ও পরের বাড়ির মেয়ে বলে!

Sebika
সেবিকা দেবনাথ

সেবিকা দেবনাথ: নিজের মেয়ে-মেয়ের জামাই যা করলে একজন মায়ের মন আনন্দে-আহ্লাদে আটখানা হয়, ওই একই কাজ ছেলে-ছেলের বৌ করলে মায়েদের মন ‘গেল’ ‘সব গেল’ বলে হাহাকার করে ওঠে। ভাবতে থাকে ছেলে বুঝি পর হয়ে গেল। মেয়ের জামাইয়ের বেলায় ‘অনেক পূণ্যের ফলে এমন জামাই পাইছি’ এই বাহবা জুটলেও বৌকে যদি ছেলে কিছুটা প্রাধান্য দেয়, তখন তার ক্ষেত্রে জোটে ‘বৌ পাগলা’ উপাধি। যাদের শিক্ষার বহর নিতান্তই কম তারা তখন বলেন ছেলে ‘বেইট্টা বা মাইয়া (মেয়েলিপনা)।

আচ্ছা শাশুড়িদের কাছে ছেলের বৌ কেন ‘মেয়ে’ হয়ে উঠতে পারে না? এর দায়টা কি শুধুই ওই মেয়েটির?

মার সঙ্গে কয়েক মাস আগে নরসিংদী গিয়েছিলাম। ২৭/২৮ বছর আগে যে ভাড়া বাড়িটায় আমরা থাকতাম সেখানে। অনেক পাল্টে গেছে সেখানকার পরিবেশ। যাদের সঙ্গে খেলতাম তারা এখন পুরোদস্তুর সংসারি। পাশের বাড়ির দিদা এখনও বেঁচে আছেন। পাঁচ ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি-নাতনি নিয়ে তার পরিপূর্ণ সংসার। একমাত্র মেয়েও স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই আছে।

আমাকে-মাকে দেখে দিদার সে কি খুশি! এই কথা-সেই কথা কত কথা। দিদার ছোট ছেলে (রঞ্জন) বয়সে অনেক বড় হলেও কাকুর সঙ্গে গাছে চড়া, ফুল-পেয়ারা-কুল পাড়া, বাজারে যাওয়া ছিল আমার নিত্য দিনের ব্যাপার। তাই সখ্যতাও বেশি। কথার এক পর্যায়ে কাকুর কথা জানতে চাইলে দিদা ঠোঁট মুখ বাঁকা করে বললো; ‘ওর কথা আর কইস না। ব্যবসা করে। কোন আয়-উন্নতি নাই। থাকবো কেমনে, খালি বৌ আর শ্বশুর বাড়ি। পুরাই বেইট্টা। ওযে কেমনে আমার পোলা হইলো আমি তা-ই ভাবি।’

দিদার কথায় আমি আর মা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলাম। দিদা নিজের মতো করে বলেই যাচ্ছেন, ‘সারাদিন বৌয়ের লগে গুতুর গুতুর করে। মাইয়া মাইনষের মতো কাপড় ধুইবো। বৌরে মশারি খাটায়ে দিবো।’

আমার বেশ মনে আছে কাকুকে মাঝে মাঝে দেখতাম দিদার কাজে সাহায্য করতে। চাপ কল থেকে জল তোলা, ভারি ভারি কাপড় কাঁচা, ঘরের ঝুল ঝাড়া, ঘর মোছার কাজসহ টুকটাক কাজ কাকু করে দিতো দিদাকে। বিশেষ করে পূজা ও পহেলা বৈশাখের আগে। যখন ঘর-দোর পরিস্কার করতে হুলস্থুল পড়ে যায়। আর সেই দিদা এখন বলছে কাকু ‘মাইয়া’?

পিসির (দিদার মেয়ে) কথা জানতে চাইলেই দিদার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘তোমরা যাওয়ার পরপরই কলির বিয়া হইছে। জামাইয়ের বাড়ি নোয়াখালি। জামাই খুব ভালো  পাইছি গো বৌ। কলির একটাই মাইয়া। আর বাচ্চা-কাচ্চা হয় নাই। জামাইয়ের লগে কলি কুমিল্লায় থাকে। কলিতো প্রতিদিন ফোন করবো। জামাইও প্রায়ই আমার খোঁজ-খবর নেয়। কলিরে তো দেখছো বৌ, ওই মাইয়া কি ঘরের কোন কাজ-কর্ম করছে জীবনে? জামাই ভালো না হইলে কি ওই মাইয়া সংসার করতে পারতো? এখনও সংসার সামলাইতে পারে না। জামাই-ই সব ম্যানেজ করে’।

কলি পিসির বর শ্বশুর বাড়ির খোঁজ খবর নেয়, পিসিকে সাহায্য করে, তাতে দিদার খুব আনন্দ। আর রঞ্জন কাকু যখন তার বৌকে কাজে টুকটাক সাহায্য করে, শ্বশুর বাড়ির খোঁজ নেয় তখন দিদার কষ্টের সীমা থাকে না। রঞ্জন কাকু দিদার ছেলে এটা ভাবতেই নাকি তার কষ্ট হয়। কি অদ্ভুত!

