রোজ নামচা- ২৬

Su
মিয়াট সু

লীনা হাসিনা হক: একমাস থাকবো কোপেনহেগেনে। কোপেনহেগেন আমার সবথেকে পরিচিত ইউরোপিয়ান শহর যদিও জীবনের খানিকটা সময় প্রিয় অ্যামস্টারডামে কেটেছিল অনেকবছর আগে।

যে সংস্থায় কাজ করি তার হেড অফিস কোপেনহেগেনে। আগে প্রতিবছর একবার আসতাম। বিশ্বমন্দায় আমাদের সংস্থার বাজেট কাটের পর থেকে দু বছরে একবার আর যদি কোন মিটিং থাকে তাহলে আসা হয়। এবার এসেছি একমাসের মতন থাকতে, মিটিং-মিছিলের বাইরেও কিছু কাজ করবো এখানে।

পৌঁছেছি অক্টোবরের ৫ তারিখ সন্ধ্যায়। কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে অফিসের থেকে আমাকে নিতে আসা স্টুডেন্ট ইন্টার্নের সাথে পৌঁছুলাম আমার অস্থায়ী ঠিকানায়। বেশীদিন থাকবো বলে হোটেলে নয়, আমার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে সার্ভিস এপার্টমেন্টের। দুই বেডরুম, কিচেন, বড় একটা বাথরুম, সিটিং রুম আর বেলকনিসহ এপার্টমেন্ট। নিজেকে রান্না করে খেতে হবে। অবশ্য গ্যাস ওভেন থেকে শুরু করে কিচেনের যাবতীয় সরঞ্জাম আর কাপড় ধোয়ার মেশিন এবং ইস্ত্রি দেখে হাঁফ ছাড়লাম।

সন্ধ্যায় আমার সাথে যোগ দিলো ডানিডা ফেলো মিয়াট সু। মিয়ানমারের মেয়ে।  পঞ্চাশের ঘরে বয়স। কৃষিবিদ। ডানিডার একটি প্রোগ্রামে এসেছে। আমিও পার্টলি যোগ দিব ওই প্রোগ্রামে, তাই সু আমার সাথে এপার্টমেন্ট শেয়ার করবে। ভাবলাম ভালোই হল, একা থাকার চেয়ে সন্ধ্যেবেলা বাড়ী ফিরে একজন সঙ্গী তো পাওয়া যাবে। তাছাড়া সু যেহেতু এনজিওতে কাজ করে, কথাবার্তায় অসুবিধা হবে না।

তবে খেয়াল করলাম সে খুবই হালকা গড়নের, আর কি যেন একটা আছে অথবা নাই সু’র মধ্যে, ঠিক বুঝতে পারলাম না। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি, বেশ রাতে আমার দরজায় নক, সু তার চশমা খুঁজে পাচ্ছে না। বললাম কাল সকালে দেখা যাবে, এখন ঘুমাও তো বাপু।

সকালে হুড়োহুড়ি করে অফিসে বের হয়েছি বলে সু’র সাথে কথা বলা হয়নি। সে কফি মেশিন নিয়ে কসরত করছিল, আমি কোনরকমে ব্যবহারবিধি দেখিয়ে দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাস ধরতে ছুটলাম।

অফিস থেকে ফেরার পথে বাড়ীর কাছের সুপারমার্কেট থেকে চাল, ডাল, সব্জী, মুরগী, মাসের গ্রোসারি করে ঘরে ফিরলাম। সবকিছু গুছিয়ে তুলতে তুলতেই দরজায় বেল বাজলো, সু এসেছে। দরকা খুলতেই ঘরে ঢুকে সোফার উপরে ধপাস! গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না।

আমি তাড়াতাড়ি পানি দিলাম, কিছু খাবে কিনা জানতে চাইলে সে বলল দুপুরে সে লাঞ্চ করতে পারেনি। আমি জলদি জলদি এক টুকরা রুটিতে একটু জ্যাম লাগিয়ে, একটা আপেল কেটে দিলাম খেতে।

