মালালার নোবেল জয়ে পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া

Malala 6উইমেন চ্যাপ্টার: মাত্র ১৭ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেল পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাই। সরকারের পক্ষ থেকে বেশ ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়েছে বিষয়টিকে। অভিনন্দন জানানো হয়েছে মালালাকে। ফেসবুক, টুইটার ভরে গেছে অভিনন্দন বার্তায়। কিন্তু পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই প্রাপ্তির পিছনে বিশাল একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন। তারা এই ঘটনাকে পশ্চিমাদের নতুন কারসাজি বলেও আখ্যায়িত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ মালালাকে পাকিস্তানের গর্ব বলে আখ্যায়িত করেছেন। এবং বলেছেন, ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই মালালার সংগ্রাম এবং অঙ্গীকার থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র অসিম বাজওয়াল টুইটারে মালালাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসীরা ছাড়া পাকিস্তানের সবাই চায় তাদের সন্তান স্কুলে যাক।

এমনকি প্লেবয় ক্রিকেটার কাম রাজনীতিবিদ ইমরান খানও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। যিনি কিনা তালেবানের প্রতি নমনীয় আচরণের কারণে তীব্রভাবে সমালোচিত দেশে-বিদেশে, যিনি কিনা তার এলাকায় মালালার আত্মজীবনী নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, সেই তিনিও মালালাকে অভিনন্দন জানাতে ভোলেননি। তিনি টুইট করেছেন: নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ায় মালালাকে অভিনন্দন জানাতে চাই। তার এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে পাকিস্তানি হিসেবে গর্ববোধ করছি। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে, যা কিনা আমাদের প্রাধান্য দেয়া উচিত’।

কিন্তু, পাকিস্তানের অন্য একটি শ্রেণীর প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। তারা সেই পুরনো তত্ত্ব হাজির করেছেন এই পুরস্কার প্রাপ্তি পিছনে। তারা বলছেন, মালালা হচ্ছে পাকিস্তানকে দমনের উদ্দেশ্যে আমেরিকান, ভারতীয় অথবা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রের চাবিকাঠি।

পাকিস্তান অবজারভার এর সম্পাদক তারিক খাট্টাকের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, নোবেল শান্তি পুরস্কারের তীব্র সমালোচনা করে ওই সম্পাদক বলেছেন, ‘মালালা খুবই সাধারণ এবং ‘ইউজলেস’ একটি মেয়ে। তার ভেতরে বিশেষ কিছু নেই। সে তাই বিক্রি করছে, পশ্চিমারা যা কিনবে’।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রক্ষণশীল সোয়াত এলাকার বাসিন্দা মালালা ইউসুফজাই মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বিষয়ে বিবিসি উর্দুতে ব্লগ  লিখে সবার নজর কাড়ে। তালেবান গোষ্ঠী যখন মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন মালালা তার ব্লগে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ক্রমেই সে তালেবান গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে। ২০১২ সালে মালালা জনসমক্ষে আসার পরই হামলার শিকার হয়। তালেবান বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি চালায়। এসময় সারাবিশ্বে এ নিয়ে জোর তোলপাড় শুরু হয়। ব্রিটেন এগিয়ে আসে চিকিৎসায়। সেখানে কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের পর মালালা সুস্থ হয়ে উঠে। এরপর থেকেই সে শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষার দাবিতে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনার হিসেবে কাজ করে আসছে।

মালালাকে নিয়ে যখন বিশ্ব গণমাধ্যমে তোলপাড় চলছে, তখন তারই স্থান সোয়াতে এমন হাজার হাজার শিশুর জীবন বিপন্ন। এই কারণেই হোক, বা রাজনৈতিক কারণেই হোক, মালালা নিজ দেশেই প্রতিহিংসার শিকার হয় ব্যাপকভাবে। তার এই জনপ্রিয়তাকে মার্কিন কূটচাল বলে অভিহিত করা হয়। বলা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটা মার্কিন-ভারতীয়-ইজরায়েলি ষড়যন্ত্রেরই অংশ।

বিশেষ করে পাকিস্তানের ইংরেজি-ভাষী মধ্যবিত্ত শ্রেণী মালালার এই উত্থানকে কখনই ভাল চোখে দেখতে পারেনি। তারা অতিমাত্রায় রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী এবং পশ্চিম সম্পর্কে সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা থেকেই মালালাকে পশ্চিমাদের ক্রীড়নক হিসেবে দেখতে শুরু করে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মালালার নাম ঘোষণার পরও তাদের একটা অংশ লেগে গেছে মালালার কুৎসা রটাতে।

মালালা একাই নয়, তার আগে ১৯৭৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ড. আবদুস সালাম। তাঁকেও মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল রক্ষণশীল মধ্যবিত্তদের, এবং কখনই তাঁকে পাকিস্তানে গর্ব বলে সম্বোধনও করা হয়নি। কারণ তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি মুসলিম সংখ্যালঘু আহমাদি গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন। মালালার মতোন তিনিও নির্বাসনে থেকেই এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।

তবে সময় বদলেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এখন নতুন প্রযুক্তি। কাজেই মালালাকে নিয়ে গর্ব করার মানুষের অভাব নেই। যারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সংখ্যা এবার হাতে গোণা। আস্থার জায়গাটি এখানেই। সবকিছুতে পশ্চিমাদের দুর্গন্ধ মাখাতে নারাজ অনেকেই।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.