অবসর। এরই মাঝে রুবির চট্টগ্রামে পোস্টিং ওর কাছে তৃষিত কাকের কাছে একফোঁটা জলের মতই আকাঙ্ক্ষিত মনে হয়েছিল।

চট্টগ্রামে আসার পর প্রথম যেদিন রুবির সাথে দেখা হলো ,রুবিকে বুকের মধ্যে এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল যে রুবি আরেকটু হলেই দমবন্ধ হয়ে মরে যেত বোধহয়। রুবি বুঝতে পেরেছিল মল্লিকা খুব একাকিত্বে ভুগে। এতদিন পর আবারো দুজন মধ্যবয়স্ক নারী যেন শিশুকালের সেই উদ্দাম-উচ্ছল দিনগুলোতে ফিরে গেছে। গত কুড়ি বছর স্থান ও কালের ব্যবধান যে দূরত্বের জন্ম দিয়েছিল সেটােআস্তে আস্তে কমে গিয়ে ওরা আবারো নতুন করে গভীর অনুভূতিসম্পন্ন খুব কাছের বন্ধুতে পরিণত হয়। সেই স্কুলের দিনগুলোতে যেমন সবাই ওদেরকে মানিকজোড় ডাকতো, আর কখনো যদি একজনের কোন কারণে স্কুল মিস হয়েছে তো সবার একই প্রশ্ন –

কি আজকে মানিকজোড়ের একজন কেন? আরেকজন কোথায়? কি হয়েছে অসুখ-টসুখ করেছে নাকি?

আর স্কুলের পর বাসায় না গিয়ে প্রথমেই আরেক জনের বাসায় গিয়ে হাজির।

কি রে স্কুলে যাসনি কেন?

এমনিতেই ভাল লাগছিল না। পেট ব্যাথা করছিল।

তাই নাকি? ডাক্তারের কাছে যাবি না?

নাহ! একটুতেই কি ডাক্তারের কাছে যায় নাকি মানুষ!

কেন যাবে না? আমি বড় হয়ে যখন ডাক্তার হব তখন কিন্তু সবসময় আমার কাছে আসবি। ঠিক আছে?

হ্যাঁ। তখন তো যাবোই। আমরা কিন্তু পাশাপাশি বাসায় থাকবো বুঝলি।

তা তো থাকবোই।

রুবির মত মল্লিকা কখনই পড়ালেখার ব্যাপারে এত সিরিয়াস ছিল না। তাই যত পেট ব্যাথার অজুহাত আর স্কুল ফাঁকি দেওয়া ওরই কাজ ছিল। এই ছমাস ধরে যেন ওরা আবারো সেই স্কুল জীবনের দিনগুলোতে ফিরে গেছে। প্রত্যেকদিন ফোনে কথা বলা আর দুএকদিন পর পরই দেখা করা। মল্লিকার জীবনের সেরা দিনগুলো যেন ও এসময় পার করছে। মল্লিকার ছেলেমেয়ে আর ওদের বাবাও এজন্য খুব নিশ্চিন্ত আর খুশী হয়েছে।

দূর থেকে রুবির ক্লান্ত আর ধীরগতিতে এগিয়ে আসা দেখে মল্লিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। রুবিকে এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? যদিও রুবির সাথে এবারে চট্টগ্রামে দেখা হওয়ার পর থেকেই মল্লিকার কেমন যেন সন্দেহ লেগেছিল। ওকে দেখে মনে হয়েছিল কেমন প্রাণহীন নির্জীব একটা মানুষে পরিণত হয়েছে। কেমন বুড়োটে আর দুঃখী দুঃখী হয়ে গেছে একসময়ের পুতুলের মত সুন্দরী মেয়েটা। মল্লিকা প্রায়ই ওর কাছে কেমন আছে জানতে চাইতো। কিন্তু রুবি সব সময়ই এড়িয়ে যেত আর নিজের প্রফেশনাল ব্যাস্ততা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, কাজের লোকের সমস্যা , বাচ্চাকাচ্চা বড় হয়ে গেলে ও কোথায় কোথায় যাবে, আর কি কি করবে, ওর কোন অর্কিডে কি রকম ফুল ফুটেছে, এসব নিয়ে কথা বলতো। তাই খুব ব্যক্তিগত আর রাসেল ভাইয়ের সাথে ওর পারস্পরিক বোঝাপড়া ঠিক কেমন সেটা মল্লিকা বুঝে উঠতে পারছিল না। কিন্তু মনে মনে কেমন একটু অস্বস্তি ঠিকই হচ্ছিল।