এইবার ভাল করে তাকিয়ে দেখি, অসম্ভব রোগা একজন মানুষ, ছোট করে কাটা চুল, মঙ্গলায়েড চেহারা যেমন হয়, আর হাঁটছে একটু খুড়িয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে। আর কথাও একটু অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে।

আমি ভাত, মুরগী, ফুলকপি ভাজি আর ডাল রান্না করলাম। সু’কে বললাম ইচ্ছে করলে আমার সাথে খেতে পারে। সে জানালো, সে মিয়ানমার থেকে চাল, আচার, শুকনো মাংস আর শুটকি মাছ নিয়ে এসেছে। সাথে করে একটা রাইসকুকারও এনেছে কিন্তু রাইস কুকার ব্যবহার করতে পারে না, আমি কি একটু হেল্প করতে পারবো কিনা! কোন বৌদ্ধকে এই প্রথম মাছ মাংস খেতে দেখে একটু অবাকই হলাম। ভাবলাম পরে জিজ্ঞ্যেস করবো।

সু’র আনা বার্মিজ আতপ চালের সুঘ্রাণে ঘর মৌ মৌ করছে। ছয়জনের জন্য তৈরি খাবার টেবিলের এক কোনায় আমি আর এক কোনায় সু। খেতে খেতে গল্প করি আমরা।

সু মিয়ানমার থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রী করে থাইল্যান্ড থেকে মাস্টার্স করেছে। এআইটি থেকে এগ্রিকালচার এক্সটেনশনে। মিয়ানমারের মান্দালয় প্রদেশে বাড়ী তার। মা,বাবা আর দুই বোন আছে তার। বোনেরা বিয়ে করে সংসার করছে, কিন্তু সু বিয়ে করেনি। ইয়াঙ্গুনে থাকে। একাই থাকে। কোনদিন সে রান্না করেনি। ইয়াঙ্গুনে তাকে রান্নার কাজে সাহায্য করার জন্য কাজের লোক আছে। আর তার মা আর বোনও তাকে সাহায্য করে। সেইজন্য সে রান্না ঘরের কোন গ্যাজেট ব্যবহার করতে তেমন সরগর নয়। আমি যেন কিছু মনে না করি। আমি এই ব্যাপারে মনে কিছু না করলেও সু’র মধ্যে কি যেন একটা আছে অথবা নাই, তা নিয়ে ভাবতে থাকলাম।

মনের কোনায় একটু বিরক্তিবোধও জেগে উঠলো, এই দূর বিদেশে শীতের মধ্যে নিজেরই কষ্টের সীমা নাই, মেয়েকে রেখে এসেছি, মায়ের শরীর ভাল নাই, নানা ধরনের চিন্তা, এর মধ্যে আবার যদি বেবি সিটিং করতে হয় তাহলেই হয়েছে!

খাওয়া শেষ করে বাসনপত্র ধুতে গিয়ে সে একটা গ্লাস ভেঙ্গে ফেলল। আমি কোনরকমে ভাঙ্গা কাঁচ তুলে ময়লার বিনে ফেললাম।

সু আমাকে বলল বাথরুমের শাওয়ারের গরম পানির নবটা সে বুঝে উঠতে পারছে না। অবাক হলেও দেখিয়ে দিলাম। তারপরে বাথরুমে হ্যান্ডশাওয়ার না থাকাতে ছোট্ট একটা মগ দেশ থেকে সুটকেসে ভরে এনেছিলাম, তাকে বললাম এটাই ব্যবহার করতে, কারণ সেও খুব বিব্রত ছিল ব্যাপারটা নিয়ে। হাসলাম দুজনে এই বিষয়টা নিয়ে।

সব কাজ শেষে শরীর আর চলছে না। বললাম, সু, শুতে চললাম আমি। কাল সকালে দেখা হবে। গুড নাইট। সে আমাকে বলল, আমি যেন তাকে সাথে করে সকালে বের হই কারণ বাস চিনতে তার একটু অসুবিধা হচ্ছে, আমি দু’এক দিন হেল্প করলে সে বুঝে উঠতে পারবে।

পরদিন আমার সময়ের আরও ১০ মিনিট আগে বের হয়ে সু কে তার নির্ধারিত রুটের বাসে তুলে দিয়ে বাস ড্রাইভারকে বললাম তার স্টপেজে একটু খেয়াল করে নামিয়ে দিতে।

