সোভিয়েত নারীর দেশে-২১

Peter 3সুপ্রীতি ধর: এর আগের পর্বে বন্ধু জাহীদ রেজা নূরের বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছিলাম। এরপরই ও ফেসবুকে অনেকগুলো ছবি আপলোড করেছে, যা দেখে আমরা সোভিয়েতের পাবলিকেরা যারপরনাই নস্টালজিয়ায় ভূগছি। এমনিতেই আমাদের কারণে-অকারণে টেনে নিয়ে যায় সোভিয়েত জীবন, দু’একজন কোনো উপলক্ষে এক হতে পারলেও আমরা সেই মনোকষ্টেই ভূগি। হয়তো যতদিন আমাদের প্রজন্ম আছে, ততদিনই এই ‘অনুভূতি’ আমাদের থাকবে।

অনুভূতি শব্দটাকে কমার বন্ধনে আবদ্ধ করার কারণ আমাদের বর্তমান সময়ের সাম্প্রতিক নানা অনুভূতি। সোভিয়েত জীবন ছেড়ে এসেছি সেই কবে, অথচ আমাদের মধ্যকার ‘সামাজিক অনুভূতি’ই বলুন আর ‘বন্ধু-অনুভূতি’ই বলুন, এখনও মাশাল্লাহ প্রবলভাবেই রয়ে গেছে। দেশে ফিরে আসার পর বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা দেখছি আমাদের চারপাশের মানুষের কতরকম অনুভূতি, কেবল মানবিক অনুভূতিটুকুই যেন উধাও।

অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নে আমরা পড়তে গিয়েছিলাম কেউ ১৮ বছর বয়সে, কেউ বা  ১৯। এর চেয়ে বেশি নয় মোটেও। সবে কলেজের গণ্ডি আমরা পেরিয়েছিলাম। সেইসময়ের মধ্যে দৈনন্দিন পারিবারিক যে মূল্যবোধ, ঔচিত্যবোধ শিক্ষার সবটুকু আমরা অনেকেই পেতে পারিনি সময়ের অভাবে। কিন্তু হাতেগোণা কিছু শিক্ষার্থী ছাড়া আমরা তো বেশিরভাগই একই পরিবারভুক্ত ছিলাম, কী ধনী, কী মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে।

পড়াশোনাসহ আনুষঙ্গিক সময় হিসাব করলে আমরা অনেকেই আট-নয়-এমনকি তারও বেশি বছর কাটিয়েছি সোভিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু কখনও হালাল-হারামের চিন্তা আমাদের মাথায় ঢোকেনি। ঈদ-পূজা কোনদিক দিয়ে যেত, জানতামই না। কিন্তু জানতাম, পহেলা বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ কবে হয়। ওই দেশটির কল্যাণে জানতে শিখেছিলাম ৮ মার্চ বলে একটা দিবস আছে, ৩১ ডিসেম্বর হয়ে পয়লা জানুয়ারি পালনও আমরা ওইখানেই শিখেছিলাম। নতুন কেউ গেলে কখনও জিজ্ঞাসা করিনি, তুমি হিন্দু, নাকি মুসলমা? নাকি বৌদ্ধ, নাকি খ্রিস্টান? এসব প্রশ্ন মাথায়ই আসতো না। মাথায় থাকতো শুধু বাংলা ভাষা।

1781576_10152695117871041_5098397982712908345_o
বাঁ থেকে আমি, জাহীদ, শুক্তি আর সুস্মি

প্রেমের ক্ষেত্রেও হিন্দু-মুসলমান ছিল না। ওইদেশে নিশ্চিন্ত মনে প্রেম করে দেশে ফিরে অনেক হিন্দু-মুসলমান জুটির প্রেম ভেঙে গেছে, এমন ঘটনাও আকছারই ঘটেছে। তার মানে ধর্ম বিষয়টা নির্ভর করে মাটির ওপর? নাকি পারিপার্শ্বিক সামাজিক বিধিনিষেধের উপর? তুমি কোন মাটির ওপর/ কোন সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রেম করছো, এটাই মূল কথা। আবার যারা ওই দেশ থেকে ভিন্ন কোনো তৃতীয় দেশে চলে গেছে, তাদের সমস্যা হয়নি।