রুবি কাছে এসে মল্লিকার কাছে বসে। কোন কথা বলতে পারে না ও, শুধু একনাগাড়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। হাসির মত কান্নাও খুব সংক্রামক। কোনকিছু না জেনেই মল্লিকাও চোখের জলে বুক ভাসায়।

কি হয়েছে বল না? কাঁদতে কাঁদতে জানতে চায় মল্লিকা?

এবার রুবি ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নিজের জামা গলার কাছ থেকে হাত দিয়ে সরিয়ে দেখায়। পিঠের  মধ্যে বড় বড় কালশিটের দাগ দেখে হাউ মাউ করে চিৎকার করে রুবিকে জড়িয়ে ধরে মল্লিকা।

কেন কেন মেরেছে এমন করে? মল্লিকার বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা কার কাজ।

ও ফেসবুকে কার সাথে যেন চ্যাটিং করছিলো। ফোন রেখে বাথরুমে গেছে বলে আমি একটু ফোনটাকে হাতে নিয়ে দেখছিলাম। এসে দেখে আমার হাতে ফোন আর সাথে সাথে খামচি মেরে ফোনটা ছিনিয়ে নেয় আমার হাত থেকে। দ্যাখ কি করেছে আমার হাতের অবস্থা। বলে রুবি হাতটা দেখায়।

তারপর?

আমি জানতে চাই ও এমন করলো কেন? এতেই ক্ষেপে গিয়ে আমাকে চুল ধরে মাটিতে আছাড় দিয়ে ফেলে এমনভাবে হাত দিয়ে আর কনুই দিয়ে মারল। দ্যাখ আমার কি অবস্থা করেছে।

এরকম কি প্রায়ই করে নাকি? মল্লিকা জানতে চায়।

হ্যাঁ। পান থেকে চুন খসলেই ওর গালাগালি আর খিস্তি-খেওর শুনতে হয়। আর আমি যদি কিছু একটা বলি সাথে সাথেই বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে আমাকে কিছু রাখে না। বলেই ও মল্লিকাকে আরও কিছু বেল্ট দিয়ে মারার কালশিটে দাগ দেখায়।

এসব কবে থেকে শুরু করেছে?

রিসা হওয়ার পর থেকেই ও প্রথম মদ খাওয়া শুরু করে। এরপর থেকে ক্লাবে যাওয়া, জুয়া খেলা রাত করে বাসায় আসা সবই করছে।

এত বড় একজন ডাক্তার হয়ে এরকম লাঞ্ছিত জীবন তুই কেন মেনে নিচ্ছিস রুবি?

কি করবো বল? আমাকে তো ও নিঃস্ব করে দিয়েছে। দিনরাত কষ্ট করে এত এত টাকা রোজগার করেছি, আর সেটা নিয়ে ও জুয়া খেলে উড়িয়েছে। এখন ছেলেমেয়ে নিয়ে এবয়সে কোথায় যাবো বল?

স্তব্ধ হয়ে গেছে মল্লিকা। গলার ভিতর বাতাস জাতীয় কিছু এসে দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে । নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। দূরের আকাশে সূর্য অস্ত নিচ্ছে। কি মায়াবি স্নিগ্ধ আর করুণ হয়ে উঠেছে চারপাশ। মাথার উপর সোনালী রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে আকাশটা আর ঠিক তার নিচে পাহাড়ের কোনায় বসে দুজন মধ্যবয়সী রমণী দুজন দুজনকে বুকে চেপে ধরে অঝোরে কেঁদে চলেছে ।।

ফারহানা রহমান

১৫.১০.২০১৪

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.