এক টুকরো আকাশ!

Tania Lopa
তানিয়া মোর্শেদ

তানিয়া মোর্শেদ: আগের বাড়ীতে লিভিং রুমের সোফায় কাটতো দিনের বেশীর ভাগ সময়! সত্যিকার অর্থেই কাউচ পটাটো আমি! সেখানে বসেই ফেইসবুকে বকবকানী, বকবক করতে করতে কখন যে তা দিয়ে একটা বই বের করাতেও বন্ধু আইরিন রাজী করিয়েছিল! লাংসের দুটো সার্জারীর রিকভারী সেই সোফাতে শুয়ে-বসে। ব্যাক ইয়ার্ডের গাছ আর পাখী দেখা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। পেছনের রাস্তার ওপারে একটি ফার্ম হাউস ধাঁচের পুরনো বাড়ী। সামনে বেশ কয়েকটি কয়েক শ’ বৎসরের পুরনো গাছ। ফলে পাতার রং হলদে হয়ে ঝরে যাওয়া, শীতে পাতাহীন অবস্থা, বসন্তের কচি সবুজ পাতা আর গ্রীষ্মের সবুজ পাতায় ছেয়ে থাকা দেখা। শীতের পাতাহীন অবস্থার সময় বাড়ীটির পেছনের এবং এক পাশের র‍্যাঞ্চের (শেষ অংশ) ঘোড়া, লামা, ভেড়া, ছাগল দেখা যেতো। ঘোড়ার দৌড় দেখতে কী যে ভালো লাগতো! শেষের দু’ বৎসর এটা নিয়মিত ছিল।

জানা নেই ঘোড়াগুলো তখন থেকে ছিল না আগে এদিকে আসতো না! একদিন জানলাম যে সেই র‍্যাঞ্চের জায়গায় নূতন বাড়ী হবে বেশ কিছু। আমি বলেছিলাম, আমি তা দেখতে পারবো না। গাছগুলো কেটে ফেলবে! না আমাকে দেখতে হবে না। ছেলের আকাংখিত হাই স্কুলের জন্য বাড়ী বদলাতে হয়েছে। অন্য বাড়ী কেনা, সেই বাড়ী বিক্রি, এই বাড়ীতে ওঠা নিয়ে পুরো সামার গেছে ভীষণ ব্যস্ততায়।

এ বাড়ীতে আসার একমাসের একটু ওপরে হয়েছে। বাড়ী কেনার সময় জানতাম বাড়ীর পেছনে ওয়েট ল্যান্ড আছে। সেরকম খেয়াল করিনি বাড়ী দেখতে এসে। বাড়ীর চাবি যেদিন পেলাম, বুঝেছি বোনাস হিসাবে কি পেয়েছি! সকাল শুরু হয় ওয়েট ল্যান্ডের দৃশ্য দেখে, সন্ধ্যা শেষ হয় তা দেখে! একটি পন্ড, কয়েকটা গাছ, আর ঝোপ ঝাড় আর পাখী! মাঝে মাঝেই দেখা যায় শ্যাওলা বাদে যেখানে স্বচ্ছ জল সেখানে হাঁস সাঁতার কাটছে! আর সারাদিনে পাখীর উড়ে যাওয়া, ব্যাক ইয়ার্ডের ফেন্সে বসা আবার উড়ে যাওয়া। ওয়েট ল্যান্ডের কারণে পেছনের বাড়ীগুলো কিছুটা দূরে। অরেগনের কড়া ল্যান্ড রুলের জন্য বাড়ীর আশে পাশে বেশী জায়গা থাকে না। বাড়ীগুলো কাছাকাছি। অন্য অনেক স্টেইটে যেখানে একটা বাড়ীর থেকে আরেকটা বাড়ীর মাঝে বেশ কিছুটা জায়গা থাকে এখানে তা নয়।

বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বাড়ী বানাতে হয় ডেভলপারদের। ওয়েট ল্যান্ডের জন্য আমাদের বাড়ীর পেছনে বাড়ী সেই অনুযায়ী বেশ কিছুটা দূরে। ওয়েট ল্যান্ড ঘুরে বাড়ির এক পাশ দিয়ে যাওয়াতে সেদিকেও একই অবস্থা। ফলে ব্যাক ইয়ার্ড থেকে বেশ কিছুটা জায়গা এবং আকাশ দেখা যায়। পাখীদের এবং প্লেনের উড়ে যাওয়া দেখা যায় বেশ কিছুদূর। গত উইকেন্ডে এয়ার শো ছিল কাছের এয়ারপোর্টে। যাইনি। তবে ব্যাক ইয়ার্ড থেকেই বেশ কিছু সুন্দর দৃশ্য দেখেছি তিনদিন! অনুশীলন আর শো-এর দিন আট নয়টি প্লেন একসাথে বাড়ীর উপর দিয়ে উড়ে যেয়ে চক্কর দিলো! প্লেইনগুলো উড়ে এসে এয়ারপোর্টের দিকে যাবার জন্য ঘুরছিল বাড়ীর পেছনের আকাশে। পাখীরা যেভাবে উড়ে যায় সেভাবে!

ছোট পন্ডের মধ্যে বেশ কয়েকটি মরা গাছ দাঁড়িয়ে, পরে আছে। একটা জায়গা দেখিয়ে মিজান আমাকে বলেছিল, “মনে হচ্ছে না যেন কি যেন অজানা কিছু আছে বাঁকটার ওপারে!” আসলেই তাই! জীবনের কত যে অজানা বাঁক পার হচ্ছি! কখনো মনে হয়, আর বুঝি পথ নেই! পথ অনেক সময়ই থাকে না! পথ করে নিয়ে চলতে হয়! বাঁকে বাঁকে কত মানুষের সাথে দেখা, কিছুটা জানা হয়। আমি সেই ছোট্টবেলা থেকেই মানুষকে দেখি। কারো সাথে কয়েক ঘন্টা আলাপের পর সে কি ধরণের পোশাক পরিধান করেছিল জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারবো না। তবে তার কোনো না বলা গল্প আছে কি না তা বুঝে যাবো ঐ সময়ে। অনেক সময়ই দেখা যায় সেই মানুষ প্রথম সাক্ষাতে না হলেও কিছুদিনের মধ্যে তার গল্প আমাকে বলে দিয়েছে। অথচ আমি কাউকেই কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি না। ভালবাসা যেমন পেয়েছি, পেয়েছি অকারণ আঘাত আর অপমান। তবে যখনই আঘাতে আঘাতে বাথায় নীল হয়েছি, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে পেয়েছি অন্য জায়গা থেকে ভালবাসা, শ্রদ্ধা! কত বিচিত্র মানুষের আচরণ, চিন্তা, মন! একই ঘর-একই বিছানা শেয়ার করা, খাবার শেয়ার করা (ছোট আমার বড় হবার সময়) মানুষ মনে রাখেনি তার আনন্দের সময়! না এতে আমার কষ্ট হয় না। শুধু ভেবেছি, কি করে মানুষ পারে একটি শিশু বা বালিকাকে ভুলে যেতে! মিজানের স্টুডেন্ট লাইফে অচেনা মানুষকে বাড়ীতে আশ্রয়, নিজেদের খাবার দিয়ে নিজেরা কম খেয়ে থেকেছি (স্নো পরে সব বন্ধ ছিল), বিদেশে আসার প্রাথমিক পর্যায়ের কাজগুলোতে সাহায্য করা। পরে আর মনে রাখেনি! একাধিক বার এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। না অচেনা মানুষেরটা বেশী লাগে না। অতি চেনা মানুষ এর থেকে বড় আঘাত অপমান করেছে, করে!

পাবার আনন্দও কম নয়! ফেইসবুক যোগাযোগ করে দিয়েছে অনেক চেনা মানুষদের সাথে আবার নূতন কিছু মানুষের সাথেও। তাদের মধ্যে কিছু মানুষের ভালবাসা দেখে আমার বিশ্বাসটাই পোক্ত হয়েছে, আত্মীয় হচ্ছে যার সাথে আত্মার সম্পর্ক। ইংরেজী একটি শব্দের ভুল বাংলা করা হয়েছে। রিলেটিভের বাংলা কেন আত্মীয় তাই ভাবি। যার সাথে রক্ত বা আইনের সম্পর্ক তার সাথে আত্মার সম্পর্ক হবেই, থাকবেই তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার যার সাথে এই দু’ ধরণের কোনো সম্পর্ক নেই তার সাথে আত্মার সম্পর্ক থাকতেই পারে। বাংলাদেশে বাস করলে কিছু বিষয়ের অভিজ্ঞতা নাও হতে পারে। প্রবাসে অচেনা মানুষ বন্ধু হয়, আত্মীয় হয়। আবার নাও হতে পারে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে পেয়েছি কিছু মানুষের ভালবাসা আবার আঘাতও।

