নারীমাত্রই যখন বৈষম্যের শিকার

bd-women_cricketআলেয়া পারভীন লীনা: এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতির চাকা। দেশ পরিচালনা থেকে শুরু করে কর্পোরেট হাউস, এমনকি গৃহকর্মেও নারীরা এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং সাফল্যের সাথে তা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অথচ আমি আমার দীর্ঘ পেশাগত জীবনে দেখে এসেছি কিভাবে নারীদের পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। একজন নারী যদি হয় কোন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী, তবে অন্যান্যদের মধ্যে দেখা যায় এক ধরনের উষ্মা। সে ছোট পদের কর্মকর্তা হলেও নারীকে ‘বস’ হিসাবে মানতে কোথায় যেন এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। আবার এও দেখেছি মেয়েদের ছেলেদের চেয়ে অনেক আস্থাবান, নির্ভরশীল এবং একনিষ্ঠ মনে করা হয়।

এই মুহূর্তে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে সবাই চায় নারীর ক্ষমতায়ন। সেই গতির সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা এখন ক্রীড়াক্ষেত্রেও অবদান রেখে যাচ্ছে। তারা প্রমাণ করেছে, সুযোগ এবং যথাযথ প্লাটফর্ম পেলে তারাও কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।

কিন্তু যে পরিমাণ মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার কথা ছিলো পেয়েছে কি তা? এই প্রশ্নবোধক চিহ্ণটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে আমাদের দেশের নারী ক্রিকেটারদের কথাই বলা যেতে পারে।

এইতো কিছুদিন আগেই আমাদের দেশের নারীরা এশিয়ান গেমস থেকে রানার আপ হয়ে রৌপ্য পদক নিয়ে দেশে ফিরলো। এশিয়ার অনেক বাঘা বাঘা দেশকে হারিয়ে তারা রানার আপ হয়েছে। অল্পের জন্য, মাত্র চার রানের জন্য সোনাটা হাতছাড়া হয়েছে। সেই হতাশা তাড়া করছে আমরাসহ সবার ভিতরেই, নারী ক্রিকেটারদের ভিতরে তো অবশ্যই। আশা করছি ভবিষ্যতে এই নারীরাই তাদের উজ্জ্বল অবস্থান জানান দিবে বিশ্ব দরবারে। কিন্তু কি আশ্চর্য! তাদের নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই কোথাও!

তারা যাওয়ার আগেও যেমন কেউ টের পায়নি, তেমনি তারা ফিরে আসার পরও আমরা কয়জন বলতে পারবো যে তারা ফিরেছে কি, ফিরে নাই? কে তাদেরকে স্বাগত জানাতে গিয়েছে? অথচ দেখেন আমাদের ছেলেরা যাওয়ার আগ থেকেই তাদের নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট, তাদের অনুশীলন নিয়ে রিপোর্ট, তাদের সব কিছুই যেন রিপোর্টের অংশ। আমি এর বিরোধিতা করছি না, কিন্তু একই ধরনের খেলা খেলতে যাওয়া এবং রৌপ্য নিয়ে আসা দলের জন্য এ নিয়ে কোন প্রচার নাই কেন? তাদের কি খেলোয়াড় হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে? নাকি নারী হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে?

Leena Pervin
আলেয়া পারভীন লীনা

দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এই দলটি ফেরার পর আমি আমার এক সাংবাদিক বন্ধুকে অনুরোধ করলাম একটা রিপোর্ট করার জন্য, উত্তরে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তারা কি দেশে ফিরে এসেছে নাকি? আমি যতটা উচ্ছাস নিয়ে ফোনটা করলাম, ঠিক ততটাই হতাশ হলাম তার উত্তর শুনে। আমি জানি আমার সেই সাংবাদিক বন্ধুটি খুবই সচেতন এবং তার মানসিকতায় আমি কোনদিন নারী-পুরুষ আলাদা করার ব্যাপারটি দেখিনি।

কিন্তু মনে হলো কোথাও যেন আমরা এখনো আলাদা করেই রেখেছি হয়তো অবচেতন মনে। কারণ সে একটি পত্রিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, কোন নিউজ হবে বা কিভাবে হবে তা সে আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখে।

তার মানে কি নারী ক্রিকেটারদের ফিরে আসা কোন নিউজ নয়? তাদের জন্য কি সঠিক বরাদ্দ আছে? খাওয়া, থাকা, অনুশীলনের জন্য মাঠের কি সঠিক বন্দোবস্ত আছে? তাদের দেখে তো পুরুষ ক্রিকেটারদের মতোন নাদুসনুদুস লাগে না, জৌলুস বেয়ে পড়ে না। বরং অনেকটা দরিদ্র বলেই মনে হয়।

এইসব নিয়ে কি কেউ কখনো ভেবেছে বা লিখেছে? এই যে মেয়েরা মাত্র  চার  রানের জন্য হেরে গিয়ে স্বর্ণ মিস করলো সেটাই বা কম কিসে? এ কি আমাদের অর্জন নয়? তাহলে?

তাহলে কি ধরে নেব কেবল নারী হওয়াতেই তারা প্রচারের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশের নাম একটি ইতিহাসের অংশ হচ্ছে, আর এর কোন প্রকাশ থাকবে না? এর কারণ শুধুই যে তা এনে দিয়েছে নারীরা? বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে আমাদের সরকার তার সাফল্যের বড় একটি সূচক হিসাবে বিশ্বদরবারে দেখাচ্ছে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি, তাদের প্রতিষ্ঠা, তাদের ক্ষমতায়ন, সেসব কি শুধুই কথার কথা? শুধুই বিক্রির জন্য? আর মিডিয়ার যে বড় বড় প্রচার সেসব ও কি নিজেদেরকে প্রগতিশীল হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য? নারী কি তাহলে কারও সাফল্য, আবার কারও কারও জন্য পরিচয় নির্ধারক হয়েই থাকবে? তাদের নিজস্ব কোন অবস্থান, মর্যাদাবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এইসবের দরকার নেই?

না আমি মনে করি, নারীরা যা করে চলেছে তা কেবল তার নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, নিজের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসাবে, নিজের সামর্থের পরিচায়ক হিসাবে। নারীর অর্জন কেবল নারীরই অহংকার। নারীর সাফল্য কেবল নারীর কষ্টের ফল। তা যদি কেউ প্রচার করতে না চায়, তবে অনুনয়ের কিছু নাই, কিন্তু ক্ষোভের কারণ আছে যথেষ্টই। নারী কোন দয়ার অংশ নয়। নিজের যোগ্যতাবলে তারা আজ বিশ্ব দরবারে লড়াই করে চলেছে। সময় এসেছে নারীকে মানুষ হিসাবে মর্যাদা দেবার। সময় এসেছে তাদের সাফল্যকে একটি দেশের সামগ্রিক সাফল্যের অংশ হিসাবে তুলে ধরার।

একটি দেশ এগিয়ে যায় তার সমগ্র জনগোষ্ঠির সমন্বিত কর্মকাণ্ডে, সেখানে কে নারী, আর কে পুরুষ, সে বিবেচনা অমূলক। বিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে সাফল্যের গাঁথা রচনা করতে চাইছেন, সেখানে নারীর সাফল্যের ইতিহাস আসতেই হবে। নারী অপ্রতিরোধ্য, তাকে রুখে দেয় কার সামর্থ্য?

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.