স্নেহের বন্ধন চুকে-বুকে যায় এমনি করেই

The Cow
ছবিটি প্রথম আলো থেকে নেয়া

উইমেন চ্যাপ্টার: এবছর রাস্তায় রাস্তায় গরু নিয়ে হুড়োহুড়ি থাকলেও কিভাবে যেন চোখ এড়িয়ে থাকতে পারছি। মাঝে মাঝে কিছু ছবি ইন্টারনেটের ‘অ-কল্যাণে’ চোখে পড়ে যায়, কিছুক্ষণ মন খারাপ করে বসে থেকে ভুলে যেতে চেষ্টা করি, কী দেখেছি!

পণ করেছি, কিছুতেই এই কষ্টকে এবার আমল দেবো না। যা আমার একার পক্ষে ফেরানো সম্ভব না, তা নিয়ে আর কথাও বলবো না, কষ্টও নেবো না মনে। যে যা খুশি করুক, আমার কী! কিন্তু ইন্টারনেটে প্রথম আলোর একটি ছবিতে আজ চোখ আটকে গেল। মনটা ভীষণ ভারী হয়ে গেল এরপর থেকেই।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাজারে বিক্রির জন্য নেয়ার আগে এতোদিন সন্তানের মতো লালন-পালন করা গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন এক কৃষক-স্ত্রী। মনটা প্রচণ্ড খারাপ তার, তা ফুটে উঠেছে তার চেহারায়। অভাবের সংসারে দুইটা টাকার মুখ দেখবে বলেই আজ নাড়িছেঁড়া না হলেও, অতি আদরের এই ধনকে তার হাতছাড়া করতে বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। মনটা হাহাকার করে উঠছে থেকে থেকে। কাল থেকে চুলায় আগুন জ্বলেনি। কী আর হবে এই জগত-সংসারে রান্নাবান্না করে? মনে পড়ে যাচ্ছে কত কথা। ছোটবেলা থেকে কিভাবে তিলে তিলে বড় করা হয়েছে একে, ঝড়ে-বৃষ্টিতে আগলে রেখেছেন বুক দিয়ে। সবই তো করা হয়েছিল আজকের এই দিনটির জন্যই। বিচ্ছেদ কেন তাহলে এতো কষ্টকর হচ্ছে? কেন, এর উত্তর জানা নেই এই কিষাণীর।

গ্রামের ভাঙা বাড়ির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছোট ছেলেটাও এই দৃশ্য দেখছে। তার মনটাও ভার হয়ে আছে। সে হয়তো রাতে তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো বলেছিল, আব্বা, ও কি আর ফিরবে না আমাদের কাছে? আব্বা নিরুত্তর দেখে তার ছোট মনেও শংকা জাগে। তাহলে কি পাশের বাড়ির ছেলেটির কথাই সত্য? আব্বা কি ওরে জবাই করাইতে নিয়া যাইতেছে? ছেলেটি সারারাত ছটফট করে কষ্টে।

আর গরুটি প্রচণ্ড মমতার কাছে যেন আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। মাথাটা কী সুন্দর করে সে তুলে দিয়েছে কিষাণীর হাতে, যেন আদর নিচ্ছে প্রতিদিনের মতোই। কিন্তু সে তো জানে না, এই স্নেহের হাত আর তাকে স্পর্শ করবে না এই জীবনেও। যারা তাকে কিনে নেবে, তারাও এমন স্নেহের পরশ দেবে না। সে হয়তো মনে মনে খুঁজবে এই মা’টিকে, মা মা বলে ডাকবেও সে। কিন্তু কোথায় কে? অনেক লোক তাকে দেখতে আসবে নতুন ঠিকানায়। সবাই তার গায়ে হাত বুলাবে, অনেক কথা বলবে তারা নিজেদের মধ্যে। কিন্তু সে খুঁজে ফিরবে মমতাময় হাত দুটি আর স্নেহের কণ্ঠ। কতবার ঠিকমতো খায়নি বলে তাকে বকুনি খেতে হয়েছিল এই মমতাময়ীর কাছে, সেকথা মনে করে হয়তো দুচোখ বেয়ে দু-ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়বে তার।

লোকে বলবে, কুরবানি দেয়া হবে একথা গরু বুঝতে পারে, তাই কাঁদছে সে। কিন্তু তারা বুঝতে পারবে না যে, সে অন্য কাউকে খুঁজছে! সে একজন মা’কে খুঁজছে, সে খুঁজে ফিরছে তার পরিচিত, চেনা মানুষগুলোকে। কত স্মৃতিই না তার তাদের সাথে!

ছবিটি গতকাল মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকায় গাজিন্দা গ্রাম থেকে তোলা। তুলেছেন: পাভেল রহমান।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.