প্রবাস জীবনের অলি-গলি পেরিয়ে-২

Love storyরওশন আরা বেগম: টরন্টোর এই মেগাসিটিতে সবে মাত্র প্রবেশ করেছি। গায়ে লেগে থাকা দেশ থেকে বহন করে নিয়ে আসা হালকা আভিজাত্যের আবাসটুকু তখনো ঝেড়ে ফেলতে পারিনি। চোখে মুখে লেগে থাকা স্বপ্নগুলো একটু একটু করে বাস্তবতার কাছে এসে হোঁচট খেতে শুরু করলো। ঠিক এই সময়ে এই শহরে এক অদ্ভুত মানুষের সাক্ষাত পেয়েছিলাম।

পেশা ও কাজের সূত্র ধরে তার সাথে আমার পরিচয়। তিনি হলেন নারী, ইরান থাকে বিতাড়িত হয়ে এই শহরে প্রবেশকারী এক সংগ্রামী নারী।

আজ থেকে ৩০/৩৫ বছর আগে এই শহরে আসেন। নাম তার সুরাইয়া, বাবা মায়ের দেওয়া এই নামটি আজ আর নেই। ইতিহাসের পাতা থেকে এই নামটি মুছে ফেলে নিজেকে নতুন ভাবে প্রকাশ করেছেন। সুসান ট্রিট তার বর্তমান নাম। বাস তার ইহুদী পরিবারে। টরন্টোর ইহুদী কমিউনিটিতে তার বেশ সুনাম ছিল। মিস্টার ট্রিটের সাথে ২০/২৫ বছর যাবত বসবাস করছিলেন। ৭২ বছর বয়স্ক মিস্টার ট্রিটও এক অসাধারণ লোক। এক সময় তারা দুজন ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হয়েছিলেন। দুজনের বয়সের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও সম্পর্ক ছিল বেশ গভীর।

একদিন সুসান ট্রিট আমাকে ডেকে বললেন, You are my close friend, you can call me Suraia that name I lost 30 years ago. Now you have right to call me by this name. এই ভাবেই শুরু হলো সুরাইয়ার কাছে যাওয়া। অতীতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পাতাগুলো এক এক করে আমার কাছে উন্মুক্ত করে তুলে ধরে। আমিও তৃষ্ণার মত পান করে করে একান্ত কাছে যেতে পেরেছিলাম।

সুরাইয়া ছিলেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার জ্ঞানের গভীরতা অনেক ব্যাপক, যা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। একদিন তিনি ইরানে ফেলে আসা জীবনের কাহিনীগুলো বলা শুরু করেন। শিক্ষকতাকালীন ভালবেসে এক ছেলেকে বিয়ে করেন। সেখানে তার এক মেয়ের জন্ম হয়। এই মেয়ের জন্মের পরেই শুরু হলো জীবনের পরিবর্তন। আস্তে আস্তে সে তার ভালবাসার মানুষটির মধ্যে অন্য আরো কিছু নারীর জায়গা দেখতে পেল। সুন্দরী সুরাইয়াকে সামনে রেখে গোপনে আরো অনেক নারীর সাথে তার সম্পর্ক চলতে থাকে। এটি হলো তার বৈবাহিক জীবনের দ্বন্দ্ব। অপর দিকে স্বৈরাচারী খোমেনীর উত্থান। নারী শিক্ষক হিসাবে তার উপর অত্যাচার শুরু হলো। অর্থাৎ সর্ব ক্ষেত্রে নারীকে বন্দী করে রাখার চেষ্টা চললো।

দুদিক থেকে বিপদ এসে তার জীবনকে কেড়ে নেবার উপক্রম হলো। স্বাধীনচেতা এই নারীর সামনে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইলো না। অবশেষে দুবছরের বাচ্চাকে নিয়ে গোপনে কানাডার পথে পাড়ি জমান। আর এই টরন্টোতে এসে শুরু হলো আরেক নতুন সংগ্রাম। আমি এসে সাক্ষাত পাই তার সংগ্রামী জীবনের শেষ প্রান্তে।

