পথে যেতে যেতে

nazneen akter নাজনীন আক্তার: ১০ মার্চ। নেত্রকোনার হাওড় অঞ্চলে এক এনজিওর সঙ্গে ট্যুরে গেছি। বলা যায়, হাওড় অঞ্চলে কাজ শুনেই আমি যেতে আগ্রহী হয়েছি। দুর্গম অঞ্চলে যাতায়াত খুব সুবিধার হওয়ার কথা নয়। রাজধানী ঢাকারই বিভিন্ন রাস্তার যে অবস্থা, সেখানে হাওড় এলাকায় রাস্তা থাকবে এ তো কল্পনাতীত। সেসব অঞ্চল বছরের সাত মাস ১৫ ফুট পানির নিচে থাকে। তাই সেখানে কষ্ট হবে সেটা মাথাতেই ছিল। তবে অনাকাংখিত ভোগান্তিতে পড়তে হবে সেটা ভাবিনি। আর রাতের একটি ঘটনায় কোটি কোটি লোকের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠব তেমনটাও ভাবার মত খুব একটা বিশ্বাস ছিল বললে ভুল হবে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আমেজ যে এই পাড়াগাঁয়েও এসে পৌঁছেছে, তা জানতে তখনও কিছুটা বাকি ছিল।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নারী প্রগতি সংঘের সঙ্গে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক রওনা দিলাম নেত্রকোনায়। সাড়ে ৪ ঘন্টার রাস্তা আমরা ৭ ঘন্টায় পাড়ি দিলাম। মাওনার দিকে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে অনেকক্ষণ জ্যামে পড়তে হয়েছিল। আর সিএনজির জন্য ঘুরতে গিয়েও বেশ সময় নষ্ট হয়েছে। বিকাল ৫ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সরকারি নির্দেশে সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ থাকে। সাড়ে ৫টা বেজে যাওয়ায় কোন স্টেশন গ্যাস দিতে রাজি হল না। ভোগান্তি থাকলেও একদিকে ভাল লাগছিল যে দেশের লোক নিয়ম মানছে আজকাল। তবে ভাললাগা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। গাজীপুরের চান্দনায় বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং কোম্পানি এ্যান্ড পেট্রোল পাম্প থেকে সন্ধ্যা সোয়া ৬ টায় নির্বিঘ্নে আমরা গ্যাস নিতে পারলাম।

রাত সাড়ে ১০টায় পৌঁছলাম নেত্রকোনা সদর থেকে পূর্ব কাটলী গ্রামে নারী প্রগতি সংঘের অফিসে। এনজিওটির নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীরের বাংলো প্যাটার্নের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হলো আমাদের। সফরসঙ্গী নারী প্রগতি সংঘের উপ পরিচালক শাহনাজ সুমী জানালেন, পরদিন শুক্রবার সকাল ৮ টায় আমাদের রওনা হতে হবে। যেতে হবে মোহনগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত তাদের প্রকল্প অফিসে। সেখান থেকে হাওড় অঞ্চল মল্লিকপুরসহ আশেপাশের আরও দুয়েকটি গ্রামে। আমরা সবাই এতো ক্লান্ত ছিলাম যে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই ঘুমাতে চলে গেলাম। তবে সবার মধ্যেই একটা বিষয় খচখচ করছিল। দুপুর আড়াইটায় বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের খেলা। ইস! এমন সময়ে এলাম। বাংলাদেশের খেলাটা মিস হয়ে যাবে। এর আগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৫৮ রানে ওলআউট হয়ে শোচনীয় পরাজয়ের পর ইংল্যান্ডের সঙ্গে আহামরি কোন খেলা টাইগাররা উপহার দিতে পারবে তেমনটা আশা করছিলাম না। এরপরও কোন এক গহীন থেকে যেন চরম স্পর্ধা নিয়ে বিজয়ের স্বপ্ন উঁকিঝুকি মারে। তবে জয়-পরাজয় যেটাই হোক তা স্বচক্ষে দেখার জন্য কেউ খেলা মিস করতে চাইছে না। সিদ্ধান্ত হলো-কাজ শেষ করে যদি আমরা বিকেলের মধ্যে ফিরতে পারি তবে পরের ব্যাটিং থেকে দেখা সম্ভব হবে।

