‘ধর্ষণের’ সালিশ যেন আমাদের নিত্যকার কর্মস্থল

girls safetyসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: বৈঠকখানায় এলাকার প্রভাবশালী মাতব্বররা চেয়ারে বসে আছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। যেন এই মাতব্বররা বিচার সালিশ না করলে দেশ আরো বিপদে পড়বে। কি আর করা! তাই বাধ্য হয়ে এমন সালিশগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সভার সবাই পুরুষ। একজনকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়েছে। সভাপতির মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছেন ‘একজন ধর্ষক’।

এবার ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ডাকা হল। মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় একটা পিঁড়িতে বসতে দেয়া হল। সভাপতি দয়া করে কিছুটা তার কাছাকাছি বসতে বললেন। উপস্থিত সকলে মেয়েটির আপাদমস্তক দেখে ধর্ষণ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ বুঝে নিলেন। এবার একজনকে আগে থেকেই দায়িত্ব দেয়া আছে কথা শুরু করার জন্য, তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

সবাইকে দয়া করে মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ধর্ষককে বার বার একই কাজ করার জন্য কিছুটা ভর্ৎসনাও করলেন। এবার ধর্ষকের কিছু বলার থাকলে বলতে বললেন। ধর্ষক দাঁড়িয়ে সভাপতির মুখের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেন এমনটা আর কখনও করবেন না বলে। সভাপতির পাশে বসা ধর্ষকের বাবা-ভাই মাথা নাড়লেন। সভার অন্য সদস্যরা ক্ষমা চাওয়ার জন্য ধর্ষকের প্রশংসা করতে লাগলেন।

দুই একজন মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলতে থাকলেন , তোমার স্বভাব চরিত্র বদলাও। একটু রাখঢাক করে চল, যাতে আবারো ধর্ষণের শিকার হতে না হয়।

সভাপতি সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, যেহেতু ঘটনাটা সকলেই জানে, তাই আর বর্ণনা করার দরকার নাই, এবার একটা সুষ্ঠ সমাধানের পালা—। কি বলেন সবাই? সভার সবাই সম্মতি দিলেন । কিন্তু মেয়েটি চোখ মাটির দিকে করে সভার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাইলেন।

সভার সবাই সমস্বরে বললেন, তোমার সম্মানের কথা বিবেচনা করে আমরা কথাগুলো তুলতে চাচ্ছিনা আর তুমি কিনা বলতে চাচ্ছ! এমনটা কর না । এতে তোমার আরো সম্মানহানী হবে!

তারপর সভাপতি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার সম্মান আমাদের সম্মান! এসব ঘটনা কোর্টে গেলে যেমন তোমার সম্মানহানী হবে, আমরা কে তখন বেইজ্জত হতে তোমার পাশে দাঁড়াবো বলো? বাদ দাও এসব, এবার সমাধানে আসি! এবারের মতো তাকে ক্ষমা করে দাও , তার বদলে ধষর্কের অর্থদণ্ড হবে ২০ হাজার টাকা। যে টাকার মধ্যে ১০ হাজার আজকের সভার খরচ বাদ দিলে তুমি পাবে ১০ হাজার টাকা। মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেও মাথাটা মাটির দিক থেকে তুলতে পারল না। একটা আপোসনামা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে সই করতে বলা হল। অনেক শক্তি দিয়েও কলমটা ধরতে পারছিল না মেয়েটি। কাঁপা কাঁপা হাতে কোন রকমে সইটা হতেই সভার সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে সমাপ্তি টানলেন সভাপতি।

সভার খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকার এক প্যাকেট বিরানী মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দেয়া হল।  ঘটনাটি কাল্পনিক হলেও, কাকতলীয় নয়।

এই সালিশের চেয়ে তেমন কোন ফারাক ছিল না ২০১৩ সালে ৩১ জানুয়ারী রাতের কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সালিশটি। যদিও এটা কোন ধর্ষণের ঘটনার সালিশ ছিল না। তবে একজন নারীকে শব্দ দিয়ে ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করে কতটা বেআব্রু করা যায় তার কিছুই বাকী ছিল না।

সালিশের ঘটনাটির সূত্রপাত ১৯ জানুয়ারী। জেলা শহরে একজন নারী হিসেবে আমি  কোন পারিবারিক, সামাজিক পরিচয় ছাড়া সাংবাদিকতা শুরু করি ২০০৪ সাল থেকে। কেউ তখন একজন নারীকে সাংবাদিক হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না। তাই আমাকে প্রথম দিন থেকেই নানাভাবে হয়রানী হতে হয়। সমাজ তো নয়ই, পুরুষ সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশী অসহযোগিতা শুরু করে। সত্য ঘটনার রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও ঘটনার প্রতিপক্ষকে দিয়ে অযাচিত মামলা দিতে প্ররোচিত করে সাংবাদিকরাই।

