দণ্ডিত বধির বিটোফেন

Rape victনাহিদা পারভীন: মিতু নামের একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয় যখন আমি ইউনিভার্সিটির কয়েকটা সেমিস্টার শেষ করেছি মাত্র। সেই সময় আমি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। আমার বেশ কিছু লেখাও ছাপা হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটির অনেকেই সেই সুবাদে আমাকে চিনতে শুরু করেছে। আমি তখন নিজের ইচ্ছাতে চাইল্ড অ্যাবিউজ নিয়ে কাজ করছিলাম। পরিচিত, অপরিচিত অনেক মেয়েদের মতামত নিচ্ছিলাম, কারও কারও অভিজ্ঞতার কথা জানছিলাম। কিছু কোয়েশ্চেনিয়রও তৈরি করেছিলাম। সমস্ত তথ্য গোপন রাখা হবে এই শর্তে বিভিন্ন মেয়েদেরকে সেইসব পূরণ করতে দিয়েছিলাম। বেশ কিছু সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে এই বিষয়ে কথা বলছিলাম, তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতার কথা জানছিলাম।

মূলত আমি সে সময় পারিবারিক সদ্যসদের দ্বারা যেসব মেয়ে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় তাদের ব্যাপারে কাজ করছিলাম। এমন সময় আমার ইউনিভার্সিটির এক সিনিয়র আমাকে ডেকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেয় অন্য ডিপার্টমেন্টের মৌমিতা (ছদ্মনাম) নামের এক আপুর সাথে। মৌমিতা আপু আমাকে শর্ত দেয় যে, সমস্ত তথ্য গোপন থাকলে তিনি আমাকে একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন যে তার অনেক কাছের মানুষের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করলে তিনি আমাকে পরবর্তী দিন ইউনিভার্সিটি শেষে আমাকে একটি বাসায় নিয়ে গেলেন।

ছোট্ট, ছিমছাম গোছানো বাসা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত মিহি, কিন্তু কেমন জানি বেথাতুর এক সুর। যদিও সুরটি আমাকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। একজন প্রৌঢ় মহিলা বেরিয়ে আসেন ভেতর থেকে। বিভিন্ন কথার শেষে জানতে পারি উনার মেয়ের নাম মিতু। মিতুই আসলে মূলত ভিকটিম। মিতু এত বছর পর তার নিজের এই সব লুকানো কথাগুলি বলতে রাজি হয়েছে, জানাতে রাজি হয়েছে। কিন্তু উনার মেয়ের সমস্যা হলো, প্রায়ই সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, প্রচুর ভাংচুর করে এবং যে কারো গায়ে হাতও তোলে। সে সময় তার হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা। আমাকে মিতুর সাথে কথা বলার আগে বারবার এই ব্যাপারে সাবধানও করে দেন তিনি।
মিতুর (ছদ্ম নাম) মুখোমুখি হই আমি। কিন্তু তখনও আমার জানা ছিলো না সীমাহীন, হৃদয় বিদীর্ণ করা এক অন্ধকারের সামনে দাঁড়াচ্ছিলাম আমি। যে অন্ধকার আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিলো বা নিয়েছে, যে অন্ধকারের দাহ এত তীব্র যে সূর্যের আলোর চেয়ে তার বেশি তীব্রতা,তীক্ষ্ণতা। যা আমাকে শূন্য করে দিয়ে গেছে। আমাকে অসংখ্য প্রশ্নবানে জর্জরিত করে ভাসিয়ে দিয়েছে, নিমজ্জিত করেছে বেদনার অতল গহ্বরে। মিতুর দুইটি জ্বলজ্বলে চোখ তীক্ষ্ণ, তীব্র দৃষ্টি নিয়ে আমাকে যেনো কুরে কুরে খাচ্ছে।

আমাকে কারও বলে দিতে হয়নি যে এই মেয়েটির সাথে কোন এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে এবং মেয়েটি সেই সব বয়ে বেরাচ্ছে এত বছর পরেও। জীবনের কোন প্রাপ্তি, কোন সম্ভবনা তাকে বিন্দুমাত্র শান্তি, স্বস্তি বা মুক্তি দিতে পারেনি, শুধুই যেনো তাকে শুষে নিচ্ছে কোন এক অসীম বেদনা যার কোন শুরুও নেই, শেষও নেই।

আমি কেমন জানি মোহগ্রস্থের মত তার পাশে বসলাম। তার ঘরে বাজতে থাকা সেই করুণ সুর আর তার মায়াময় বিষাদমাখা মুখ আমাকে যেনো তার পাশে গিয়ে বসতে বললো। আমি অবচেতন মনে তার পিঠে হাত রাখলাম। সেই প্রথম আমাদের মাঝে সব নিরবতা ভেঙ্গে বলে উঠলো, “তুমি কি বিটোফেন শোনো? ভালো লাগে তোমার দণ্ডিত বধির বিটোফেন?”

আমার সারা শরীর হিম করে দিয়ে সে হাসতে থাকলো আর বারবার বলতে থাকলো, “ জানো, আমি এক দণ্ডিত বধির বিটোফেন…আমি এক দণ্ডিত বধির বিটোফেন”।

তীক্ষ্ণ ফলার মত সেই হাসি যেনো আমাকে আরও বেশী এলোমেলো করে দিলো। এবার আমি সব ভয় ভুলে পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মিতু আমার কাঁধে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো, আর বারবার আমাকে প্রশ্ন করতে থাকলো, “তুমি কি সব কিছু লিখতে পারবে যা আমি বলবো? সব কিছু, সব সব?”