এখন তার কোন সংগ্রাম নেই। দুই বছরের সেই মেয়েটি আজ অনেক বড় হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ভাল চাকরি করছে স্বামী ছেলে-পিলে নিয়ে অটোয়ায় তার স্থায়ী আবাস গেড়েছে। মাঝে মাঝে সে ওখানে বেড়াতে যায়। তবে বেশী দিন সেখানে থাকা হয় না। মিস্টার ট্রিটের সাথে সুরাইয়ার কোন বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু তাদের সম্পর্কটা অনেক বৈবাহিক সম্পর্কেরও ঊর্ধ্বে। দুইজন বিশ্বস্ততার সংগেই ২০/২৫ বছর এক সংগে বাস করছে।

আমার চোখে তারা দুইজনেই ছিলেন সত্যিকারের আলোকিত মানুষ। অথচ বিয়ে করে এক টুকরো কাগজকে সামনে রেখেই বিশ্বাস আনা যায় না। বিশ্বাস আনতে কোন কাবিননামারও দরকার হয় না। তাই আমি এই প্রথম দেখতে পেলাম কাবিননামা বিহীন জীবনযাত্রায় মানুষ সুন্দর হলে জীবন কত সুন্দর হয়।

আমাদের সমাজের মেয়েরা পুরুষ দ্বারা নানাভাবে নির্যাতিত। সমাজে রক্ত চক্ষুর ভয়ে তারা ভাঙ্গতে পারে না। নীরবে মেনে নিয়ে জীবনটা চালিয়ে দেয় অন্যের আকার ধারণ করে। তাই ঐ ইরান থেকে আসা সুরাইয়া তার কাবিন নামার কাগজটি টুকরো টুকরো করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে কাবিন নামাহীন আরেক নতুন জীবনের যাত্রা শুরু করেন।

একদিন তিনি আমাকে বলেন- আমার মত মেয়েদের সাথে যে পুরুষেরা প্রতারণা করতে পারে, সে দেশের মানুষ আর মানুষ না। ইরানে তিনি কোনদিন আর ফিরে যাননি। কিন্তু এই মধ্য বয়সে এসেও দেশকে ভুলতে পারেননি। দেশে ফেলে আসা আত্মীয় স্বজনদের জন্য এখনও তিনি চোখের জল ফেলেন। ঐ মাটিতে তার একটি শিকড় ছিল। সেটি ছিন্ন-ভিন্ন করে নতুন মাটিতে এসে নতুন করে তা তৈরী করার স্বপ্ন দেখে ছিলেন। এই যাত্রায় তিনি সফল হয়েছেন কিনা তা আমি জানি না, তবে তার ব্যক্তিগত সাফল্য আমি দেখেছি। সামগ্রিক সাফল্য হয়তো আজও আসেনি।

তাদের মধ্যে কোন ধর্ম ছিল না। মুসলমান হলেও ধর্মের কোন কিছুই তার মধ্যে কোন দিন দেখি নাই। মিস্টার ট্রিট ইহুদী  হলেও ইহুদী ধর্মের কোন কিছুই তার মধ্যে দেখি নাই। সুরাইয়া আমাকে একদিন বলেন –৩৫ বছর টরন্টোর জীবনে একবার তিনি মসজিদে যান। মসজিদের ইমাম সাহেবের কথাবার্তা শুনে রেগে মুখের উপর কথা শুনিয়ে বের হন। সেখান থেকে ধর্মের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেন। এইভাবেই জীবন থেকে ধর্মের লেবাস মুছে ফেলেন। শিক্ষক হিসাবে ইরানের মানুষকে তিনি যেটুকু দিতে পারতেন, তার থেকে ইরানের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। ভুল রাজনীতির কারণে জাতি মেধাশূন্য হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এইভাবে মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে।

সুরাইয়ারা ভুল করে না, ভুল রাজনীতি ও ভণ্ড পুরুষের শিকার হয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়। এতে সে তার জীবনটা বাঁচিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে সমাজ হয়েছে নিঃস্ব। এইভাবে বঞ্চিত মানুষেরা ভুল রাজনীতির কারণে আরো বঞ্চিত হচ্ছে। সুরাইয়া এই সমাজে এসে নিজেকে খুব সুখী মানুষ ভাবতে পারেনি কোনদিনও। ফেলে আসা বন্ধন যে কত শক্তভাবে বেঁধে আছে তা দেশ সম্পর্কে আলোচনা শুরু করলেই বেরিয়ে আসতো। এই সমাজে বেড়ে ওঠা তার নিজের মেয়েটির সঙ্গে তার বন্ধন কি রকম তা আমার জানা না। তবে তাদের ঐ ফেলে আসা সমাজের মত নয়। একেবারেই ভিন্ন ভাবে এই মাটিতে গড়ে উঠেছে। সুরাইয়ার আবেগ অনুভুতির মধ্যে আমাদের দেশের নারীর আবেগ অনুভুতির ছাপ দেখতে পেতাম, যা তার মেয়ের থেকে একেবারেই ভিন্ন।