এই ভেদাভেদ কখনও অনুভব করিনি খাওয়ার ক্ষেত্রেও। শুকরের মাংস খেতে চাইতাম না বলে একদিন এক বড় ভাই মজা করে ‘গরুর’ মাংস রান্না করলেন। পেটপুরে খাওয়ার পর উনি জানালেন, ওটা ছিল শুকরের মাংস। আমি বলি, আপনি যদি আপনার ‘হারাম’ খাওয়াতে পারেন, তাহলে আমি ‘হালাল’ ভেবে নিয়ে খেলে তো কোন অসুবিধা দেখছি না। সেইথেকে আমার ঘরে শুকরের মাংসের প্রবেশ অবাধ হয়। বিশেষ করে মাইনাস তাপমাত্রায় দাঁড়িয়ে শুকরের শাসলিক তো ছিল অসাধারণ এক খাবার। আর শুকরের চর্বি দিয়ে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের স্বাদ এখনও যেন জিভে লেগে আছে।ami 3

জাহীদ যেসব ছবি দিয়েছে ইতিহাসের পাতা থেকে, সেখানে খুব পেইল দেখাচ্ছে আমাকে। একজন জিজ্ঞাসা করাতে মনে পড়ে গেল, আমি প্রতি বছর অক্টোবর থেকে আমি চোখের অঞ্জনীতে ভুগতাম। আর হতো প্রচণ্ড পেটে ব্যথা। চোখের চিকিৎসা করাতাম প্রতিবছরই, সাময়িক ভাল হতাম, আবারও হতো। এমনকি চোখের ভিতরে ইনজেকশনও দিয়েছিলাম। এটা শুনে আমার ইরানি বন্ধু আকসানা বলেছিল, যে চোখের ভিতরে ইনজেকশন দিতে পারে, তার বাচ্চাও হতে পারবে। তুলনাটা যে মোটেও ঠিক হয়নি, বুঝেছিলাম মেয়ের জন্মের পর। পেটে ব্যথার জন্য ডাক্তারের কাছে যেতাম দুদিন পর পর। উনি জিজ্ঞাসা করতেন, আমি বিবাহিত কিনা! বিবাহিত হলে একরকমের পরীক্ষা, নাহলে অন্যরকম। না শুনে তিনি তার মতোন করে পরীক্ষা করে ওষুধ দিতেন। কিছুদিন ব্যথা কমে থাকতো, আবার বাড়তো।

একবার এমন ব্যথা হলো যে আমি রীতিমতো লাফাচ্ছিলাম নিজের রুমে। আমার পোলিশ রুমমেট ঘরে ফিরে এ অবস্থায় দেখে অ্যাম্বুলেন্স কল করলো। অ্যাম্বুলেন্স আমাদের যে হাসপাতালে নিয়ে গেল, ওখানকার পরিবেশ আমাদের মোটেও পছন্দ হলো না। কিছুক্ষণ বসে রইলাম দুজন করিডরে। একটু পর দেখি একটা রুম থেকে স্ট্রেচারে করে এক কিশোরীকে নিয়ে এসে করিডরে ফেলে রাখলো। মেয়েটার দিব্যি হুঁশ আছে, ব্যথায় কঁকাচ্ছে দেখে আস্তে আস্তে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। জানতে পারলাম, ওর বয়স ১৫, অ্যাবরশন হয়েছে ওর।

একথা শুনে আলিনা আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম কিছুক্ষণ। বয়স আমাদের খুব বেশি না, তাই অ্যাডভেঞ্চারের মন জেগে উঠলো। ভাবলাম, এ কোথায় এসে পড়েছি, আমার ব্যথাও উবে গেল যেন অন্য কোন আশংকায়। দুজনেই মোটামুটি দৌড়ে পালালাম ওখান থেকে।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে ওই মাইনাস তাপমাত্রাতেও বেশ আরাম বোধ হলো, বড় করে একটা নি:শ্বাস ফেলে বললাম, আর এমন ভুল করবো না। দুজনে বাইরে খেয়ে হোস্টেলে ফিরে আসি। তার কদিন পরই আমার ওভারিতে সিস্ট ধরা পড়ে। এমনই অবস্থা সিস্টের যে, হাঁটাচলাও নিষিদ্ধ করে দেয় ডাক্তার। কিন্তু আমাকে বাঁধে কে? টালবাহানা শুরু করি। সামনে বাংলাদেশ ছাত্র সংগঠনের সম্মেলন, তারপর ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ। আমি না হলে কি চলবে এসব?

