আমরা যারা একলা থাকি-৩৫

0

সুপ্রীতি ধর:

আমার একজন বন্ধু বলছিল, ঈশ্বর যদি থেকেই থাকেন, তবে এতো পরীক্ষায় কেন ফেলেন তিনি? আর সব পরীক্ষা কেন আমাকেই দিতে হবে? শরীর খারাপ, পুরো শরীরটাকে টেনে-হিঁচড়েও তোলা যাচ্ছে না, অথচ ছেলের স্কুল আছে, নিজের পেট বলেও একটা বিষয় আছে। অফিস তো আরও খারাপ জায়গা। সেখানে নিজের ‘অসুস্থতার’ কথা বলাই মুশকিল। কর্তা ব্যক্তিরা যেন ধরেই বসে থাকেন যে, আমাদের কোন রোগ-বালাই হতে নেই, আমরা যা বলি সব মিথ্যা বলি।

বহ্নি বললো, ওর মনটা খুব খারাপ আজ অনেকদিন ধরেই। ও ইলেক্ট্রনিক পণ্যের ব্যবসা করে। কত ঝড়-ঝাপ্টা যে তাকে পোহাতে হয়, ও বলে, লজ্জায় বন্ধুদের সেসব কথা বলি না। নিজের দুর্বলতার কথা কাঁহাতক বলা যায়! একটা ঘটনায় ওর সমবেদনা মনে বড় বেশি যন্ত্রণা দেয়। বলি যে, বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি, এখন রাখ ফোনটা। ও রেখে দেয়।

আমি তখন ভাবতে বসি। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমারও মনে হয় ভাল থাকা হলো না, আর হবেও না এ জীবনে। যখনই একটু কোমর সোজা করে দাঁড়াই, তখনই কেউ যেন তা ইচ্ছে করেই ভেঙে দিয়ে দূর থেকে মজা দেখে। এটা কি জীবনে একা থাকার সিদ্ধান্তের ফল? নাকি নিজের ইগো ঠিক রেখে চলার দায়? কোনটা?

গত কয়েকদিন ধরেই মনটা খারাপ রেহনুমার। অনেকগুলো কারণও আছে, যদিও সে জানে, এই কারণগুলোকে পাত্তা দিলেই পেয়ে বসে, অথচ দূরও করতে পারছে না। এই যেমন আজ সারাটা দিন সে বাসায় একা, কথা বলার মতোন কেউই নেই বলতে গেলে। ছেলে-মেয়ে নিজের মতো থাকে, রিকশাভাড়া চাওয়া ছাড়া মায়ের সাথে তার তেমন কিছু বলার নেই। রেহনুমার কাছে রক্তীয়দের চাইতে আত্মীয়দের মূল্য অনেক বেশি। তারপরও কিছু রক্তীয় থাকে, যাদেরকে সে মনেপ্রাণেই চায় আঁকড়ে ধরে থাকতে। কিন্তু তারা তা চায় কিনা, তা জানা হয় না রেহনুমার। কদিন আগে ফোন করেছিল তার বড় বোনকে। বলেছিল, চলে এসো বাসায়, বিকেলে একসাথে চা-মুড়ি খাওয়া যাবে। কিন্তু বোনটা বলেছিল, দেখি। রেহনুমা তখনই বুঝে যায়, এই ‘দেখি’ মানে সে আসবে না। তাহলে আর কাকে বলবে আসতে। খুব ইচ্ছে করছে আজ তার বাসায় কেউ আসুক।

দুপুরে ঘুমাতে গিয়েও পারেনি। অত:পর ওপার বাংলার একটা সিনেমা দেখলো সে ল্যাপটপে। সিনেমা কোনদিন একা একা দেখা যাবে বা দেখতে হবে, ছোট বয়সে রেহনুমা কি কোনদিন ভেবেছিল? এখন সে প্রায়ই নিজের একাকিত্ব কাটায় সিনেমা দেখে। গান শোনা হয় না। গান শুনতে গেলেই মনের ভেতরটা হু হু করে উঠে। একা থাকতে থাকতে আজকাল তার কথা বলার অভ্যেসও হারিয়ে গেছে, একসময় মুখে খই ফুটতো তার।

