স্তন ক্যানসার আমার ২১ বছরের সঙ্গী: কাজী রোজী

485762_10151933533977678_343838070_nউইমেন চ্যাপ্টার: ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে-লড়াইয়ে প্রায়ই যাকে পাশে পাওয়া যায়, স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে কখনই যিনি আপোস করেননি, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীও দিয়েছেন, সেই তিনি হলেন কবি কাজী রোজী। গত ২১ বছর ধরে তিনি নীরব ঘাতক স্তন  ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস করছেন। তবে ভালো আছেন। তাঁর সারা দিনের কর্মব্যস্ততা দেখে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অন্য রোগীরা মনে সাহস পান। বাঁচার নতুন আশা খুঁজে পান।

শুধু তাই নয়, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের প্রতিবন্ধী অধিকার গ্রুপের কনভেনারও তিনি, জাতীয় কবিতা পরিষদের সম্পাদকীয় মণ্ডলীর সদস্য এবং লারা ফাউন্ডেশনেও কিছু দায়িত্ব আছে। চলতি বছরের ২৩ মার্চ থেকে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ হিসেবে তিনি শপথ নিয়েছেন। তারপর থেকে ব্যস্ততার পরিমাণ আরও বেড়েছে। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো ক্ষোভ নেই। কেননা তাঁর মতে, ব্যস্ততাই সুস্থতা।

নিজে দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে মোটামুটি জয়ী হয়ে বেঁচে আছেন। অন্যদের ভরসার জায়গাও তিনি। সবসময়ই তিনি তার সহায়তার হাতটি মেলে ধরেন অন্যদের দিকে। কাজী রোজী শুধু স্তন ক্যানসারের রোগীদের মনেই সাহস দেন না, যাতে অন্য আর একজনও এ রোগের শিকার না হন তার জন্য করেন কাউন্সেলিং। কাজী রোজী নিয়মমেনে দিনে ১২টি ওষুধ খাচ্ছেন। শরীর একটু বিগড়ালে চিকিৎসকের পরামর্শে মাঝে মাঝে ওরাল ক্যামো নিচ্ছেন। এ ক্যামোর সুবিধা, হাসপাতালে গিয়ে নিতে হয় না।

কাজী রোজী গর্ব করেই বলেন,‘আমি চিকিৎসার জন্য কখনো বিদেশ যাইনি। দেশে চিকিৎসা নিয়েই আমি সুস্থ আছি।’
কবিতার বিষয়বস্তুতেও ক্যানসারকে বেছে নিয়েছেন কাজী রোজী। কবিতায় ক্যানসারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, তুমি দরজার ওপাড়েই থাকো। দরজায় তুমি টোকা দিলেই আমি খুলব না।
কাজী রোজী বলেন, নিজে নিজের চিকিৎসক হলে এবং নিজের স্তনের ব্যাপারে সচেতন থাকলে ক্যানসার কখনোই দরজা দিয়ে ঢুকতে পারবে না।

স্তন ক্যানসারের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা এই নারী অকপটে অনেক কথাই বললেন। তাঁর মতে, ক্যানসারের রোগীদের সাহস যোগালেই তাঁদের পক্ষে লড়ে যাওয়াটা সহজ হয়।
১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি। গোসল করতে গিয়ে স্তনের মধ্যে শিমের বিচির মতো কিছু একটা হাতে ঠেকে। বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার নেশা থাকায় স্তন ক্যানসার একেবারে অপরিচিত কিছু ছিল না। লজ্জা, ভয় সব কিছুকে পিছনে ফেলে চিকিৎসক ছোট ভাই কাজী সুপ্রিয় হিল্লোলকে সব খুলে বললেন কাজী রোজী। তারপর চিকিৎসক রওশন আরা এবং সাইফুল ইসলামের সহায়তায় শুরু হলো ক্যানসারের চিকিৎসা। এ চিকিৎসারই অংশ হিসেবে ১২ বার কেমো থেরাপি নিতে হয়েছে। তখন মুরগি জবাই করার সময় মুরগি যেমন ছটফট করে তেমনই কষ্টে ছটফট করতেন।

শরীর থেকে একটি স্তন কেটে ফেলতে হলো। মাথার সব চুল পড়ে গেল। মাসিক বন্ধ হয়ে গেল। শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গিয়েছে তার প্রভাব এখনো আছে। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি শক্ত খাবার খেতে পারছেন না। কিন্তু তাই বলে কাজ থেমে থাকেনি। চিকিৎসক ভাইটি ফেব্রুয়ারি মাসে মারা গেছেন।
কাজী রোজী বলেন, ‘চিকিৎসকরা আমাকে আগেই সব বলে নিয়েছেন। স্তন না থাকলে বাহ্যিক সৌন্দর্যের হানি ঘটবে। কিন্তু আমি তো বেঁচে থাকব। বেঁচে আছি। তাই স্তন হারানোর ফলে আমার মন খারাপ হয়নি।’

কাজী রোজী সরকারি চাকরি করার সুবাদে চাকরি শেষে যে টাকা পেয়েছিলেন তা ব্যাংকে রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে সুমি সিকান্দারের সঙ্গে থাকেন। মেয়ের জামাই, দুই নাতি নিয়েই এখন তাঁর সংসার। সাংসদ হওয়ার পর একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন তিনি। তবে মেয়ে ও মেয়ের জামাই তাঁকে একা থাকতে দেবে না। তাই সেই ফ্ল্যাটে চলে অফিসের বিভিন্ন কাজকর্ম। জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।

রোজী বলেন,‘আমার ক্যানসার বলে আমি সংসদ থেকে বাড়তি সুবিধা নিতে চাই না। এখন আমি সুস্থ। যতদিন সুস্থ থাকবো কাজ করে যাবো। এখন পর্যš সংসদ অধিবেশনে একদিনও অনুপস্থিত থাকিনি।’

সাংসদ হওয়া প্রসঙ্গে কাজী রোজী বলেন,‘ সাংসদের দায়িত্ব পালনের কাজটি আলাদা ঘরানার। সাহস পেয়েছি অনেক। জীবনের সম্মানও পেয়েছি। সেজন্য সৃষ্টিকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানাই কৃতজ্ঞতা।’

‘ক্যানসার মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন মনের ভেতরের সাহস ও মনোবল। তারপর লাগে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, কর্মস্থলসহ সব জায়গা থেকে সহযোগিতা। আর কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি নিয়ম মেনে চলেন। অন্যদের সচেতন করার সময় তিনি মেয়ে বা নারীরা যাতে স্তন ক্যানসার নিয়ে লজ্জা না পান সে বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। আর যদি কোনো সমস্যা দেখাই দেয় তাহলে চিকিৎসকের কাছে তা খুলে বলার অনুরোধ জানান।

কাজী রোজীর লেখা ‘আমার পিরানের কোনো মাপ নেই’ কবিতা নিয়ে শহীদুল হক খান সিনেমা বানিয়েছেন। আর্থিক সমস্যাসহ কিছু কারণে এ সিনেমাটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশের যে নারীরা ঘরের ভেতর কাজ করেন তাঁদের নিয়েও চিন্তা করেন কাজী রোজী। তাই সার্কের এ বিষয়ক একটি সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে এখনো পরাজিত না হওয়া কাজী রোজীর শেষ ইচ্ছা, অসুস্থ হয়ে কখনো যেন বিছানায় পড়ে থাকতে না হয়।

বি. দ্র. ১০ অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস।  ২১ বছর ধরে স্তন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকা কবি কাজী রোজীকে উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে বিপ্লবী অভিনন্দন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.