” ‘বাঙালি জাতি’ বনাম আমরা – ওরা “

1

dance_of_youthসরিতা আহমেদ: ক’দিন আগের কথা । পার্লারে এক ব্যক্তির সাথে প্রায় দেখা হয়, কথা হয় টুকটাক । কিন্তু কখনও দেখি সে বাংলায় কথা বলছে, কখনও দেখি হিন্দিতে । আমাদের সাথে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলে , তো সেদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, আপনি বাঙালি তো ? জবাব পেলাম, ” না, আমি মুসলিম ।” একইসাথে আমি অবাক ও চিন্তিত ।
চিন্তিত এইজন্য যে, উনি কি আমার প্রশ্ন বুঝতে পারেননি, নাকি জানেন না । অবাক এইজন্য যে, আমি তো ধর্ম পরিচয় জানতে চাই নি,তাহলে অযাচিত উত্তর দেন কেন …
—- “না, আমি জানতে চাইছি আপনি মুসলিম হলেও বাঙালি তো !”
—- ” আরে, না না । বাঙালি হব কেন? আমি তো মুসলিম ।”
—- “তাহলে আপনার মাতৃভাষা কি ?”
—- ” বাংলা ।”
এবার আমি বুঝলাম । এরম ঘটনা এই প্রথম নয় । আগেও অনেকবার এমন হয়েছে। রাস্তাঘাটে অচেনাদের বাদই রাখলাম। মনে পড়ে, গত বছর একটি ছেলে বন্ধু প্রায় একমাস ফোন, SMS ইত্যাদিতে খুব ‘কাছের বন্ধু’ হিসেবে ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশার পরে জানতে চেয়েছিল ,আমি বাঙালি কিনা ! তো আমি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম । পরে আমার ফেসবুক নামের আড়ালে থাকা আসল নামের কথা জেনে বলেছিল,
—- “ও ! তাহলে তো তুমি মুসলিম ? বাঙালি বললে কেন ? ”
— “কারণ, ওটাই আমার আসল পরিচয় । পদবীটা তো জন্মসুত্রে পাওয়া আর ধর্মটাও তাই ।”
—- ” ও , কিন্তু তাহলে বল বাঙালি মুসলিম । বাঙালি নও । বাঙালি মানে তো
আমরা, হিন্দুরা । ”
এবার আমি চমকে যাই । প্রচণ্ড অপমান ও রাগে বলেছিলাম,
—– ” মানেটা কী ? ক’জন হিন্দুকে দেখাতে পারবে, যে আমার চেয়ে বেশী বাঙালি ? ধর্ম পরিচয়টাই আসল হল ? শিক্ষিত মূর্খের মত কথা বলা মানুষদের আমি বন্ধু বলতে ঘেন্না বোধ করি । ” ফোন কাটার পরেও সে যোগাযোগ করেছিল । এখোনও হয়, কিন্তু বাক্যালাপে আমার রুচি হয় না। আসল ব্যাপারটা হল, ‘বাঙালি’ শব্দটা এরাজ্যের হিন্দুরা বহুল ব্যাবহারে
নিজেদের জাত-ধর্মের সাথে এমন ট্যাগিয়ে নিয়েছে যে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও যে বাঙালি হতে পারে তা বাকীরা একরকম ভুলেই গেছে বা মানতে চায় না । এর পরে ট্রেনেও কথা বার্তায় দেখেছি, আমার পাশে বসা বোরখা পরিহিত মুসলিম মেয়ের সাথে জিন্স টী-শার্টের মুসলিম মেয়ের কথা হচ্ছে হিন্দীতে । দুজনেই বন্ধু বা পরিচিত। সম্ভবত ঝাড়খন্ডী নন-বেঙ্গলি ।
—- ” রোজা কা টাইম আ গায়া। ফির ঈদ হ্যায়। মার্কেটিং হো গ্যায়া ক্যায়া তেরা ?”
—– ” হাঁ ইয়ার। অর বোল মাত , সালোয়ার শিলহানে দিয়ে তো শালে নে চুস্ত বানা দিয়া । বোলা কি , আব ইহি ফ্যাশান হ্যায় । ওয় বাংগালী লোগ বোলতে
হ্যায় না, চুড়ি-পাজামা !”
—- হাহাহাহা !
—– “সহি হ্যায় ইয়ার। বঙ্গালি মুসালমান লোগ ভি না এইসাহি কাপড়া বানাতে হ্যায় । ”
—“আরে ছোড় না , উহ লোক ভি মুসলিম হ্যায় ক্যা !”
— ” সাহি বোলা ইয়ার। বাংগালি লোগ মুসলিম বিরাদারি কা গিনতি মে নেহি আঁতে ।”
—” এক্সাক্টলি ইয়ার। বঙ্গালি মুসলিম লোগোকা না জাত হ্যায় না ধরম । ও ভি হিন্দু হি হ্যায় ।” এই দু-চারটে আম-জনতা বাক্যালাপেই প্রমাণিত ‘বাঙালি’ শব্দটার কি নির্মমভাবে বলাৎকার হয়েছে ।
না, এর জন্য ওই দেশভাগ, আর শ্রেণী বিভক্ত সমাজের ঐতিহাসিক বহু চটকানো তত্ত্ব বা তার ভুক্তাবশেষকে দায়ী করেই কিন্তু আমরা নিজেদের মানে, তথাকথিত
শিক্ষিত সমাজের স্বশিক্ষা বনাম সুশিক্ষার দায় কোনওভাবেই এড়াতে পারি না । এখনো আমার অনেক প্রগতিশীল উচ্চশিক্ষিত কর্পোরেট ওয়ার্কার হিন্দু বন্ধু আছে, যারা ফেসবুকেও নানা কথার ফুলঝুড়ি সাজায়, সমাজের নানা উচ্চ বর্গিয় ব্যক্তিদের সাথে ওঠা-বসা করে, নানা সমাজ সেবা মূলক কাজও করে । কিন্তু যখন বিদেশি বন্ধুদের সাথে আলাপ পরিচয় করে, তখন এইভাবে ভারতীয় কালচারের উদাহরণ দেয়,
—” ইটস দা টাইম অফ দূর্গাপূজা । উই আর নাও প্রিপেয়ারিং ফর আওয়ার কালারফুল ফেস্টভাল অফ ওয়ারশিপিং গডেস দূর্গা । দেন কামস কালী পূজা । ইউ সী, বেঙ্গলিজ আর ভেরি কালারফুল পিপল । উই বেঙ্গলিজ সেলিব্রেট ভেরিয়াস পূজাস, দোল পূর্ণিমা অর হোলি উইথ কালারস ।… ………… …… … ইন আওয়ার কালচার ম্যারেজ ইস আলসো ভেরি কালারফুল।
বেঙ্গলি ম্যারেজেস আর ডান উইথ ফ্লাওয়ারস, সিন্দুর দ্যাটস অলসো আ ডাস্টি রেড কালার । বেংগলী উইমেন্স উইয়ার হোয়াইট শাড়ি উইথ রেড বর্ডার ইন মেনি ফেস্টিভ্যাল অর সেলিব্রেশনস , লাইক বিজয়া দশমী হুইচ ইস দ্যা এন্ড অফ দূর্গা পূজা ……”

