নিছকই একটি গল্প

Jhuma apa
পারভীন সুলতানা ঝুমা

পারভীন সুলতানা ঝুমা: এক মা ফুটফুটে দুই সন্তান রেখে অন্যত্র বিয়ে করে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়, বিশাল অঙ্কের বেতনের টাকা থেকে তাদের জন্য কিছু কিছু পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এই ঘরে সন্তান হওয়ার পর তার ছবি ফেসবুকে ডাউনলোড করে ,সঙ্গে থাকে সন্তানটির প্রতি তার ভালোবাসর আদিখ্যেতায় ভরা নানা স্ট্যাটাস।

এদিকে সেই পিতা দুই সন্তানকে একা একা মানুষ করতে থাকে। নিরলস পরিশ্রম। কারণ মায়ের মতো তত প্রাচুর্য্য তার নেই। তাই ছেলেমেয়েদের আবদার রক্ষা করতে হিমশিম খান। মায়ের মতো অন্যত্র বিয়ে করে সন্তানদের দায় দায়িত্ব থেকে নিজেকে খালাস করার ইচ্ছা মনের কোণেও স্থান পায়নি। দুই ছেলেমেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকে। তাদের রেখে অন্য বাবা এবং সন্তানদের সঙ্গে মায়ের সুখ আর উচ্ছাসের জীবনের ছবি ফেসবুকে দেখে দেখে তারা তাদের বর্তমান অবস্থা সহ্য করার শক্তি হারিয়ে ফেলে, বাবার পরিশ্রমকে তারা নিজেদেরকে বোঝা হিসাবে গণ্য করতে থাকে। এরপর দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় তারা আত্মহত্যা করবে, এবং করেও। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত বাবা একদিন ঘরে ফিরে তার দুই নয়নের মণির মৃতদেহ ঘরের মধ্যে ঝুলতে দেখে।

মিডিয়া ছুটে গেলো সেই অসহায় পিতার কাছে। বর্ণনা দিলো কী অসহনীয় কষ্টে এই পিতা বুক আগলিয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে মানুষ করেছে। একবারও নিজের সুখ-শান্তির দিকে তাকায়নি। একজন পুরুষ হয়েও বা বলা যায় একজন মানুষ হয়েও মায়ের মতো নিজ সুখের সন্ধানে অন্য নারীর দিকে তাকায়নি। সে কত নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে বাবা মা দুজনের ভূমিকা একা পালন করে গেছেন।

আর ঐদিকে স্বৈরিণী মা, ছেলেমেয়েদের ঠেলে দিয়েছে   বাবার কাছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় শুরু হলো অনুসন্ধান রিপোর্ট। এই মা নামের কলঙ্কিত নারীর অতীত জীবন নিয়ে বিশে¬ষণমুলক রিপোর্ট লেখার প্রতিযোগিতা চললো। উঠে আসলো এই চরিত্রহীনা নারী পুরান কর্মস্থলে কার কার সঙ্গে প্রেম ছিল তার রসাত্মক কাহিনী। বর্তমান স্বামীর সঙ্গে কীভাবে পরিচয়। পরিচিত হওয়ার পর তার প্রাক্তন স্বামীকে কত অবহেলা করেছে, তার সঙ্গে কী কী দুর্ব্যবহার করেছে। কীভাবে নিজ আত্মজ আর আত্মজার হাত ছাড়িয়ে স্বামীর সামনে পরপুরুষের সঙ্গে ধেই ধেই করে নানা পার্টিতে যোগ দিয়েছে। শুধু তাই নয়,অনেক সংবাদপত্রে রিপোর্টারের ক্রাইসিস থাকা সত্বেও রাজনীতি আর অর্থনীতির মতো বিট থেকে রিপোর্টার নিয়ে এসে এই আত্মহত্যার ঘটনায় অ্যাসাইন করা হয়েছে।

এ সুযোগ কী ছাড়া যায়, এক নারী তার স্বামী সন্তান ফেলে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, আগের ঘরের সন্তানরা এ শোকে আত্মহত্যা হরেছে, ইস কী দারুণ খবর, এটা যত সেই নারীকে লেখায় উলঙ্গ করা যায় ততই তো মালটি খাবে পাঠকরা।

পেয়েছি একটি নারীকে, তাকে লেখার মাধ্যমে বলাৎকার করতে না পারলে সাংবাদিকতা কী? একটি টিম চলে গেলো সেই নারীর পৈত্রিক আবাসে, কুমারী অবস্থায় তার কার কার সাথে প্রেম ছিল। আদৌ সে কুমারী ছিল কিনা। সেই স্বামীকে ঠকিয়ে কীভাবে তাকে বিয়ের বাঁধনে বাঁধলো। দরকার হলে সেই নারীর স্কুল কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরান সহপাঠীদের খুঁজে বের করা হবে।

আর বেচারা পিতার জন্য উৎসর্গিত হবে সমবেদনার ফুলঝুরি। একজন আদর্শ পিতা হিসাবে তার নাম ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। এ ধরনের আলোচনা চলবে প্রেসক্লাব থেকে বিভিন্ন মিডিয়া হাউসগুলোতে, স্কুলের সামনে অভিভাবকদের আড্ডায়, বাসে ট্রেন এবং সর্বত্র। বীর ও নির্ভিক পিতার উপাধি পাবে তিনি।

ফিসফাস করে যদি কেউ বলে এ পিতারও একজন প্রেমিকা ছিল, ধেয়ে আসবে নারীসহ অন্য পুরুষরা। কী দোষ যদি একজন বন্ধু থাকে? একাকি জীবনে ভদ্রলোকটির কী কোন বান্ধবী থাকতে পারে না? তা নিয়ে বলার কী আছে? বান্ধবী থাকার কারণে তো সে সন্তানদের প্রতি কোন অবহেলা দেখায়নি? মায়ের মতো ছেড়ে দেয়নি। এতটুকু ছাড় কী বাবাটাকে দেওয়া যায় না?

আর ঐদিকে সেই নারী মরমে মরে যাবে। সব আত্মীয়স্বজন তাকে ছি ছি করছে। সহকর্মীরা তার দিকে তাকাচ্ছে না। ফেসবুকে সবাই তাকে বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। স্বামীর ব্যবহারেও পরিবর্তন। মিডিয়ায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে লেখালেখিতে সেই ভদ্রলোকও এখন দ্বিধাগ্রস্থ। তিনি কোন নারীকে বিয়ে করলেন?

সবার কাছ থেকে ঘৃণা, সন্তানদের ফেলে আসার যাতনায় কাতর থেকে সকল অপরাধের বোঝা মাথা পেতে নিয়ে তিনি একদিন তিনি তার সন্তানদের পথে পা পাড়াবেন।

(এটি নিছকই একটি গল্প, কারও সাথে এর কোনো মিল নেই)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.