সম্মেলনে যাবার আগে মস্কো যাই, সেখান থেকে সম্মেলন, আবার মস্কো ফেরত আসি। জাহীদের বিয়ে শেষ করে অবশেষে নিজভূমে লেনিনগ্রাদে ফিরি। সবগুলো অনুষ্ঠান একের পর এক শেষ করে পহেলা বৈশাখের রাতেই আবার মস্কো যাই, সাবিনা-টিটো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে। জীবনের এতো আনন্দ পড়ে আছে মস্কোতে, এড়াই কি করে! বিয়েতে গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে সবই হলো। একরাশ আনন্দ মনে, কিন্তু শরীর তো আর কুলোয় না। ওভারিতে বড় হচ্ছে সিস্ট। হোস্টেলে ফিরেই শুনি, ২৬ জন বাংলাদেশি প্রি-বাল্টিকের দুটি শহরে যাচ্ছে এক্সকারশানে।

amiআমি ছাড়া যাবে ওরা। নিশ্চিত ষড়যন্ত্র ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়লাম লেনিনগ্রাদের ছাত্র সংগঠনের প্রেসিডেন্টের ওপর। কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। সে তখন আমাকে রাতে স্টেশনে উপস্থিত থাকতে বলে জানায়, ‘দেখি, কি করা যায়’। ব্যাগ গুছিয়ে আমিও যথাসময়ে উপস্থিত হই। ওখানে গিয়ে জানতে পারি, ছোট টিটো যাবে না। ওর নামে ভিসা আছে, তা দিয়ে অনায়াসে চলে যাওয়া যাবে। অত:পর টিটোর নামে রওনা দেয় সুপ্রীতি ধর। ভরসার জায়গা একটাই যে, রুশরা ছেলেমেয়ের নামের পার্থক্য করতে পারে না।

টানা তিনদিন হৈ-হুল্লোড় করে কাটিয়ে এলাম ২৬ জন মিলে। কেশবদা বেশ চোখে চোখে রাখলো আমায় যেন লাফালাফি কম করি, নাচানাচি কম করি। কিন্তু ওই যে, আমারে বধ করার মতো গোকুলে কেউ কখনও জন্মই নেয়নি, সুতরাং রুখবে কে! ভিলনিউস শহরটি মূলত গির্জার শহর। এতো গির্জার সমাহার কমই দেখা যায়। গির্জায় ঢুকে মোম জ্বালাতে গেলে এক পাদ্রী এগিয়ে আসেন। আশীর্বাদমূলক অনেক কথা বলেন তিনি। বের হলে মামুন ভাই জিজ্ঞাসা করে, ওই ব্যাটা আমার প্রেমে পড়েছে কিনা! আরও বলে, আমি নাকি গির্জায় ঢুকে খ্রিস্টান হয়ে যাই, মসজিদে ঢুকলেও নাকি মুসলমান হয়ে যাবো। বলি, খারাপ কী!

এর চেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট আর হয় না। জীবনভর আমি তাই হতে চেয়েছি। যেন সব মন্দির-মসজিদ-গির্জা-প্যাগোডা আমার জন্য খোলা থাকে। পরবর্তী জীবনেও আমি মন্দির-মাজার ঘুরে বেড়িয়েছি, এখনও যাই সুযোগ পেলেই।ami 4

তালিন থেকে ফেরার পথেই বিড়ম্বনার শুরু। ট্রেনে যখন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন পেটে হাত চেপে বসে আছি। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে আমার শরীর। ব্যথানাশক জোগাড় হলো ট্রেন থেকেই। কোনরকমে রাতটা পার করে দিল কেশবদা, পল্লব এবং আরও কয়েকজন। অনেকের অবশ্য এদিকে নজর দেয়ারই সময় ছিল না। সকালে স্টেশনে নেমে হোস্টেলে এসেই কাপড় গুছিয়ে আবারও হাসপাতাল যাত্রা। একদিন পরই অপারেশন হয়ে গেল।

মা নেই পাশে, পরিবারের কাউকে খবর দেয়ার মতোন সময়ও পাইনি, খবর দিলেও তো কেউ আসতে পারতো না,  কিন্তু আমার অপারেশন হচ্ছে, শুধুমাত্র বন্ধুরা পাশে। এমন জীবন কেউ ভাবতে না পারলেও সোভিয়েত জীবনে এটাই ছিল আসল অর্জন।

আগের রাত থেকে আমার ভারী খাবার বন্ধ করে দিলেন ডাক্তাররা। তরল বলতে এক কাপ স্যুপই শুধু। সকালে তাও নিষেধ। ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে চোখে কাজল দিয়ে বেশ করে সাজলাম, চুলটাও বেঁধে নিলাম ডাক্তারদের সুবিধা দিতেই। কাজল দিলাম একারণেই যে, যদি অপারেশন টেবিল থেকে আর না ফিরি, তাহলে যেন সবাই আমার কাজল পরা চোখ দেখতে পায়।

ভাবছেন কী হাস্যকর, তাই না? মোটেও না। সেই ক্লাশ থ্রি থেকে চোখে কাজল দিই, এইটাই আমার একমাত্র সাজ। তাই মরনেও সাথী করতে চেয়েছি এই কাজলকেই, কোন মানুষকে না।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.