মালালার কাছে ড. আবদুস সালামের চিঠি (কাল্পনিক)

Malala 10(চিঠিটি আসলে কাল্পনিক, একজন ব্লগারের লেখনীতে উঠে এসেছে আবদুস সালাম আসলে কি লিখতে পারতেন মালালাকে নোবেল প্রাপ্তির পর। ১৯৯৬ সালে মারা যান আবদুস সালাম)

প্রিয় মালালা, এতো ঘটনার পরও আমি সবসময়ই আমার চারপাশে আশার রূপালী রেখা দেখেছিলাম। তারা আমাকে পাকিস্তানের ‘একমাত্র’ নোবেল জয়ী’ বলে পরিচয় করিয়ে দিতো, আমি নিজেও নিজেকে প্রথম বলেই ভাবতে ভালবাসতাম।

আমার জন্ম হয়েছিল ছোট্ট একটি শহরে, নাম সান্তোখ দাস। তবে এটা মোটেও তোমার সোয়াত উপত্যকার মতো সুন্দর ছিল না। কিন্তু এই শহরটিরও অনেক কিছু ছিল দেয়ার মতো। আমি বড় হয়েছি ঝাঙ শহরে, যা কিনা এখন ভয়ংকর কিছু সংগঠনের নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আমার বাবা ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা, পাঞ্জাব সরকারের হয়ে কাজ করতেন। আমার মনে হচ্ছে তোমার বাবা হয়তো তাকেঁ পছন্দ করতেন।

তোমার মতোই লেখাপড়ায় আমার গভীর আগ্রহ ছিল। ভাল লাগতো ইংরেজি আর উর্দু সাহিত্য, কিন্তু অংকে অত্যন্ত ভাল ছিলাম। খুবই অল্প বয়সে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় আমি এতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে রেকর্ড করেছিলাম।

তবে আমার পড়াশোনা কখনই তোমার মতো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। আমাকে কখনও আমার স্কুল ধ্বংসকারী তালেবানের সাথে লড়তে হয়নি, অথবা ছেলেদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ করে দেয়ার মতো ঘটনার মোকাবিলাও করতে হয়নি। কিন্তু তোমার চলার পথে যে প্রতিবন্ধকতাই ওরা তৈরি করেছে, তুমি সাহসের সাথে তা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছো।

সত্যি বলতে কী, তুমি তোমার প্রতিটি নি:শ্বাসের সাথেই ওদের সাথে লড়াই করেছো।

শান্তিতে তোমার নোবেল পুরস্কার বিজয় তোমার ওপর হামলাকারীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে, তোমার দেশের মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। এর মধ্য দিয়ে যেতে গেলে অনেক সাহসের প্রয়োজন এবং আমার বিশ্বাস, তোমার ভিতরে বিন্দুমাত্র কমতি নেই এই সাহসের।

দেশটির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তোমাকে ওরা নাজেহাল করেছে, দেশছাড়া করেছে, যখন তুমি এমন কিছুই করোনি। আমি এর কিছুটা জানি। জাতি হিসেবে আমরা আসলে সেলিব্রেট করতে চাই না। যা করতে পারি, শুধুই করুণা।

তুমি যখন ভিকটিম হলে ওরা তা নিয়েই খুশি ছিল। কিন্তু যখন তুমি সব নির্যাতন ঝেড়ে ফেলে হিরো হিসেবে সবার সামনে এলে, বিশ্বজুড়ে মেয়েশিশুদের আশা/আদর্শ হিসেবে স্থান করে নিলে, তখনই তোমার স্থানচ্যুতি ঘটলো।

আমরা তো হিরোদের পছন্দ করি না, মালালা

আমরা চাই ছিন্নভিন্ন হৃদয়, যা আমরা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারবো। আমরা চাই সত্যি বা মিথ্যা যাই হোক, উপমহাদেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উপনিবেশিক এবং সামাজ্যবাদীদের অপরাধের জন্য তাদের অপমান করতে, পদদলিত করতে। অথচ আমাদের মধ্য থেকেই ষড়যন্ত্রকারীরা যে ক্ষতি করে যাচ্ছে, তা কোনভাবেই বর্ণনা করা সম্ভব না। নিজেদের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা আছে, তা কখনই স্বীকার করতে চাই না। এর কিছুটা আমিও তো জানি।

যেদিন আমি নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলাম, সেই দিনটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। ওই অনুষ্ঠানে যখন আমি পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত হয়েছিলাম, নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে খুবই গর্ববোধ করেছিলাম। যদিও আমার দেশের এতে কিছুই যায় আসেনি।

বরং আমাকে তারা দুর্বৃত্তায়ন করেছে এবং সফলভাবে আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে দেশান্তরি করতে সক্ষম হয়েছে। কিছু ভার্সিটিতে আমাকে লেকচার দিতে দেয়া হতো না সহিংসতার হুমকির মুখে, আমার নিজের দেশের মানুষ আমার কাজ সম্পর্কে কমই জানে।

তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, নিজ দেশে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার চাইতে বাইরের দেশে কাজ করা উত্তম। আর এটা যখন আমি করলাম, তখন ‘দেশদ্রোহী’ বলে পরিচিতি জুটলো।

আর এখন একই ঘটনা তোমার সাথেও ঘটছে প্রিয় সন্তান আমার।

তুমি এখন নতুন ‘দেশদ্রোহী’

তুমি এমন একটা দেশের জন্য শান্তি ও গর্ব এনে দিয়েছো অসীম সাহস মোকাবিলা করে, যে কিনা তোমার এই পুরস্কার চায়নি কখনও। বিশেষ করে বিদ্রোহী সন্তানের মায়ের মতো তুমিও দেশকে ভালবাসার পথ খুঁজে পাবে আশা করি। আমার ধারণা, একসময় তারা তা বুঝতে পারবে। আমার সুযোগ ছিল দেশের জন্য প্রথম নোবেল পুরস্কার এনে দেয়ার। কিন্তু এখন আমরা দুজন হলাম। এবং আরও আসবে সামনে, আমার ধারণা।

তোমারই

আবদুস সালাম

(ঈষৎ সংক্ষেপিত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.