রাতে যায় যায় দিনের সিনিয়র রিপোর্টার নিখিল ভদ্রের স্ত্রী রুমা বউদির (যিনি নিজেও একজন এনজিও কর্মকর্তা) সঙ্গে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। পাশের রুমে নিখিল দা আর মানবজমিনের রিপোর্টার কাজী সোহাগের থাকার ব্যবস্থা হলো। কর্মক্ষেত্রে এদের প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আগেও ট্যুর করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকায় শীতের পাট বেশ আগেই চুকে গেলেও নেত্রকোনায় বেশ শীত অনুভব করছিলাম। রাতে একবার সমস্বরে শেয়ালের বিকট চিৎকার শুনে গা কেমন ছমছম করে উঠল। তবে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার কারণে সে ভয় স্থায়ীত্ব পেল না বেশিক্ষণ। মোবাইল ফোনে এ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। এরপরও আগে আগে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে ভোরে এ্যালার্ম বাজার আগেই উঠে পড়লাম। তখনও কেউ ঘুম থেকে উঠেনি। শাওয়ার সেরে নিলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি রুমা বউদি উঠে গেছে।

একদম সময়মতো সবাই তৈরি হয়ে মাইক্রোবাসে চড়ে বসলাম। মোহনগঞ্জ যাচ্ছি। গাড়িতে যেতে যেতে চারপাশে তাকাচ্ছিলাম। ছোট জেলাগুলো যেমন হয় তেমনই। বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই। এক বালিশ মিষ্টি আর নেত্রকোনার মানুষের সুরেলা(!) ভাষা ছাড়া। সুমী আপা জানালেন, এখানের লোক ‘ও’ কার উচ্চারণ করতে পারে না। সব ‘উ’কার হয়ে যায়। ‘ঠ’ হয়ে যায় ‘ট’। ‘খ’ হয়ে যায় ‘ক’। তাই ঠাকুরাকোনা জায়গার নাম স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, টাকুরাকোনা। এক চা বিক্রেতা চাচী তার রোজগারের হিসাব দিতে গিয়ে আমাদের বললেন, ‘ যা পাই তা কাইয়া লাই (খেয়ে ফেলি)।‘ ‘চোর, পোকা’ সেসব অবলীলায় চুর ও পুকা হয়ে যায় উচ্চারণের বদৌলতে। তবে স্থানীয়রা ছোট-বড় আকারের ক্ষীরসা দেয়া এক বিশেষ মিষ্টিকে এক নামে ‘বালিশ মিষ্টি’ বললেও নিখিল দা আর সোহাগ আকার অনুযায়ী সেগুলোকে পাশ বালিশ, কোল বালিশ আর মাথার বালিশ নাম দিয়ে ফেলল। শুধু তাই নয়, আমার মত যারা এ মিষ্টির সঙ্গে পরিচিত না, তাদেরকে ফোন করে বিভ্রান্তিতে ফেলতে জানাল,‘ আমরা এখন বালিশ খাচ্ছি।’ এমনকি বাংলাদেশের জয়ের পর বালিশ মিষ্টি খেতে খেতে বিভিন্ন জনকে ফোন করে জানাল ‘ আমরা বালিশ উৎসব করছি।’

ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই আমরা মোহনগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছলাম। সেখানে এনজিওটির প্রকল্প অফিসে ব্রিফিং হল-আমরা কোথায় যাচ্ছি, সেখানে কতটি গ্রাম, কত লোকসংখ্যা, সমস্যা কি ইত্যাদি। আমাদের গন্তব্য উপজেলা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ডিঙ্গাপোতা হাওরের মল্লিকপুর গ্রাম। আমাদের সঙ্গে জনকণ্ঠের উপজেলা প্রতিনিধি আবুল কাশেম, যায় যায় দিন, একুশে টেলিভিশন এবং চ্যানেল আইয়ের স্থানীয় প্রতিনিধিরা যোগ দিলেন। মাইক্রোবসে করেই আমরা রওনা হলাম। গাড়িতে চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি বিরক্তি নিয়ে বললেন, ইস এমন দুর্গম এলাকায় যাবেন জানলে আসতাম না। ওখানে অনেকবার গেছি। আর দেখার কিছু নেই। হাওর অঞ্চলে পৌঁছলাম সাড়ে ১১ টার দিকে। হাজার হাজার একর জমি। এখন শুকনো মৌসুম। থৈ থৈ পানি নেই। আছে দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত। আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। যত দূর দেখা যায় শুধু সবুজ ধান ক্ষেত। আমি, নিখিল দা, সোহাগ সমানে ছবি তুলে যাচ্ছি। এক সময় গাড়ির চালক জহির বললেন, আপনারা বাকি পথ হেঁটে যান। গাড়ি আর যাবে না। সুমী আপা আর প্রকল্প সমন্বয়কারী মুক্তি মহানায়ক জোর দিয়ে বললেন, গাড়ি আরও দূর যাবে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে চালক এবড়ো- থেবড়ো রাস্তা আর খানাখন্দ ভেঙ্গে চলা শুরু করলেন। ফাঁকে ফাঁকে গাড়ির ভার কমাতে আমাদের কয়েকবার নামা ওঠা করতে হল। প্রায় আধঘন্টা এভাবে চলার পর চালক জহিরের কথাই সত্য হল। জোর করে গাড়ি টানতে গিয়ে শক্ত মাটির ঢিবিতে আটকে গাড়ির ফুয়েল বক্স ভেঙ্গে গেল। গাড়ি থেকে গড় গড় করে তেল পড়ছে। বাধ্য হয়েই আমরা হেঁটে গন্তব্য মল্লিকপুর গ্রামের দিকে রওনা দিলাম। চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি গজগজ করতে লাগলেন। বললেন, এখন বৃষ্টি এলে বুঝবেন কিভাবে হাঁটা যায়। এ রাস্তা এমন কাদা হবে যে হাঁটাও যাবে না।

মল্লিকপুর গ্রাম এখনও আড়াই কিলোমিটার দূরে। দূর থেকে গ্রামটি দৃশ্যমান হলেও শক্ত মাটির কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটা ততটা সহজ হচ্ছিল না। আর আমার জুতো হাই হিল হওয়ায় হাঁটতে বেগ পেতে হচ্ছিল। সবার থেকে পিছিয়ে পড়েছিলাম। শান্ত স্বভাবের কাশেম ভাই ধীরগতিতে হেঁটে আমাকে সঙ্গ দিলেন। হাওর অঞ্চলের ত্রাস দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ফুঁসে ওঠা ঢেউ আফাল থেকে ঘর-বাড়ি রক্ষার জন্য কেয়ার বাংলাদেশ একটি স্কুল কাম আশ্রয়কেন্দ্র করে দিয়েছে। সেটির দোতলায় প্রকল্পে অংশ নেয়া গ্রামের নারীরা জড়ো হয়েছেন। হতদরিদ্র প্রান্তিক জনগণ যেমনভাবে ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা বঞ্চিত হয়ে জীবন-ধারণ করে সেখানে তারই আরেক রুপ। তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার বঞ্চিত হতে হতে ওখানকার নারীদের তেমন চাওয়া-পাওয়া নেই। তারা যেসব সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছেন তার যে সমাধান আছে সেটিও যেন তারা উপলব্ধি করেন না। অসুখে কখনও ডাক্তার দেখাননি এমন নারীদেরও আফসোস করতে দেখলাম না। সত্যিই বোধহয় ‘এখানে ঈশ্বর নেই, ঈশ্বর থাকেন ভদ্র পল্লীতে’। হায়রে মানুষ! হায়রে দেশ! সরকার সত্যিই ভাগ্যবান।