কাজের শুরুতেই আমাকে চারটি মানহানির মামলায় পড়তে হয়। জেলার সকল আইনজীবীকেও প্ররোচিত করা হয় মামলায় আমার হয়ে না দাঁড়াতে। জীবনের প্রথম যেদিন আমি একটা মিথ্যা মামলায় পড়ে কোর্টে হাজিরা দিতে উপস্থিত, একজন আইনজীবী বা একজন সাংবাদিকও আমার পাশে নেই। বাদী পক্ষের হয়ে আইনজীবীরা কোর্টে জজকে জামিন না দিয়ে জেলহাজতে প্রেরণের জন্য পীড়াপীড়ি করছিল। আমি নিজেই নিজের হয়ে কথা বলে সেদিন জামিন পাই।

তাছাড়া বিভিন্ন হত্যার হুমকি, কুৎসা রটনাসহ বিভিন্নভাবে আমাকে দমিয়ে দিতে চেষ্টা করে। তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে অনেকেই বাধ্য হয়েই যেন আমাকে পেশায় মেনে নিতে শুরু করে। কিন্তু তবুও কয়েকজন সুযোগ পেলেই নোংরা বাজে কথা বলে বলে নানারকম হয়রানি করতে থাকে, যৌন হয়রানিও বাদ যায়নি।

সেদিনও প্রায় ১০/১২ জন মানুষের সামনেই ঘটনাটি ঘটায় মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ইউনুছ আলী নামের এক সাংবাদিক। কোন একটা প্রোগ্রামে যাব বলে আমন্ত্রিত সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবে জড়ো হচ্ছিল । তখনই কোন কারণ ছাড়াই তিনি আমার সামনে বসে নারীদের নিয়ে বিভিন্ন অশ্লীল কথা বলতে থাকেন। আমি না শোনার ভান করে একটা পত্রিকা হাতে নিয়ে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু তার অসংলগ্ন, নোংরা ও অশ্লীল কথা শুনে প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব নীলুসহ অনেকে প্রতিবাদ করে।

তারা বলেন, আপনি অন্তত একজন ভদ্রমহিলার সামনে এমন অশ্লীল কথা না বললেও পারেন। সাথে সাথে ইউনুছ আলী তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে আমাকে আক্রমণ করে সরাসরি অশ্লীল কথা বলা শুরু করে। এবং জানিয়ে দেয় এই পেশায় থাকলে এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই আমাকে চলতে হবে । কোন প্রতিবাদের চেষ্টা করলে আমাকে প্রত্যেক জায়গায় আরো অপমান হতে হবে। এবার আমার ধৈর্য্য রাখতে না পেরে আমি তাকে বাজে কথা বন্ধ করতে বলি। তিনি সবার সামনেই ক্ষিপ্ত হয়ে হাত তুলে আমাকে মারতে আসেন। উপস্থিত অন্যরা বাধা দিলে তিনি হাতে থাকা চায়ের কাপ আমাকে লক্ষ করে ছুঁড়ে মারেন। এক পর্যায়ে আবারো আমাকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানির হুমকি দিয়ে প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে যান।

সেদিনই আমি এই অভিযোগে একটি মামলা করি। উপস্থিত সাংবাদিকদের সাক্ষী করা হয়। কিন্তু থানা প্রথমে কিছুতেই মামলা নিতে চাচ্ছিল না। পরে থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ময়নুল হককে আমি মামলা গ্রহণ না করার কারণ জানিয়ে লিখিত বক্তব্য চাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে মামলা নেন। কিন্তু সাথে সাথেই বিবাদীসহ প্রেসক্লাবে জানিয়ে দেন বিষয়টি সুরাহা করে ফেলতে। মামলার কপি আমি নিজ কর্মস্থল বৈশাখী টেলিভিশন, দৈনিক মানবকণ্ঠসহ অভিযুক্তের কর্মস্থল মাছরাঙ্গা টেলিভিশন, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, মানবাধিকার কমিশন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার,  বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ,  জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিসহ আরো অনেক সংগঠনে প্রতিকার চেয়ে পাঠিয়ে দেই।

প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন সাড়া না দিলেও আমার কর্মস্থলের প্রধান মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ভাই আমার খোঁজ নিয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দিয়েছেন। মাছরাঙ্গা টেলিভিশন ও কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবেও তিনি ফোন করে এর প্রতিকার চেয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। কিন্তু কোথাও কোন ব্যবস্থা নেয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। বরং আমাকে যে সবাই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিতে থাকলো আমি সেই সাংবাদিক যাকে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের উপস্থিত যে সাংবাদিকদের আমি সাক্ষী করে থানায় মামলা করেছি তারা আমাকে জানিয়ে দিল ইউনুছ আলীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।আমি তখন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি।