বিকেলে বাড়ী ফিরেছি আমি ঠিক সময়মত। বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। সু’র কোন খবর নাই, ফোন করছি আমি, শুনি ফোন বেজে চলেছে আমাদের লিভিং রুমের সোফার উপরে! মানে সে ফোন ফেলে গেছে। এদিকে প্রায় ৭ টা বাজতে চলল। বিরক্তির সাথে সাথে একটু চিন্তাও হচ্ছে, গেল কোথায়? একটু কেমন যেন এলোমেলো মানুষটি। ফোন করলাম ডানিডা সেন্টারের ক্যামিলাকে। ক্যামিলা জানালো সু তো সময়মতই বের হয়ে গেছে।  তবে ক্যামিলা খোঁজ করে জানাবে বলল।

এর মধ্যে ৮টা বাজে। কি করি ভাবছি, দরজায় বেল বাজলো টুংটুং। খুলে দেখি ভেজা বিপর্যস্ত সু। ঠিক বাসেই সে চড়েছিল, কিন্তু ঠিক স্টপেজে নামতে ভুলে গিয়েছিল, একদম শেষ স্টপেজে গিয়ে নেমেছে, পরে একজনের সাহায্যে ঠিকঠাক ফিরে এসেছে। ক্যামিলাকে জানালাম।

এদিকে মনের মধ্যে বিরক্তি, সারাদিন কাজের শেষে যদি সু কে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাহলেই হয়েছে। এখনতো আর রুমমেট বদলাতে চাইলেও পারবো না। কি যন্ত্রণায় পড়া গেল রে বাবা!

প্রতিদিন যাতে এই ঝামেলা না হয়, তার জন্য ক্যামিলাকে মেইল করলাম যাতে সে সু’র জন্য একটা চেকলিস্ট তৈরি করে দেয়, আর বাস স্টপেজের নাম আর বাস নম্বর একটা শক্ত ওয়াটারপ্রুফ কাগজে লিখে দেয়, সেটা দিয়ে সু সমস্যা এড়াতে পারবে।

শুতে গেছি। চোখ মাত্র লেগে এসেছে, দরজায় নক, সু উঁকি দিচ্ছে! কি হল আবার? না কিছু নয়, যদি আমি ঘুমিয়ে পড়ে না থাকি, একটু গল্প করা যাবে কি! ঠেলে ওঠা বিরক্তি চেপে বললাম, আচ্ছা, এসো কিন্তু আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তাহলে কিছু মনে করো না যেন।

এই এপার্টমেন্টে দুটো সিঙ্গেল বেড জোড়া দিয়ে একটা বড় বিছানা তৈরি করা হয়েছে। সু এসে আমার পাশের খাটে শুয়ে পড়লো।

এটা-সেটা টুকিটাকি দিয়ে শুরু। পরিবার, নিজের জীবন ইত্যাদি। সু ছোটবেলা থেকে পড়ালেখায় খুব ভাল ছিল। ফলে তার বোনেরা অল্প বয়সে বিয়ে করে সংসার করতে শুরু করলেও সু পড়া চালিয়ে গেছে। ইয়াঙ্গুনে অন্যের বাড়িতে জায়গীর থেকে পড়া শেষ করেছে। নিজের চেষ্টায় এআইটিতে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। পড়া শেষ করে চাকরি।

এআইটিতে একজন সহপাঠীকে সু’র পছন্দ ছিল, বিয়ে করবে ঠিকঠাক ছিল। এর মধ্যে তার চোখের সমস্যা দেখা দিলো। প্রথমে অল্প, পড়ে বেশ গভীর। সাথে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো, কিন্তু সু সেরে উঠছিল না। মিয়ানমারের ডাক্তার পরামর্শ দিলো থাইল্যান্ডে যেতে উন্নত চিকিৎসার জন্য। থাই ডাক্তার জানালো, সু’র ব্রেন টিউমার।