আজ কয়েকজনের কথা লিখতে ইচ্ছে করছে। ফেইসবুকেই যাদের চেনা। একজন অল্প সময়ের জন্য একটা কোর্স করতে এসেছে মাত্র। আসবার আগে যেদিন জানালো, আমি ফোন করলাম। এই স্বল্প সময়ের জন্য এসেও সে আমার সাথে দেখা করবে তা জানিয়েছে! এসেছে খুব কাছের জায়গায় নয়। আরেকজনের কথা আগেও লিখেছি (বই-এও আছে)। যখন যে কাজ বলি (মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে) করবেই। গতরাতে ফেইসবুকে জানিয়েছি, দেশে যাবার বিষয়ে। আজ একজন জানতে চাইলো কবে যাবো। শুনে জানালো যে যদি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকতাম তবে তার ভীষণ আনন্দের দিনে যোগ দিতে পারতাম। আজো দেখা হয়নি তার সাথে। ফেইসবুকেই পরিচয়। সে চাইছিল তার আনন্দের দিনে আমার উপস্থিতি! জীবনের বেশ লম্বা সময় এক সাথে থাকা মানুষ আমায় জানায়নি পর্যন্ত! কী বৈপরীত্য!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন যে পরিবেশ ছিলো আজ তা কল্পনার অতীত বাংলাদেশে। আমি ক্যাম্পাস-দেশ ছেড়েছি ১৯৯২-এ। তখন ছিল একেবারে পিচ্চি একজন। আজ সে কত বড় হয়েছে। এ বৎসরের শুরুতে চাকুরী নিয়ে পোর্টল্যান্ডে এসেছে। এত কেয়ারিং, এত ভদ্র ছেলে এখনো আছে তা ভাবতে বাধ্য হই। দেশে বেড়াতে (বিয়ে করতে) যাবার আগে জানালো, দেখা করবে। সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসবেই। এবার এসেছে বিশাল এক প্যাকেট, বোঝা যাচ্ছিল ছবি জাতীয় কিছু। খুলে আমি প্রথমে স্তব্ধ হয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য।

একটি ছবি ইন্টারনেট থেকে জোগাড়-প্রিন্ট- ফ্রেম করে নিয়ে এসেছে, আমার জন্য! শুধু তাই নয় কী করে আমায় এতটা বুঝলো! এই পোস্টার আমার পাওয়া উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম। আঁকা ছবি, ১৯৭১-এর নারীযোদ্ধার আর লেখা, “বাংলার মায়েরা, মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা”। অথচ ওর বেড়ে উঠবার সময় আমি ছিলাম না দেশে। ফেইসবুকে গত বৎসরের এক সময় যোগাযোগ।

ওকে এখনো পিচ্চি বলেই মনে হয় আমার, যদিও দেখতে এখন বড়সর মানুষ। আমায় এতটা বুঝেছে সে! এর ক’দিন পরেই আবারো নিশ্চিত হলাম যে, সাত+ বৎসর ধরে যাদের সাথে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে চলেছি তারা আমায় কিছুই বোঝেনি! মানুষের ইগো, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এতো বড় যে মানুষকে অবহেলা, অন্যায় অপমান করতে একটুও বাঁধে না! অথচ তারা দেখেছে, চরম অসুস্থ অবস্থায়ও আমি কী কী করেছি এবং কী ভাবে! শেষ কথা জানিয়েছি, যে চলতে চায় তার জন্য অনেক দরজা/ পথ খোলা থাকে।

আমার আছে আকাশ, গাছ, পাখী, সঙ্গীত আর কিছু আত্মীয় (রিলেটিভের বাংলা নয়!)!!

শেয়ার করুন:
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.