অক্ষমের আস্ফালন

Rape victফাহমিদা আক্তার শীলা: আড়াই বছরের ছেলেকে নিয়ে পুলিশ কাস্টডিতে নিধি। সে কেন পুলিশ কাস্টডিতে সে গল্প একটু পরে বলি।

২৫ বছর বয়সী নিধির সুন্দর-স্বচ্ছল (সাদা চোখে দেখা) জীবনে গত এক বছরের মধ্যে এতটা ওলট-পালট ঘটনা ঘটবে তা নিধি কেন, তার আশেপাশের কেউই ভাবেনি। সুস্থ স্বাভাবিক কিছু অবশ্য নিধির জীবনে ছিল না। বেসুরো সুরে বাঁধা তার জীবন। জন্মের কয়েক বছরের মধ্যে বাবাকে হারিয়েছে নিধি। তার মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন। নতুন সংসারে সাথে নিয়ে গেলেন নিধিকে। সেখানে নিধির বেড়ে ওঠা ছিল পরগাছার মতো। মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের ব্যবসায়ী তুষারের সাথে বিয়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন নিধির মা।

নিজের (?) সংসারে এসে জীবনকে নতুন করে দেখছিল নিধি। হয়তো জীবনকে উপভোগ করার স্বপ্নও দেখছিল। ঈশ্বর সেসব দিনগুলোতে মুচকি হেসেছিলেন। নিধির নিয়তি নির্ধারণকারী ঈশ্বর তো দেখছিলেন সামনে কি ঘটছে। বিয়ের পরও পড়াশুনা চলছিল। রাজধানীর নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে নিধি। নিয়মিত না হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত আছে। তবে পরীক্ষায় নিয়মিত সে। প্রথম বর্ষ পার হয়েছে। তার লেখাপড়া করা নিয়ে শ্বাশুড়ীর গর্বও আছে। প্রতিবেশীদের গর্ব করে বলেন, ছেলের বৌ তো তার মেয়েই। তার লেখাপড়া বন্ধ করা তো অন্যায়। সংসারের নিয়মেই বিয়ের কিছুদিন পর সন্তানের প্রসঙ্গও আসলো। অবসরপ্রাপ্ত শ্বশুর-শ্বাশুড়ি সময় কাটানোর জন্য নাতি-নাতনি চান। সময়ের দাবিতে নাতি আসলো ঘর আলো করে। বসলো চাঁদের হাট।

অদৃশ্য কলকাঠি নাড়তে শুরু করলেন ঈশ্বর। হ্যাঁ ঈশ্বরই তো সব নির্ধারণ করে রেখেছেন। সন্তানের এক বছর বয়স না হতেই স্বামীকে অচেনা ঠেকছিল নিধির। অকারণে রাগ-বকাঝকা। মানুষটা কেন এমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে, নিজেকেই প্রশ্ন করে নিধি। সংসারের তথাকথিত মাপকাঠিতে নিধি দেখতে অনেক সুন্দর আর স্মার্ট। তার গায়ের রং ফর্সা। সন্তানের মা হলেও তার শরীরের বাঁকগুলো মাশাল্লাহ সুন্দর, মাপজোকও ঠিক-ঠাক। তাহলে কেন স্বামীকে ধরে রাখতে পারছে না নিধি?

কারণ নিধি জানে না ঘরের জিনিসে আর রুচি নেই তুষারের। বাইরের কোন উদ্দাম-উচ্ছল রমণীতে আকৃষ্ট সে। রুচি বদল হয়েছে তার। ব্যবসা-সংসার তুচ্ছ এখন নিধির স্বামী তুষারের কাছে। ব্যবসায়ে দেনা বাড়ছে। ব্যবসায়ী বন্ধু-পার্টনাররা তুষারকে ছেড়ে যাচ্ছে একে একে। এরই মধ্যে নতুন প্রেমিকাকে গোপনে বিয়ে করলো তুষার। গোপনে ঘটলেও ঘটনা গোপন থাকলো না। তুষারের বাবা-মা অবশ্য এতে তুষারের ত্রুটি দেখলো না। তারা মনে করেন নিধিই তো তুষারকে ধরে রাখতে পারেনি। অপবাদ-লাঞ্ছনার সাথে তুষারের শারিরীক নির্যাতনও বন্ধ থাকেনি। রাগ-কষ্ট-অপমান সবই নিধি হজম করার চেষ্টা করেছে ছেলের মুখ চেয়ে। আর সহ্য না করে নিধি যাবে কোথায়? মায়ের দ্বিতীয় সংসারে?

ব্যবসায়ের ক্ষতি পোষাতে রাজধানী ছাড়ালেন তুষারের বাবা-মা। শখের গাড়ি বিক্রি হলো। ছেলেকে নতুন সংসারে রেখে গ্রামে ফিরলেন তুষারের বাবা-মা। সাথে নিয়ে গেলেন তুষার-নিধির চিহ্ন দুই বছর বয়সী শিশুটিকে। ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছায় ছেলেকে ভুলে থাকারও অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিল নিধি। ছেলেসহ শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে বিদায় দিয়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় খুঁজলো নিধি। চাইলেই কি সব পারা যায়? নিধিও পারলো না।

শিশুটির প্রয়োজনে নিধিকে ফিরে আসার প্ররোচণা দেন নিধির শ্বাশুড়ি। ছেলের মায়ায় নিধিও তাতে সাড়া দিল। দুর্ভোগ তাকে ওই পরিবারে টেনে নিয়ে গেল। তুষারের টানে আবার রাজধানীতে ফেরত আসলেন তুষারের বাবা-মা। সাথে এলো তুষারের ছেলে আর স্ত্রী-নিধি। মাসও ঘুরলো না। বাড়িতে পুলিশ। না তুষারের খোঁজে নয়, পুলিশ আসলো তুষারের মা আর স্ত্রী নিধিকে খুঁজতে। তারা কি অপরাধ করেছেন? তারা পাওনাদারদের চেক দিয়েছেন। সেসব চেক বাউন্স করেছে। ব্যাংকে দেনা শোধের মতো যথেষ্ট টাকা না থাকলেও পাওনাদারদের শান্ত করতে ওই চেকগুলো দিয়েছিল তুষার। পুলিশ নিয়ে গেল তুষারের মা আর স্ত্রী নিধিকে।

দু’এক দিনের মধ্যে মা’কে থানা থেকে নিয়ে আসলো তুষারের বাবা। কিন্তু নিধিকে আনবে কে?

লেখক: সহকারি বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.