বাবা কিছু ধানী জমি বিক্রি করলেন সু’র চিকিৎসার জন্য। সু’র ব্রেন টিউমার অপারেশন হল। সুস্থও হয়ে উঠলো সে, যদিও বেশ কয়েকবছর লেগে গেল এতে। পুরনো চাকরিটিও রইল না। যাকে বিয়ে করার কথা ছিল সেই মানুষটিও ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত একজন মেয়েকে বিয়ে করতে চাইলো না আর।

ব্রেন টিউমার থেকে সুস্থ হলেও মানসিক ধাক্কাটা সামলাতে সু’র লেগে গেল অনেক সময়। সবাই ভেবেছিল সু’র জীবনের এখানেই ইতি। কিন্তু সু’ তো আসলে হেরে যাওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার শাসনের সময় যে মেয়েটি কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায়, ব্রেন টিউমারের মতন প্রাণঘাতী অসুখের মুখোমুখি হয়েছে অপার সাহস নিয়ে, তাকে কি হারাতে পারে কোন পুরুষের অবহেলা!

সু নুতন করে জীবন শুরু করেছে। ব্রেন টিউমার অপারেশনের পরে কথা বলতে অসুবিধা হতো। ব্যাংককে সে স্পিচ ত্থেরাপি নিয়েছে। একটু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে এখনো। নুতন চাকরি খুঁজেছে। পেয়েওছে। যদিও সহজ ছিল না মোটেও। অনেক প্রতিষ্ঠানই সু’র শারীরিক অসুবিধাগুলিকে বড় করে দেখেছে। তাকে নেয়নি কাজে। কিন্তু বর্তমান সংস্থা তার স্কিল আর পারদর্শিতাকেই বড় করে দেখেছে। সু এই সংস্থায় প্রায় নয় বছর ধরে কাজ করছে।

সু’র সংস্থা মিয়ানমারের প্রত্যন্ত এলাকায় ভূমিহীন কৃষক বিশেষ করে নারী কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। অসুখ থেকে সেরে উঠার পরে অনেকদিন সে একা একা কোথাও যেত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে সে বেশ কয়েকবার বিদেশে গিয়েছে। প্রতিবারই কাউকে না কাউকে সে পেয়েছে তাকে ভালবেসে সাহায্য করার জন্য। গত বছর সে ভিয়েতনামে গিয়েছিল কৃষিবিদদের একটি সেমিনারে, সেখানে একজন বাংলাদেশী কৃষিবিদ তাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। এইবার যখন তার ডেনমার্কে আসার কথা হচ্ছিলো, তাকে ডানিডা সেন্টার থেকে বলা হয়েছিল সে ইচ্ছে করলে আফ্রিকান সহপাঠীর সাথে থাকতে পারে, কিন্তু সু নিজে থেকে বাংলাদেশীর সাথে থাকতে চেয়েছিল।

সে জানে বাংলাদেশীরা খুব সংবেদনশীল মনের অধিকারী হয়। ভিতরে ভিতরে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। নিজেতো জানি আমি কতটা বিরক্ত হচ্ছিলাম সু’কে রুমমেট পেয়ে। হঠাৎই বুঝে উঠি আসলে সু’র মধ্যে কোন কিছু কম নাই, বরং আমিই আমার ক্ষুদ্রতার কারণে মানুষ হিসাবে সাহসী সু’র বিশালত্ব বুঝে উঠতে পারছিলাম না!

বললাম, সু, তোমার মতন সাহসী নারীকে জানতে পারাটা অনেক বড় ব্যাপার। স্বীকার করতে লজ্জা নাই যে ভেবেছিলাম তুমি আমাকে যন্ত্রণাই দিবে হয়তো। কিন্তু এখন জানি, তোমার রুমমেট হতে পেরে আমিই সৌভাগ্যবান। আমার অসংবেদনশীলতার জন্য আমাকে ক্ষমা করো প্লীজ।

বুদ্ধের অনুসারী সু স্মিত মুখে ক্ষমাশীল চোখে তাকিয়ে তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাত ধরে। সরু রোগাটে হাতের মুঠি থেকে সাহস আর প্রাণের উষ্ণতা প্রবাহিত হয় আমার মধ্যে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.