যৌন হয়রানি এবং একটি ছোলা-আছোলা কলা বিতর্ক

Mitu
শামীমা মিতু

শামীমা মিতু: মোহাম্মদপুরে একটি ছাত্রী হোস্টেলে কিছু ছেলের ভীতিজনক উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে যখন মেয়েরা পুলিশের দারস্থ হয়েছে তখন হোস্টেল তত্ত্বাবধায়ক এক ছাত্রীকে বলেন, ‘তোমাদের চলাফেরায়ও সমস্যা আছে। হামলা তো হবে। তোমরা শার্ট-প্যান্ট পর কেন?’

ব্যাস! ভিমরুলের চাকে ঢিল পড়লো এবং কিছু লোকজন নতুন ইস্যু পেয়ে গেলো। তাহলো শার্ট প্যান্ট পরা উচিত কী না মেয়েদের! কলা ছোলা রাখলে কি ভালো দেখায়? ডায়মন্ড যদি খোলা রাখা হয়, চোর তো চুরি করবেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

এর মাঝে আছে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী সুশীল। তাদের সুর এমন, ছাত্রী হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক যা বলেছে তার সবটুকু মিথ্যা নয়। এমন অসংখ্য মেয়ে আছে যারা আধুনিকতার নামে উগ্রতা, অশ্লীলতা কিংবা অতি-আক্রমণাত্মক আচরণ করে থাকে। তবে সেই অর্ধশিক্ষিত একটি নারীগোষ্ঠির উদ্ভট আচরণ ও বিকৃত রুচির জন্য ঢালাওভাবে সমগ্র মেয়ে-সমাজকে দোষারোপ করা একটি মারাত্মক অপরাধ।

কোনো নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হলে, ধর্ষণের শিকার হলে যেসব মন্তব্য শুনতে হয় তা হলো, ‘এক হাতে তালি বাজে না!’ মাইয়ারা কী দুধে ধোয়া? মাইয়াগো চলন বলনের ঠিক নাই, কাপড় চোপড়ের ঠিক নাই, এমনে চললে তো ধর্ষণ হইবই! মাইয়াগো যদি পর্দা ঠিক না থাকে তাইলে তো ধর্ষণ হইবই! মাইয়া মানুষ পর্দা না করলে পুরুষ মানুষের তো নজর লাগতেই পারে!

আসলেই কি পর্দা নামক জিনিসটি গায়ে চাপিয়ে ধর্ষণ ঠেকানো সম্ভব? হয়রানি ঠেকানো সম্ভব? বখাটের উৎপাতে যখন মাদ্রাসা ছাত্রী আত্মহত্যা করে, কোথায় থাকে তখন পোশাকী ভাষণ?

জিন্স-ফতুয়া পড়লে তো তাও শরীরের সব অংশ ঢেকে থাকে, গ্রামের নারীরা যে শাড়ী পরে থাকে তাতে কোমর, পিঠসহ শরীরের অনেক অংশই দেখা যায়। তাহলে কি তাদের সবাইকে ধর্ষণ করতে হবে? বা করে? তাছাড়া মেয়েরা কি তাদের শরীরের ইজারা কি কাউকে দিয়ে রেখেছে?

পোশাকের উগ্রতা, অশ্লীলতা কি জিনিস? কারা করে এগুলো? আর কেউ যদি করেই থাকে কে দায়িত্ব নিছে এগুলো দূর করার, বখাটেরা? কই আমি তো দেখি না পোশাকের উগ্রতার জন্য কোনো মেয়ে হয়রানির শিকার হয়েছে। হাড় জিরজিরে শরীরের যে গার্মেন্টস কর্মী ধর্ষণের শিকার হয় তার পোশাকে কি উগ্রতা ছিল? কি আবেদন সৃষ্টি করেছিল যা পুরুষের শরীরকে উত্তেজিত করেছে?

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার দিকে চোখ রাখি:

২৮ সেপ্টেম্বর-সাতক্ষীরায় বখাটের উৎপাতে শিশু ছাত্রীর স্কুল বন্ধ

৩১ আগস্ট-মাধবপুরে বখাটের উৎপাতে অতিষ্ঠ অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রীর আত্মহত্যা

১০ আগষ্ট-বখাটে যুবকদের উৎপাত সইতে না পেরে যশোরে কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যা

১৪ জুন-নাটোরে বখাটেদের উৎপাতে হোস্টেল ছাড়া ৩৫ ছাত্রী

১৬ এপ্রিল-বখাটেদের উৎপাত সহ্য করতে না পেরে পল্লবীতে এক মাদ্রাসা ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা

১০এপ্রিল-বখাটের উৎপাতে গাইবান্ধার এক মাদ্রাসা ছাত্রীর আত্মহত্যা

১ এপ্রিল- কিশোরগঞ্জে এক বখাটে স্কুলছাত্রীকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ওই ছাত্রী মারা যায়।

স্কুল ছাত্রী, মাদ্রাসা ছাত্রী কতটা উগ্র পোশাক পরে? কতটা অশ্লীলতা ছড়ায়? তাদের চলাফেরায় কতটা সমস্যা থাকে। প্রশাসন, সমাজের মানুষ, রাষ্ট্র যদি নরপশুদের হাত থেকে মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে না পারেন তো থুথু ফেলে তাতে নাক ঘষেন কিন্তু পোশাকের দোহাই দিয়ে নিজেদেরও পশুদের কাতারে দাঁড় করাবেন না। সেদিন খুব বেশি দূরে নেই যেদিন মেয়েদের হাতে জুতো উঠবে আর তার সামনে থাকবে আপনাদের গাল।

আমাদের সমাজের কিছু সংখ্যক লোক নিজেদের নোংরা চরিত্র ঢাকার জন্য যৌন হয়রানি, ধর্ষণের জন্য মেয়েদের দায়ী করে। আর যখন তারা দেখে যে তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো মেয়ে বস্তাবন্দি হচ্ছে, তখন তারা ধরে নেয় মেয়েটি দুর্বল। পৃথিবীর অনেক দেশে যেটা হয়েছে, নারী যখন বস্তাবন্দী হয়েছে তখন তাদের শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পোশাক যেমন ধর্ষণের কারণ নয়, ঠিক তেমনি পোশাক কখনোই ধর্ষণ ঠেকাতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.