Nahida Pervin
নাহিদা পারভীন

এরপর মিতু আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলো। মিতুর মা কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে ছিলেন বেশ কিছু সময়। তার মদ্যপ বাবা তাকে প্রতিদিন নির্দয়ভাবে যৌন নির্যাতন করত। ভয়ে, লজ্জায়, অপমানে কাউকে কিছু বলতে পারেনি সেই ১৬ বছরের কিশোরীটি। কিন্তু একসময় যখন সে কনসিভ করে ফেলে তখন তার মায়ের প্রবল প্রশ্ন ও ধিক্কারের মুখে তাকে সব স্বীকার করতে হয়। তার মায়ের পায়ের নিচ থেকেও মাটি সরে যায়। শুরু হয় মা ও মেয়ের নতুন সংগ্রাম। মিতুর এবরশন, মায়ের সেপারেশন, মিতুর অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ। ছিটকে যাওয়া, বিছিন্ন হয়ে যাওয়া জীবন থেকে,পরিচিত গণ্ডি থেকে। আর প্রতিদিন নিজের ভেতর বয়ে বেড়ানো রাশি রাশি অবিশ্বাস ও ঘৃণা।

মিতু প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করে দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ দুটি যেনো তার পাথর। মেয়েটি যেনো আর এই জগতের কেউ নয়। ঘরে বেজে ওঠা সেই সুরের মতন মিতুও যেন অদ্ভুতভাবে করুণ এক সুর হয়ে আমার চারপাশে বাজতে বাজতে হয়ে ওঠে এক দণ্ডিত বধির বিটোফেন। সেই সুর আমাকে বারবার সাগরের জলে ডুবাচ্ছে আর আমি যেনো কোন কিছুর তল খুঁজে পাচ্ছিনা। এর আগে আমি দূরসম্পর্কের আত্মীয় , মামা, চাচা বা অন্য কাউকে দিয়ে যৌন নির্যাতনের কথা শুনেছিলাম কিন্তু বাবা কর্তৃক? ?

এলোমেলো পদক্ষেপে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরতেই আমার বোনের পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে তানিশা দৌড়ে এসে আমাকে তার আঁকা ছবি দেখায়। ছবিতে নিজের আর তার বাবা ও মায়ের ছবি এঁকেছে সে। খুশিতে ঝলমল তানিশার চোখ কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখনও মিতুর কণ্ঠস্বর বেজে যাচ্ছে, “যদি তোমার বাবা তোমার সাথে এমন করতো তাহলে তোমার কেমন লাগতো? কেমন লাগতো?” মিতুর স্থির শান্ত চোখগুলি আমার বুকে পাথরের মত চেপে থাকে। আমি রাতের পর রাত ঘুমাতে পারিনি। শুধুই নিজের ভেতরে গুমরে গুমরে কেঁদেছি।

আমার নিজের জীবনেও চাইল্ড অ্যাবিউজের ঘটনা ছিলো। তখন আমি একটি শিশু মাত্র। একবার একজন বয়স্ক অনাত্মীয়র অনাকাঙ্ক্ষিত গায়ে হাত দেয়াকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। কাউকে কিছু বলতেও পারিনি, শুধুই জ্বলেছি, পুড়েছি নিজের ভেতরে। অথচ মিতুর ব্যাপারটা আরো অনেক ভয়াবহ, আরও অনেক দুর্বিসহ।

মিতু আমাকে বলেছিলো, “সমাজের কোন অংশে পচন ধরলে তা লুকিয়ে না রেখে বরং তা সবাইকে জানানো উচিত, তাহলে সময়মত তা প্রতিহত করা যায়, ব্যাধির মত তা আর ছড়িয়ে পড়ে না, আরও অনেকের জীবন নষ্ট হয়ার আগেই কিছু অন্তত করা যায়। তাই আমি চাই এই সব তুমি লিখো, যত পারো লিখো। যতভাবে পারো সবার সামনে আনো, আমি চাই না আমার মত আর কারও সাথে এমন ঘটুক।”

এই সব কিছু আমাকে রাতের পর রাত তাড়া করে ফেরে। প্রতিটি শব্দ আমাকে তাড়া করে। মিতুর কান্নার করুণ সুর আমাকে বিকারগ্রস্থ করে তোলে, যেন সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার দণ্ডিত বিটোফেন । আমাকে নিমজ্জিত করে, আমাকে আরো শূন্যতার অতলে নিয়ে যায়। আমার যন্ত্রণা হয়। আমি কাতরাতে থাকি। অবশেষে বিছানা ছেড়ে আমি উঠি, আমি লিখতে থাকি সব কিছু , সমস্ত কিছু। এই লেখাগুলিকে আমিও সবার সামনে নিয়ে আসতে চাই। আমিও চাইনা আর কোন মিতুর সাথে এমন ঘটুক। আর, সব তানিশারা যেন কোন গোপন হৃদয় ক্ষরণ করা গল্পকে বুকে না নিয়ে, অন্তত তার নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে, পরম শান্তিতে ঘুমাতে পারে । (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.