আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?

women abstractসুমন্দভাষিণী: দুই ভাইবোনের আত্মহত্যার ঘটনাটি আবার নাড়িয়ে দিয়েছে অনেককে। বিশেষ করে যারা একলা থাকেন, একাই যারা সন্তান লালন-পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন, তারা অনেকখানি মুষড়ে পড়েছেন এই ঘটনায়। বাচ্চা দুটোর সাংবাদিক মা কষ্ট করে একাকি জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন, সেই মায়ের সব কষ্ট ‘লাঘব’ (বাচ্চাদের ভাষায়) করে দিয়ে চিরতরে চুপ হয়ে গেছে দুই ভাইবোন। একবারও ভেবে দেখলো না মাকে তারা কোথায় ফেলে যাচ্ছে! মায়ের লড়াইয়ের কোন মূল্যই দিল না ওরা। সেই লড়াইয়ে শামিল না হয়ে ওরা বরং মাকে হারিয়েই দিয়ে গেল।

একদিকে দু’দুটি সন্তান হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার কষ্ট মা’কে পাগল করে দিচ্ছে। দুদিন আগে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার পর মাকে জোর-জবরদস্তি করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে, ঘুম ভাঙলেই সে ছটফট করতে থাকে, অস্থির হয়ে উঠে, চিৎকার করে। এই মাকে সান্ত্বনা দেয়ার কোন উপায় কারও কাছেই নেই। যেই কাছে যাচ্ছে, কেবলই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে। গেগাঙানোর শব্দ চারদিকে, এক পর্যায়ে শুনশান নীরবতা।

সন্তান হারানোর কষ্ট মা-ই জানে শুধু। আর ওদের বায়োলজিক্যাল বাবা ফোন করে খবর নিয়েছে শুনলাম। তার নতুন সংসার, সেই সংসারেও নতুন সন্তান। তার কষ্টের পরিমাণটুকু আমরা জানতে পারছি না। যখন তিনি ছেড়ে গিয়েছিলেন তখন তো ভাবেননি এই সন্তানদের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে এর! মা-ই কি ভেবেছিলেন? দুজন মানুষের অসহিষ্ণুতা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, এ যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দুটি ভাইবোন।

এই ঘটনার পর অধিকাংশই নড়েচড়ে বসেছে। যারা একা থাকেন সন্তানসহ, তাদের ভিতরে ভীষণ রকমের নাড়া দিয়ে গেছে এই ঘটনা। নানা প্রসঙ্গ উঠে আসছে। বাবা-মায়ের একাকি জীবন, সন্তানদের ওপর এর প্রভাব, বাবার দায়িত্বহীনতা বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, মায়ের একার লড়াই, রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্ব, এসবই আলোচনা-সমালোচনার মূল বিষয়। কিন্তু কোনো সমাধান টানতে পারছেন না কেউই।

পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে হত্যা করেছিল তাদেরই কিশোরী মেয়ে ঐশী। সেও ইংরেজি মাধ্যমে পড়তো। মাদকাসক্ত ছিল সে। এই ঘটনার পর তুমুল হৈ চৈ হয়েছিল তখন। নড়েচড়ে বসেছিলেন বাবা-মায়েরা। গুড প্যারেন্টিং, ব্যাড প্যারেন্টিং নিয়ে তখন কথা উঠেছিল। এবার দুই ভাইবোন, বয়সে তারাও কিশোর-কিশোরী, আত্মহত্যা করে আবারও সমাজের চোখে ধরিয়ে দিয়ে গেল আরও কিছু অসঙ্গতি। যে অসঙ্গতির আপাত কোনো সমাধান নেই, যতক্ষণ না মানুষের মাঝে অধৈর্য্য, অসহিষ্ণুতা কমছে।

নষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব পড়ে সমাজের সবক্ষেত্রে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও তার আওতামুক্ত না। এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে কাটছে আমাদের সবার জীবন। সামাজিক বিধিনিষেধ, রীতিনীতি, নিয়ম-নৈতিকতার থোরাই কেয়ার করে আমরা মূল্যহীনভাবে পার করে দিচ্ছি একেকটা মূল্যবান জীবন।