অথচ ছোটবেলায় ‘একা’ থাকার স্বপ্ন দেখতো, নির্জনতা উপভোগ করতো। বাড়িভর্তি মানুষের মাঝেও সে কি করে জানি একা হয়ে যেতে পারতো। বিয়ে বাড়িতে কদাচিৎ যেত সে। একবার বৌভাতের আগের রাতে সবার সাথে বারান্দায় মজা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছিল রেহনুমা, তখন সে ক্লাস নাইনে পড়ে। একথা মনে করে অনেকেই এখনও আশ্চর্য হয়। সেই রেহনুমা এখন শত চেষ্টা করেও লোক জড়ো করতে পারে না জীবনে। একা ঘরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে যেতে হয়।

‘এতোকিছু চায়নি বালিকা, চেয়েছিল আরও কিছু কম- এই কবিতাটি তার ভীষণ প্রিয় ছিল, মনে হতো, এ যেন তার জন্যেই লেখা। সেই কবির মতোন সে চাইতো, কেউ একজন তাকে রমনী বলুক। কিশোরী বেলায় তার খুব ইচ্ছে হতো, বাড়ির সবাই যদি কোথাও চলে যেত, আর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পেতো, কিন্তু সেই সুযোগ তার কমই হয়েছে জীবনে। আর এখন পড়ন্ত বেলায় পুরো বাসা তার খাঁ খাঁ করে, আয়নার দিকে ভুলেও তাকানো হয় না। কী দেখবে সে এতো বছর পর? রমণী হয়েছে, মা হয়েছে, সব শেষ করে এখন সে একা আঁকাবাঁকা পথ ধরে চলেছে শেষ গন্তব্যের দিকে। পড়ন্ত সূর্য তবুও উঁকি মেরে যায় জীবনে, বলে যায়, প্রেমহীন জীবন বিষাদময়, প্রেম কর, প্রেম কর। কিন্তু রেহনুমার মনে প্রেম আসে না। পুরুষকে আজকাল আর পুরুষ বলে বোধ হয় না। কারও স্পর্শ তার মনে শিহরণ জাগায় না। তাহলে কিছুই কি আর চাওয়ার নেই?

টানা বৃষ্টি শেষে আজ সূর্য উঠেছে পুরো আকাশে ভর করে। কিন্তু রেহনুমার মনের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কোথাও কেউ নেই তার, যে তাকে ডেকে নেবে ভালবাসার আমন্ত্রণে। একে একে সব পথ সে বন্ধ করে দিয়ে নিরিবিলি জীবন কাটাতে চেয়েছিল, তাই চলে গেছে সবাই। কেউ বসে নেই, কেউ বলার নেই, চলে এসো, আজ সন্ধ্যায় বসি কোথাও, আড্ডা দেই। আজকের নাগরিক জীবনে ভীষণ অচল-বেমানান রেহনুমা। কেইবা জানতো সে আজ এতোটাই একাকি হয়ে যাবে?

রাস্তায় বেরিয়ে সে একে-তাকে ফোন দেয়, শুধুমাত্র সময়টা কাটানোর এ্কটা পথ খোঁজে সে, কারও বাচ্চার পরীক্ষা, কারও বাচ্চা অসুস্থ, কারও স্বামী আজ বাসায়, গলার সুরেই স্পষ্ট বোঝা যায়, আজ সে সেখানে অনাহুত। কেউ ওর ফোন দেখে এড়িয়ে যায়, কেউ বলে বাসার বাইরে। রেহনুমা সব বোঝে, কিন্তু বুকের ভেতরটা কেবলই খালি খালি ঠেকে। এই শূন্যতা পূরণ হবে কী দিয়ে, কে জানে!

 

 

শেয়ার করুন:
  • 163
  •  
  •  
  •  
  •  
    163
    Shares

লেখাটি ৬০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.