একটি আকুল আবেদন ও একজন জয়শ্রী জামানের চরিত্র

Afrin Jahan
আফরিন জাহান

আফরিন জাহান: ব্যক্তিত্বের গভীরতা যে জয়শ্রী জামানের ছিল সেটা তাঁর জীবনযাপনের ধরণ দেখে বোঝা যায়। তারপরেও বলব একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে অবশ্যই জয়শ্রী জামান চেষ্টা করেছেন ন্যূনতম সম্মানকে অবলম্বন  করে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকতে। প্রতিনিয়ত কষ্টকে জয় করে দেখেছেন সন্তানকে মানুষ হিসেবে মানুষ করার স্বপ্ন। তাইতো বাবা আওয়ামী লীগের এত বড় একজন নেতা হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক তেমন সুবিধা তিনি পাননি বা নেননি। কিন্তু তারপরেও একটা সময়ে যখন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছিল তাঁর তখন উপায় না পেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি লিখেছিলেন।

কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে হয়তো জয়শ্রী জামানের সেই আকুতি দৃষ্টিগোচর হয়নি। হবে কিভাবে? যেখানে প্রতিনিয়ত চাটুকারদের দৌরাত্ম্য, সেখানে একজন অসহায় জয়শ্রীর আকুতি দ্বিধাহীন ও নি:স্বার্থভাবে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পৌঁছাবে কে?

সত্যিকারভাবে বলতে গেলে এই এখন আমাদের দেশের অবস্থা। তা না হলে যেখানে আমির হোসেন আমুর মত একজন বর্ষিয়ান নেতার সূত্র ধরে জয়শ্রীর চাকরী পাওয়া সেই চাকরীও যায় যায় কেন? কেনইবা তা অস্থায়ী থাকে। জয়শ্রী যেখানে কাজ করেন সেখানকার কর্তা ব্যক্তিরাওতো নিশ্চয়ই জানেন যে জয়শ্রীর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড কি, তারপরেও কি অসহায় এই দু:খী মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারতেন না? পারতেন না জয়শ্রী জামানের মাসিক সম্মনীটুকু কিছুটা বাড়িয়ে দিতে কিংবা চাকরী স্থায়ী করতে?

জয়শ্রী জামান এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বড় বড় নিউজ পোর্টালে এবং দৈনিকে তাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় এখন সবাই ব্যস্ত অসহায় এক সন্তানহারা সাংবাদিক মায়ের চরিত্র রক্ষা করতে এবং এখানে দেখেছি নারীদের সংখ্যাই বেশি। পুরুষরা যে সঙ্গে নেই তা বলছি না। সমাজের বিবেকবান কিছু সচেতন পুরুষও রয়েছেন জয়শ্রী জামানের চরিত্র রক্ষার এই আন্দোলনে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে চরিত্র কি শুধু নারীদের, পুরুষদের নেই? আমার মনে হয় এখানেও নারীর চরিত্রে বিভক্তি। সেটা যদি নাই হতো তবে জুরাইনে নিহত নারী সাংবাদিকের চরিত্র হননটা সবার ব্রত হতো না কিংবা সাগর ভাইকে বাদ দিয়ে রুনী আপুর চরিত্র নিয়ে টানা হেঁচড়া চলত না। এই হল আমাদের সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র।

জয়শ্রী জামানের সন্তান মারা যাবার পর তার স্বামী থেকে শুরু করে স্বামীর সুহৃদরা অসহায় এই নারীর চরিত্র নিয়ে কথা বলছে। জয়শ্রী জামানের সামনে এখন দুটি পথ। তিনি কি করবেন, সন্তানের শোক বইবার সাহস সঞ্চয় করবেন নাকি চরিত্র হরণকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হল কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ানোর মত সময় কি সেই কুচক্রিরা জয়শ্রী জামানকে দিবেন কিনা। স্বামী দিব্যি চীনের মত বড় দেশে ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করছেন আর এদিকে এক নি:স্ব মা সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

শ্রদ্ধেয় মিলি আপা(সাংবাদিক ফারহানা মিলি) জয়শ্রী জামানের স্বামীর কাছে কাছে কিছু প্রশ্ন রেখেছিলেন সেই একই প্রশ্ন আমিও রাখতে চাই। তিনি যদি সত্যিই ঐ সন্তানদ্বয়ের বাবা হতেন তবে কি শেষবারের মত সন্তানদের দেখতে আসতে পারতেন না? চীন সরকার কি এতই নির্দয় যে সন্তান হারানো বাবাকে সন্তানদের শেষবারের মত দেখতে দেশে আসতে দিতো না? দুরে বসে এমন বিজ্ঞ ভাব দেখানো কিংবা জ্ঞানীদের মত কথা বলা যায় কিন্তু বাস্তবতাকে দেখতে সামনে আসতে হয়। জয়শ্রী জামানকে দোষ দিয়ে কি আলিমুল হক নিজের দায় এঁড়াতে পারেন? মানুষের যত আই ওয়াশ করেন না কেন সাংবাদিক আলিমুল হক বিবেকের তাড়নার অর্ন্তদংশ তার হবেই, সেটাকে তিনি ঢাকবেন কিভাবে?

এখন আসি আবার প্রধানমন্ত্রী বরারবর জয়শ্রী রায়ের চিঠির বিষয়ে। এখন হয়তো প্রতিনিয়ত খবর কিংবা সম্পাদকীয় দেখে প্রধানমন্ত্রী জয়শ্রী জামানের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু ডাক্তার আসিবার পূর্বে যদি রোগি মারা যায় তবে সেই ডাক্তার কি শুধু রোগির নারি দেখে বিদায় নিবেন নাকি আর এক প্রস্ত ময়না তদন্ত করে রোগীর লাশকে কেটে কুটিকুটি করবেন। আর জয়শ্রী জামানের কি এখন সত্যিই চাকরীটা স্থায়ী করণের প্রয়োজন কিনা। যাদের জন্য এত পরিশ্রম তারা যদি নাই থাকে তবে চাকর দিয়ে কি হবে? তারপরেও বলব হয়তো জয়শ্রী জামানের সেই আবেদন প্রদানমন্ত্রী বরাবর পৌঁছাবে এবং তিনি জয়শ্রীর সাহায্যে এগিয়ে আসবেন কারণ তিনিও যে একজন স্বজন হারানো নারী।

আফরিন জাহান, সাংবাদিক, গবেষক, ব্লগার

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.