অনেকটা গ্লানি নিয়েই মল্লিকপুর থেকে ফেরা শুরু করলাম। এতক্ষণে আমার মনে হল গাড়ি নষ্ট। সুমী আপা জানালেন, মোটরসাইকেলে চালক জহির মোহনগঞ্জ গেছেন। ফুয়েল বক্স ঝালাই করে ফিরে গাড়ি ঠিক করবেন। এর অর্থ আমাদের হাঁটতে হবে। তবে কতখানি তা বলা যাচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন বাহন পাওয়া যাবে। হাইহিলের জুতো পড়ে আমি বহু কষ্টে সবার সঙ্গে হাঁটছি। এবার মানবজমিনের সোহাগ ত্রাণকর্তার ভূমিকা নিল। আমাকে তার জুতো দিয়ে পড়ল ‘আপা এটা পড়েন। আমি খালি পায়ে হাঁটব।’ বুঝলাম না আমাকে সাহায্য করার জন্যই ‘খালি পায়ে হাঁটতে ভাল লাগছে’ এ ডায়লগ ছাড়ল কিনা। যাই হোক, ছোট ভাইটাকে ধন্যবাদ দিলাম। গাড়ি যেখানে নষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে গিয়ে দেখলাম চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধির সঙ্গে সুমী আপার কিছুটা উত্তপ্ত কথা-বার্তা চলছে। ‘গাড়ি নষ্ট কিভাবে যাওয়া হবে। এখানে দুপুরেরর খাবারের ব্যবস্থাও নেই’ বলে রাগারাগি করছেন ওই প্রতিনিধি। নিখিলদা মাঝখানে গিয়ে ফোঁড়ন কেটে বললেন, ‘না না উনি তো নিজের চিন্তা করছেন না। আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। অতিথি। আমাদের কথাই ভাবছেন।’ বেচারা প্রতিনিধি নিখিলদা কি পাত্র তা জানেন না বলে এটাকে তার প্রতি সমর্থন ধরে নিয়ে কথাটা লুফে নিলেন। বললেন, ‘ আমি নিজের চিন্তা করছি না। আমি হেঁটেই যেতে পারব। কিন্তু আপনারা কিভাবে যাবেন। সেটা নিয়ে টেনশন হচ্ছে।’ সুমী আপা জানালেন, যেতে যেতে মোটরসাইকেল, রিকশা যাই পাওয়া যায় তাতে দু’জন করে তুলে দেওয়া হবে।

আমরা অনিশ্চিয়তা নিয়েই হাঁটছি। গল্পে গল্পে সবাই হাঁটাটাকে এক রকম এনজয়ই করছিলাম। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর দেখলাম পাশ দিয়ে একটি মোটর সাইকেল চলে গেল। আমরা বিস্মিত হয়ে দেখলাম, চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি তার ক্যামেরাম্যান নিয়ে মোটর চালকের পেছনে বসে চলে যাচ্ছেন। সে এক দৃশ্য বটে! আমাদের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক ব্যক্তি আমাদের রেখে সবার আগে চলে গেলেন। নিখিলদা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার ‘ ও ভাই, আমাদের রেখে চলে যাচ্ছেন যে’। একেকজনের হাসির দমকে টেকা দায় হয়ে গিয়েছিল সে সময়। চার কিলোমিটার হাঁটার পর একটি রিকশা পাওয়া গেল। কিন্তু কেউ কাউকে রেখে উঠতে চাইছে না। রিকশাওয়ালা আমাদের পেছনে পেছনে খালি রিকশা নিয়ে চলা শুরু করল। যদি ডাক পড়ে। এভাবে আরও এক কিলোমিটার যাওয়ার পর দুর্ভোগের ষোলকলা পূর্ণ করতেই যেন বৃষ্টি নামল। হায় হায় আশেপাশে কোথাও বাড়ি নেই যে আশ্রয় নেওয়া যাবে। এবার সবাই জোর করে আমাকে আর সুমী আপাকে রিকশায় তুলে দিল। আমার তখন ‘আরেকবার সাধিলেই খাইব অবস্থা’ ভদ্রতাসূচক দুই একবার একে তাকে রিকশায় উঠতে অনুরোধ জানিয়ে উঠে পড়লাম। তবে ঘন্টাখানেকের মধ্যে সবার জন্য মোটর সাইকেলের ব্যবস্থা হয়ে গেল। বিকাল সাড়ে ৪ টায় মোহনগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছালাম। দুইজন পূর্ণ বয়স্ক নারী এক মোটর সাইকেলে বসলে কতটা হাস্যকর হয় তা রাস্তায় কারও দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম। ভাগ্যিস মোটর সাইকেল প্রচন্ড বেগে চলছিল। তাই পথের কারও হাসির শব্দ কানে আসেনি। প্রকল্প অফিসের কাছে এক হোটেলে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুমী আপা আর আমার জন্য সবাই না খেয়ে বসে আছে। বলা বাহুল্য, চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি কারও জন্য অপেক্ষা না করে খেয়ে নিয়েছেন।