এসময় জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ও মহিলা পরিষদ জেলা শাখা দোষী ইউনুছ আলীকে বিচারের আওতায় নেয়ার দাবীতে একটি মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে। এ ঘটনায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজ প্রকাশ হলে প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসে এবং প্রেসক্লাবকে ডেকে পাঠায়। মাছরাঙ্গা টেলিভিশনও তখন তাদের জেলা প্রতিনিধি ইউনুছ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠায়। ইউনুছ আলী বিষয়টি ব্যক্তিগত ও দ্রুত সমাধান হচ্ছে বলে সময় নিয়ে প্রেসক্লাবে একটা মীমাংসা করে দেযার আবেদন জানায়।

Lee
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

নারী হোক আর পুরুষ হোক, একজন সাংবাদিক একজন মানবাধিকার কর্মী। নারীর অধিকার, নারীর সম্ভ্রম , নারীর প্রতি স্পর্শকাতরতা না থাকলে তাকে মানবাধিকার কর্মী কিভাবে বলা যায়? প্রেসক্লাবের মতো একটা জায়গায় অনেক সাংবাদিকের সামনে যখন একজন নারী সাংবাদিককে বেআব্রু করা হয় তখন  সত্যি সাক্ষ্য দেয়ার মতো একজন মানুষও থাকে না, পুরুষ সাংবাদিকরা তো নয়ই।

নারী সাংবাদিকটিকে কোর্টে গিয়ে আবারো বেআব্রু ওয়ার ভয় দেখিয়ে, বয়কট করার ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয় পুরুষ সালিশকারীদের তৈরী আপসনামা মেনে নিতে। যে আপসনামায় কোথাও উল্লেখ থাকে না সেদিন কতটা বেআব্রু করা হয়েছিল তাকে। তবুও একজন পুরুষ সাংবাদিকের পক্ষ নিয়ে প্রেসক্লাবের আরো ১৯ জন সাংবাদিক এক ঐতিহাসিক আপোসনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন।

এরপর সেই এই আপোসনামা থানায় গেছে। অনেকদিন ধরে প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে থানাকে কথা দিয়ে রাখা হয়েছিল আপোসনামা যাবে। সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে  যখন মহিলা পরিষদের সভনেত্রী নন্দিতা চক্রবর্তী পুলিশ সুপারের অফিসে গিয়ে ন্যায়বিচারের দাবীতে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন মামলার খবর। থানা সূত্র জানায়, প্রেসক্লাব এটা মীমাংসার দায়িত্ব নিয়েছে বলে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি। এবার আপোসনামা পেয়ে থেমে যায় পুরোপুরি।

মাছরাঙ্গা টেলিভিশন অফিসেও এই আপোসনামা চলে গেছে । তিনি নাকি প্রতাপের সাথে সেখানে বলে এসেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক ছিল না। বরং অভিযোগকারীকেই অভিযুক্ত বানিয়ে দিয়েছে অফিস। অন্য সকল প্রতিষ্ঠানেও যায় একইভাবে আপোসনামার কপি। সামান্য বিবাদের দোষ স্বীকার করে এমন ক্ষমা চাওয়াকে উদারতা ভেবে প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই তাকে ‘সুশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই সালিশের  মাধ্যমে ইউনুছ আলীকে লিখিতভাবে ক্ষমা করতে হয়েছে সেদিন। কিন্তু সালিশকারী পুরুষ সাংবাদিকদের কতটা ক্ষমা করা সম্ভব আমার মতো একজন ‘বেআব্রু’ নারী সাংবাদিকের যার হাতেও ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল ইউনুছ আলীর টাকায় কেনা ‘এক প্যাকেট বিরিয়ানী’।

যদিও আজো লোকটির স্বভাবের সামান্যতম পরিবর্তন হয়নি। কোন নারী ভিকটিম সাংবাদিকের সহায়তা পেতে এলে তাকে আরো বেশী শ্লীলতাহানি করে এমন কিছু সাংবাদিক। প্রকাশ্যে সবার সামনে এখনও কেউ কেউ এমন ঘটনা  ঘটান যার বহু অভিযোগ জনে জনে।

শুধু ইউনুছ আলী কেন? আজো প্রতিদিন এমন কতো ইউনুছ আলীকে সহ্য করে এই পেশায় টিকে থাকতে হয়! যখন আর একজন নারী/মেয়ে এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখায়, আমি ভীত হই ইউনুস আলীদের কথা ভেবে। পারবে তো মেয়েটি নিত্যকার বিকৃত রুচির মানুষগুলোর লোলুপ চোখ ও কথার ধর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে? এমন কোন দুর্ঘটনাকে ঘটনা ভেবে লেখকরা গল্পের খোরাক পান। নিজের মতো করে সাজান স্থান-কাল। কিন্তু কারো কোন গল্প সেই সংবেদনশীলতা জাগাতে পারে না যতটা আহত করে এমন জখমের অনুভুতিগুলো।

সাংবাদিক ও লেখক

 

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.