প্রেমহীন জীবন বিষাদময়, কেবল বয়ে চলা!

Putul
সুলতানা রহমান

সুলতানা রহমান: আমি তখনো ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে, আর আমার এক বান্ধবী বিয়ে সংসার সন্তানের পাট চুকিয়ে বিচ্ছেদের দরোজায় দাঁংড়িয়ে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সন্তানকে সে কিছুতেই বাবার কাছে দেবেনা। খুব কান্নাকাটি করছিলো।
আমি বললাম-তোর কোনো আয় রোজগার নেই, নিজে চলবি কিভাবে আর বাচ্চার দেখাশোনাইবা করবি কি দিয়ে! বাচ্চাটাকে বরং ওর বাবার কাছেই দিয়ে দে, ল্যাটা চুকে গেলো!
আমার বান্ধবী চোখ মুছতে মুছতে বললো-তুই বুঝবিনা, মা হলে বুঝবি!

আমার মা বিধবা হয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সে। এখন তার ৫৬ বছর। বছর কয়েক আগে মাকে জিজ্ঞেস করলাম-একা একা কি করে কাটালে জীবনের সবচে সুন্দর সময়গুলো?
আম্মু বললো-একা কোথায়!! তোরা তো ছিলি। তোদের ছোটো ছোটো মুখের পরিণত অবয়ব দেখার আশায় কেমন করে সময় চলে গেলো বুঝতেও পারিনি!
বলি-সব মানুষেরই একান্ত ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকে। মাতৃত্ব হয়তো অনেক বড়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি-দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে একজন সঙ্গী তো দরকার,,,
মা শুধু বললেন-প্রেমহীন জীবন বিষাদময়, কেবল বয়ে চলা! কেউ একজন থাকলেই কি আর সে সঙ্গী হয়ে ওঠে? প্রেম-ভালবাসা-হীন সঙ্গী আর ঘরের টেলিভিশন ফ্রিজের মধ্যে কি ফারাক?
হাসতে হাসতে বলি-ওরে প্রেমরে!! ১৩/১৪ বছরের সংসার জীবনে পাঁচটা ছেলেমেয়ে, আব্বু বেঁচে থাকলে আমরা না জানি কত ভাইবোন হতাম!
আম্মু ধমক দিয়ে বলে-যা ভাগ!!

চারদিকে ঘনকালো শূন্যতায় ভর করে আমার বান্ধবী লিখতে শুরু করে নিজের নতুন জীবন। গভীর অন্ধকারে দূরের একবিন্দু আলো মনে যতোটুকু আশা জাগায়, সন্তানের মুখচ্ছবি বুকে নিয়ে বহু দূরের গন্তব্যে শুরু করে পথ চলা। জীবনে ডিলিট অপশন না থাকুক, অক্ষরে অক্ষরে ঘুরিয়ে তো দেয়া যায় জীবনের গল্প, ফুল করে ফোটানো যায় জীবনের সব ভুল। বান্ধবীটি নতুন করে শুরু করে পড়ালেখা, ঘুরিয়ে দেবে জীবনের গল্প। তাতে তাকে কেবল বন্ধ রাখতে হয়েছে চোখ আর কান দুটো। কিছুই সে দেখবে না, কিছুই সে শুনবে না, কেবল ওই দূরের আলোক বিন্দুটিকে গন্তব্য ভেবে এগোবে আর চারপাশে যা কিছু ঘটবে তা ওই আলোক বিন্দুর কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

ওই আলোটি যতটা অধরা মনে হয়েছিলো আসলে তা ততটা দূরের ছিলো না। কিংবা হয়তো দূরেই ছিলো, ইচ্ছা শক্তি তা নিকট করে তোলে।

গল্প যখন লেখা হয় তার পরিণতি থাকতে হয় লেখকের নিয়ন্ত্রণে, শুধু কল্পনার ফানুস ওড়ালেই গল্প হয়না, যৌক্তিক পরিণতি পাঠককে অভিভূত করে, নয়তো পাঠক তা ছুঁড়ে ফেলে! আমার বান্ধবীটি জীবনের এমন গল্প রচনা করলো আমি তার অভিভূত পাঠক বনে গেলাম। যে ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে সে শুরু করেছিলো নতুন জীবন, তা এখন অনেকটাই পরিনত। ৭/৮ বছরের একাকীত্বের লড়াই, অনেক বেদনা-অনিশ্চয়তা নিয়ে পড়ালেখা শেষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছে। সন্তানের সঙ্গে পরামর্শ করে খুঁজে নিয়েছে একজন জীবন সঙ্গী। তার শিশুটিও আর শিশু নেই। বাবা-মার বিচ্ছেদে অন্য দশ জন যেমন মুষড়ে যায়, সে তা নয়। তার বেড়ে ওঠা, তার জীবন বোধ, তার স্বাবলম্বিতা তাকে তার সমবয়সীদের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে। অতপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতেছে……

আমার শিশুটির জন্মের সময় আমি খুব অসুস্থ ছিলাম। ডাক্তার ঘুমের অসুধ খেয়ে ঘুমাতে বলেছিল আমাকে। আমি খেতে চাইতাম না-ঘুমিয়ে গেলে বাচ্চাটিকে দেখবো কি করে!! কিন্তু মা জোর করে আমাকে ঘুমের ওষুধ দিতো, আমি চেঁচামেচি করতাম। মা বলতো-তোর বাচ্চাটার জন্য তোর যেমন মায়া, আমার বাচ্চাটার জন্যও তো আমার তেমন মায়া….

বহু বছর আগে জেলখানা থেকে আমার বাবার পাঠানো ছোট ছোট চিরকুট আর চিঠি নিয়ে বসে থাকে আমার মা। চিরকুটগুলো যত ছোটই হোক, হোক দেশলাই কিংবা সিগারেটের প্যাকেটের ছেঁড়া অংশ, তার প্রতিটির সম্বোধনে ‘আমার জীবনের সাথী’ এবং ইতিতে ‘তোমার জীবনের সাথী’ লিখতে ভুল হয়নি কখনো। সেই মৃত স্বামীকেই জীবনের সাথী বানিয়ে শিশু সন্তানদের পরিণত অবয়ব দেখার আশা তার পূরণ হয়েছে বটে। কিন্তু তার জীবনের একাকীত্বের বেদনা ঘোচেনি কোনোদিন।

আমি সেই পরিনতদের একজন, মা ফোন দিলে বলি-আম্মু খুব ব্যস্ত আছি, একটু পরে ফোন দিচ্ছি। ‘আচ্ছা’ বলে আম্মু ফোন রেখে দেয়, তারপর হয়তো তিন দিন কেটে যায়, আমার ফোন দেয়া হয় না, ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে আম্মুই আবার ফোন করে, সুযোগ থাকলে কথা বলি, না থাকলে আবারো সরি বলতে হয়….আর যখন সময় পাই তখন কেবল নিজের শিশুটির কথাই মনে পড়ে…..

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.