মিস্টার ট্রিটের কাছেই নিজের মত করে থাকতে চান। ৭২ বছর বয়সেই মিস্টার ট্রিটের দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। মাসে দুইবার ডাইলোসিস করতে হয়। এরপরে হার্টেও সমস্যা রয়েছে। এই নিয়ে সুরাইয়াকে বেশ দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। হঠাত একদিন বাসায় ফোন করি। মিস্টার ট্রিট আমাকে জানালো সে অটোয়ায় চলে গেছে। আর হয়তো ফিরবে না। এই কথা শুনার পর আমি ভাবতে থাকি এটি কি করে সম্ভব হলো! এর দুই দিন পরেই ফোন করে জানতে পারলাম, সুরাইয়া ফিরে এসেছে। আমি যখন তাকে বললাম, তুমি নাকি মেয়ের কাছে একেবাই চলে গেছো, তখন সে আমাকে বললো তোমার কি মনে হয় আমি এই কাজ করতে পারি? আসলে কিডনি নষ্ট হয়ে সে মানসিক রুগীতে পরিণত হয়েছে। এই ছিল তার সেই দিনের সরব অভিযোগ।

এর পরে ব্যস্ততার কারণে অনেক দিন যাবত তাদের খোঁজ খবর নিতে পারিনি। হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম মিস্টার ট্রিট হাসপাতালে। পরিবা সহ সবাই মিলে দেখতে গিয়েছিলাম, তখন বেশ কিছুটা সুস্থ্। এরদুই-তিন দিন পরে খবর আসে মিস্টার ট্রিট আর বেঁচে নেই। ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় নিয়ে তাকে কবর দেয়া হয়। এই শোক কাটাতে সুসান ট্রিটের অনেক দিন সময় লাগে। এরপর একদিন টরন্টোর বাথার্স্ট স্ট্রিটে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি।

দেখে মনে হলো শোক তিনি এখনও কাটাতে পারেননি। দুই বেড রুমের একটা কন্ডোমনিয়ামে থাকেন তিনি। মিস্টার ট্রিট মারা যাবার পর সুসান ট্রিট বড়ই একাকি হয়ে যায়। একদিন আমাকে জানালেন, তিনি বাসাটা বিক্রি করে দেবেন। অটোয়ায় গিয়ে মেয়ের বাড়ীর আশেপাশে ছোট একটা ছোট  বাসা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান, তবু মেয়ের শত অনুরোধেও মেয়ের বাড়ীতে উঠবেন না।

বৃদ্ধ বয়সের দেহটাকে ভর দেয়ার জন্যে একটা লাঠি যেমন লাগে, তেমনি জীবনের অনেক চাহিদার কারণে একটা মনুষ্য অবলম্বনও খুঁজে ফেরে বৃদ্ধ চোখ। সুরাইয়ার কাছে তার মেয়ে সেই অবলম্বন, কিন্তু আত্মসন্মান বোধের লৌকিক কারণে তাকে মেয়ে-জামাইয়ের কাছে আশ্রয়ের কথা ভুলতে হয়।