সন্ধ্যার পর চালক জহির গাড়ি ঠিক করে নিয়ে এসেছেন। আমরা নেত্রকোনা পূর্ব কাটলীর দিকে রওনা হলাম। সারাদিনের ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম আজ বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের খেলা। ওয়াও! সবার ঘাড়ে দমকা হাওয়ার মত টেনশন ভিড় করল। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি চলছে। খেলা কি হবে। নিখিলদা কিছুক্ষণ পর পর ঢাকায় ফোন করে খেলার খোঁজ নিচ্ছেন। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং শেষ। এখন বাংলাদেশ ব্যাট করছে। পুর্ব কাটলীতে পৌঁছে আগে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। সোহাগ ফ্রেশ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে টিভি রুমে ঢুকে গেল। গোসল সেরে শুনি বাংলাদেশ মোটামুটি বিপর্যয়ে। সাত উইকেট পড়ে গেছে। দেখব কি দেখব না চিন্তা করতে করতেই আমি, রুমা বউদি টিভি রুমে ঢুকলাম। সোহাগ হতাশ হয়ে উঠে পড়ল। বলল, না এ খেলা দেখার কোন মানে হয় না। আমি আর বউদি খেলা দেখছি। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ভাল খেলা শুরু করেছে। নিখিল দাও যোগ দিলেন। তবে আমরা এক বিচিত্র সমর্থক পেলাম। সুমী আপা। যার ধারণা তিনি খেলা দেখলে বাংলাদেশ হেরে যায়। খেলা না দেখে প্রচন্ড টেনশন নিয়ে তাকে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যাচ্ছে। সোহাগ ফিরে এসেছে। টিভি রুমে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আট নম্বর উইকেট পড়ে গেল। এবার রুমা বউদি আবিষ্কার করলেন, সোহাগ থাকলে উইকেট পড়ে। রানের গতি কমে আসে। অতএব বাংলাদেশকে জয়ী করতে হলে সোহাগকে টিভি রুমে ঢুকতে দেয়া যাবে না। আমার কাছে বউদির কথা এতোটাই যৌক্তিক(!) মনে হল যে বউদির সঙ্গে সঙ্গে আমিও চিৎকার দিয়ে সোহাগকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বললাম। নিখিল দাও আমাদের সমর্থন দিলেন। সোহাগ দরজার পেছন থেকে উঁকি দিয়ে খেলা দেখার চেষ্টা করছে। খেলায় এখন চরম উত্তেজনা। যেকোন সময় যেকোন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হার বা জিত। আমার স্বামী তখন বৈশাখী টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি রকিবুল ইসলাম মুকুল ফোন দিল। তাকে ঘটনা বলতেই তুমুল সমর্থন দিয়ে বলল, ‘সোহাগকে রুমে ঢুকতেই দিও না। দরকার হলে বাথরুমে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দাও।’

আর ৬ বলে ৩ রান। বাংলাদেশের বিজয় দেখার জন্য এবার সোহাগকে ডাকা হল। দলের জয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে বিচিত্র সমর্থক সুমী আপাও এবার এলেন। গ্রামের নির্জনতা ভেঙ্গে আমরা কয়েকজন এখন তুমুল চিৎকার করছি। নিখিলদা ঘোষণা দিলেন, আজ রাতে বালিশ উৎসব হবে। মানে বালিশ মিষ্টি খাওয়া হবে। রাত সাড়ে ১২ টা বাজে। আমি খুব ক্লান্ত। ঘুমে চোখ বুজে আসছে। এত ঘুম পাচ্ছে যে, মিষ্টি খেতে রাজি হলাম না। তবে বসে রইলাম। বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য জয়ে উৎফুল্ল ক’জনার ‘বালিশ উৎসব’ দেখব বলে।

পরিচিতি: নাজনীন আখতার, সিনিয়র রিপোর্টার, জনকণ্ঠ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.