বাচ্চারা আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। আমরা তাদের কি দিচ্ছি, কতটুকু দিচ্ছি? নষ্ট সময়ের সাথে দৌড়ে পেরে উঠতে না পারলেও দৌড়ানো থেকে মুক্তি তো পাচ্ছি না। কখনও মুখ থুবড়ে পড়ছি, কখনও বা পাল্লা দিয়ে চলেছি। অসম এই প্রতিযোগিতায় পড়ে আমরা হারাচ্ছি নিজস্ব স্বকীয়তা, হারাচ্ছি অস্তিত্ব, সন্তানরা হারাচ্ছে আমাদের। ওরা বড় হচ্ছে এক গুমোট-অন্ধকার পরিবেশে, যেখানে নি:শ্বাস ফেলার ন্যুনতম জায়গাও আমরা রাখিনি। ওদের দোষ কী?

ওরা দেখছে আমাদের মায়েদের লড়াই, কিন্তু বুঝছে কি? আমার মেয়ে যখন বলে, ‘জন্ম দিয়েছো, এটা দিতেই হবে আমাকে, নইলে শেষ করে দেবো জীবনকে’। ছেলের চাওয়া আকাশচুম্বি। না দিতে পারলেই কথা বন্ধ হয়ে যায়, দরজা বন্ধ করে একাকি জীবন বেছে নেয়। তখন আমাকে পঙ্গু করে দেয় ওদের এসব কথা। আমাদের অভিমান, আমাদের কষ্ট ওরা বোঝে না। আর ওরা বলে, ‘আমরা তো এমন জীবন চাইনি, তোমরা দিয়েছো, তোমরাই দায়ী’। মা যেহেতু সন্তানদের ফেলতে পারেন না, তাকেই সইতে হয় এসব যন্ত্রণা। বাবা সরে যান, তিনি হয়তো বা বেঁচেই যান। এই দোটানায় পড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মায়ের জীবনে প্রাণ-প্রাচুর্য্য থাকে না। একঘেয়ে জীবন বয়ে বেড়াই তখন আমরা এই মায়েরা।

কিন্তু আমাদের কাছের মানুষগুলো ছাড়া কেউ কি সেই খবর রাখে? কেউ কি পাশে এসে দাঁড়ায়? কেউ কি কাঁধে সহানুভূতির হাতটি রেখে বলে যে, পাশে আছি! কর্মক্ষেত্রগুলো তো রাক্ষুসে মনোভাব নিয়ে গিলে খেতে থাকে আমাদের। পাশে থাকার বদলে তারাই তখন বিরোধিতার ভূমিকায় নামে। পায়ের নিচে মাটি যখন সরতে থাকে, খড়কুটো, জঞ্জাল অনেকেই ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা করি। সেগুলো কেবলই জঞ্জাল হয়। জীবনটাকে আরও ছিন্নভিন্ন করে দেয় সেসব সামাজিক জঞ্জাল।

জয়শ্রীর ক্ষেত্রে যা হয়েছে, তা হয়তো কোনদিনই হতো না, যদি তার পরিবারটা এমন ছিন্নভিন্ন না হতো, যদি তার একটা সুন্দর কর্মক্ষেত্র হতো, যদি জীবনধারণের জন্য তার লড়াইটা না করতে হতো। তাহলে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে তার জীবনটা অনেকখানিই ‘স্মুথ’ হয়ে যেত। সেগুলোর কিছুই হয়নি। সব ছিল বিপরীতমুখী। ফলে ঘটনা যখন ঘটলো, তখন কোথায় তার পাশে দাঁড়াবে লোকজন, তা না করে তার নামে বরং কুৎসা রটানো হচ্ছে। সাংবাদিকতার নামে আবারও অপ-সাংবাদিকতায় নেমেছে তারই সহকর্মীরা। মেয়েদের ভিকটিম বানানো সহজ, সেই সহজ পথটাই বেছে নিয়েছে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম। ধিক সেইসব সাংবাদিকদের, ধিক এই সাংবাদিকতাকে।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.