একদিন হঠাৎ সুরাইয়ার ফোন, তার বাসায় যেতে হবে। গেলাম বিকেলে। আমাকে জানালেন-ঘরের সব জিনিস পত্র সরাতে চান। আমাকে স্টোর রুমে নিয়ে গেলেন। দেখিয়ে বললেন- তোমার যা যা পছন্দ হয় নিয়ে যাও। ওই সময় আমার প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের দরকার ছিল না। আগেই বলেছি মিস্টার ট্রিট ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার কাজে প্রায় প্রতিমাসে লন্ডনে যেতেন। তাই অধিকাংশ জিনিস লন্ডন থেকে কেনা। আমি তার স্টোর রুমে না গেলে বুঝতেই পারতাম না যে তার সংসার জীবনটা এত সুশৃঙ্খল ও পরিপাটি। প্রতিটি জিনিসের জন্য আলাদা আলাদা স্টোর রুম রয়েছে। একটা স্টোর রুমে শুধু মিস্টার ট্রিটের প্রায় এক শত নতুন স্যুট প্যান্ট, আরেকটি রুমে তার ১৫/২০ সেট জুতা, আরেকটি রুমে তার সৌখিন কিছু কালেকশন। এটি গেল মিস্টার ট্রিটের স্টোর রুম। এরপর সুরাইয়া আমাকে নিয়ে যান তার নিজের স্টোর রুমে। সেখানে রয়েছে আরেক ধরনের জিনিস, যা দেখে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ি। সারা জীবন তারা শুধু বিদ্যাই অর্জন করেননি। এর সাথে তাদের আরো অনেক কিছুই ছিল।

সুরাইয়া ভাবতে পারেনি যে মিস্টার ট্রিট এত তাড়াতাড়ি মারা যাবে। আমাকে সুরাইয়া রোজ বলেই ডাকতেন। আমাকে বলেন-আমি জানি তোমার ঘরে জায়গা নেই তবে এই সব জিনিসপত্র আমাকে সরিয়ে ফেলতে হবে। মিস্টার ট্রিটের সব কিছু আমি সলভেশন আর্মিকে দান করছি, আর আমার কিছু প্রিয় জিনিস তোমাকে দিবো। তার প্রিয় এক সেট সবুজ ডিনার সেট আমার জন্য প্যাকিং করে আগেই রেখেছেন। আর কিছু ক্রকারিজ, যা তিনি এক সময় শখ করে কিনে রেখে ছিলেন। এইগুলো আজও আমার ঘরে সাজানো রয়েছে।

আমাকে আরো বললেন, আজ আমি বড়ই একা হয়ে গেছি। এই সব জিনিস বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। এখন আমি সব কিছু থেকে মুক্ত হতে চাই। এই টরন্টোতে এসে আমি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। তার রুচি, তার ভাবনা, তার জীবনবোধ সব কিছুই আমাকে তীব্র ভাবে আকর্ষণ করতো। আমাকে তিনি কেন পছন্দ করতেন তা জানি না, তবে অবাংগালীর কাছে আমি কেন জানি বেশ প্রিয় হয়ে যাই। তবে আমার এক কাজিন আছে। আসা যাওয়ার থেকে ফোনেই বেশী কথা হয়। কারণ কি জানেন? আমার সংগে ফোনে কথা বলতেই তার খুব ভাল লাগে।–আর বলে আমার কথায় নাকি মাদকতা আছে যা তাকে কাছে টানে। কিন্তু বাঙ্গালী কমিনিউটির ভিতরে যাওয়ার দক্ষতা আজও আমি অর্জন করতে পারি নাই। এটি আমার চরম ব্যর্থতা। যাই হোক সুরাইয়ার প্রসংগে আবার ফিরে আসি।

সব কিছু পরিস্কার করে কন্ডোটি বিক্রি করে সুরাইয়া অটোয়ায় চলে যায়, আর আমিও ঐ সময়ে টরন্টো ছেড়ে হ্যামিল্টনে চলে যাই আমার জামাইয়ের চাকরির সূত্র ধরে। এরপর থেকে তার এর কোন খবর পাই নাই। অসতর্কতার কারণে তার মেয়ের ফোনটি হারিয়ে ফেলি। মুভিং এর কারণে আমিও তাকে আমার নতুন ফোন নম্বরটি দিতে পারি নাই। আর কোথাও তাকে খুঁজে পাই নাই। বেঁচে আছে কি না তাও জানি না, কিন্তু স্মৃতিগুলো আমার সংগেই আছে। সুরাইয়ারা পৃথিবীর থেকে একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে না। কারও না কারও মনে দাগ কেটে দিয়ে যায়, যে দাগ কোন কিছু দিয়ে মুছা যায় না। সে আমার মনেও দাগ কেটে দিয়েছে যা আমি আজও বহন করে চলছি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.