কয়েক দিন আগে বান্ধবী লুবনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম তার বাবার বাসায়। লুবনার মা সরকারি চাকরি করেন। তার পদমর্যাদাও ভাল। বাবাও সরকারি চাকুরে। বান্ধবী ও তার ছোট ভাই রুমেন দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। কথা প্রসঙ্গে লুবনার মা বললেন, ‘বুঝলে মা মেয়েই ভালো। লোকে বলে বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। এখনতো দেখছি বিয়ের পর মেয়েরা না, ছেলেরাই পর হয়ে যায়। বাবা-মার চেয়েও ছেলেদের কাছে শ্বশুর বাড়িই আপন।’

বেকুবের মতো আমি হাসলাম। রুমেন কোথায় জানতে চাইলে লুবনা উত্তর দিলো, সে তার বৌকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে। কিছু না ভেবেই আমি বললাম, ‘আহা। রুমেনের বৌ দেখতে এলাম আর তা-ই হলো না’।

আমার কথাটা লুফে নিয়ে লুবনার মা বললেন, ‘ওর বৌরে আমরাই তো ছুটির দিনে বাসায় পাই না। হয় কেনাকাটা, নয় বৌ নিয়ে শ্বশুর বাড়ি। আমি আর তোমার কাকা তো শুক্র-শনিবার ছাড়া ছুটি পাই না। সবাই মিলে যে একটা দিন আনন্দ করবো, তারও কোন উপায় নাই। ছুটির দিনে লুবনাটা একটু আসে, নইলে তো সারাদিন ওই টোনাটুনিই বাসায়’। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বললাম, হিসাব তো ঠিকই আছে। ছুটির দিনে লুবনা যেমন তার বাবার বাড়ি আসে, তেমনি রুমেনের বৌ তার বাবার বাড়ি যায়। হিসাব বরাবর।

ঈদের ছুটি ও লক্ষ্মী পূজায় বাড়ি গিয়েছিলাম। গ্রাম সম্পর্কে তিনি আমার জেঠী (বড় চাচি) হন। লক্ষ্মী পূজার নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন আমাদের বাড়ি। আমাকে দেখে বললো, ‘ও তুই আইছস? ভালা হইছে। থাকবিনি কিছুদিন? তোর অপিস ছুটি না এহন? আমগর বাড়ি যাইস। মনি (জেঠীর মেয়ে) আইছে পূজায়’।

আমার মার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘পূজা-পার্বনে মাইয়ারা বাবার বাড়ি নায়ৈর না আইলে ভালা লাগে, ক ছে লিপির মা (লিপি আমার বড় বোনের নাম)? হুন তোরা কইলাম সবাই যাবি লক্ষ্মী পূজার দিন আমগর বাড়ি।’

আমি জেঠীর ছেলে সুভাষ দা’র বৌ শোভা বৌদি কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই জেঠী ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো।

‘ওমা! হেই কি লো কয় লিপির মা? নিপার মা (সুভাষ দা ও শোভা বৌদির মেয়ে) কই যাইবো? পূজা-পার্বণের দিন বাড়ি খালি কইরা বাড়ির বৌ কই লো যাইবো?’

শোভা বৌদির কথা একটু বলতে ইচ্ছা করছে। অল্প শিক্ষিত শোভা বৌদি স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করে। জেঠীর অভাবের সংসার তার জন্যই কিছুটা স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছে। আশেপাশের বাড়ির সবার সঙ্গেই বৌদির বেশ সখ্যতা। অল্প শিক্ষিত হলেও বৌদির বিচার-বুদ্ধি অনেক উন্নত। জেঠীর কথায় কি বলবো ভেবে পাইনি। উৎসবে নিজের মেয়েকে নায়ৈর আনলেও বাড়ির বৌকে নায়ৈর দেয়া যাবে না। দিদা ও জেঠীর কথাটা কোন রকমে মানা যায়। কারণ দিদা অনেক আগের যুগের মানুষ। অনেক পুরাতন ধ্যান-ধারণাই তিনি আঁকড়ে বসে আছেন।

আর জেঠী? তার পেটে বিদ্যা বলতে ভাল গীত (ধর্মীয় গান) গাওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু লুবনার মা? তিনি তো শিক্ষিত। ভালো চাকরি করেন। সমাজের উচ্চপর্যায়ের অনেক নামি-দামী-শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে তার ওঠা-বসা। তিনিও তো দিদা ও জেঠীর মতোই ভাবেন। তবে সবাই যে এক রকম তাও কিন্তু না।

নিজের মেয়ের জামাই মেয়ের কাপড় ধুয়ে দিলে, মশারি টাঙ্গিয়ে দিলে, ছুটিতে শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে এলে, খবরাখবর নিলে সে বেলায় ধন্যি ধন্যি পড়ে যায়। আর ওই একই কাজ যখন নিজের ছেলে করে, তখন তার বেলায় ধিক্কার কেন? বৌ পরের বাড়ির মেয়ে বলে?

তাই কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন;  যে কাজের জন্য অন্যকে বাহাবা দেয়া যায়, তা যখন নিজের বেলায় ঘটে, তখন যেন মাথার উপর আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে।

লেখক: সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.