… … কথা চলতেই থাকে ফোনে, চ্যাটে , নেটে, ডেটে, স্কাইপে তে । সেই বিদেশি ব্যক্তিটি কতখানি ‘বাঙালি কালচার’ বুঝল , কে জানে । কিন্তু কথার আড়ালে থেকে যায় চাপা একটা অজ্ঞতা , অজ্ঞানতা , কুশিক্ষার বীজ । ‘বাঙালি কালচারে’ ঠাঁই পায় দূর্গাপূজা, হোলি , হিন্দু বিবাহ, সিঁদুর ইত্যাদি । বাদ যায় নবান্ন, বইমেলা, নববর্ষ, বসন্ত উৎসব, একান্ত বাঙালিদের মেতে ওঠার দিন ২১শে ফেব্রুয়ারির রঙ্গিন উজ্জ্বলতা । যে পরিচয়টা ভাষা ভিত্তিক হওয়া উচিৎ তা আজ একটি নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া প্রপার্টি বলে বদনাম কুড়াচ্ছে । যে পরিচয় ধর্ম-জাত ,শ্রেনী-বর্ণ, নারী-পুরুষ , উচ্চ-নীচ, পূর্ব-পশ্চিম ইত্যাদি মোটা দাগের গন্ডীকে এক লহমায় দূর করতে পারে, তা নিজেই আজ একটি বিশেষ জাতির পরিচয় বাহক । এটা
‘বাঙালি’ শব্দের অপমান, বাঙালি জাতির লজ্জা, গোটা একটা জাতির গ্লানী । আমার সকল ‘বাঙালি’ বন্ধুদের কাছে জানতে চাইছি, একবারও কি নিজেদের সন্তানদের ২১ শে ফেব্রুয়ারীর গল্প শুনিয়েছ ?

শুনিয়েছ যে একটা জাতি শুধুমাত্র তাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারের জন্য হাসতে হাসতে বারুদের সামনে বুক চিতিয়েছিল । তারা দেখেনি কোন ধর্মের লোক তার সাথে হাত মিলিয়েছে। তারা শুধু হাত গুলোকে আঁকড়ে ধরে মুষ্টিবদ্ধ করতে জেনেছিল । হাত গুলো, প্রাণশক্তিগুলোই তাদের কাছে বড় ছিল, ধর্মপরিচয় গুলো নয় । যদি সেই গল্প শুনিয়ে থাক তোমাদের আত্মজদের , তবে নিশ্চিত জেন, তারা আর যাই হোক সগর্বে নিজেদের হিন্দু বলার আগে ‘বাঙালি’ বলতে শিখবে । বাঙালি কোন ছেলে-মেয়ের সাথে বন্ধুত্বের পরে তাকে জিজ্ঞেস করবে না “তুমি বাঙালি হিন্দু নাকি বাঙালি মুসলিম?” আর যদি না শুনিয়ে থাক নিজেদের জাতির ভাষাগত সংঘর্ষের কথা, তবে নিজকে ‘বাঙালি’ বলে পরিচয় দেবার আগে, বিদেশি বন্ধুকে ‘বাঙালি কালচার’ বোঝানোর আগে এটাই পরিস্কার জেনে রেখ, তোমাদের মানব জন্ম হয়তো হয়ে গেছে, কিন্তু ‘বাঙালি’ হওয়া এখনো ঢের বাকি !

লেখক: পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানবাসী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

খুব ভাল লেখা। লেখায় কোনও রকম কল্পনা, বা অসততা নেই। বাস্তবের মাটি থেকে উঠে আসা সহজ সত্য। ধন্যবাদ।
তবেপ দুটি কথা আছে।
(১) দুর্গা ও গ্লানি-র মতো দু-চারটি শব্দের ভুল বানান না থাকলে আরও ভাল লাগত।
(২) হিন্দু, মুসলমাব, খ্রিস্টান….এর থেকে বাঙালি শ্রেষ্ঠ। একই যুক্তিতে বাঙালির থেকে মানব জনম অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ ও কাম্য। তাই শেষ বাক্যে ‘মানব জন্ম’-র বদলে ‘দ্বিপদ প্রাণী জন্ম’ শব্দ বোধহয় উপযুক্ত।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.