বিপর্যস্ত জীবন- দায়ী কে বা কারা

Mirror 2প্রশান্ত ত্রিপুরা: সাঈদীর রায় কী হল, কেন হল, এর তাৎপর্য কী – এসব নিয়ে চিন্তা করার, অন্যদের ভাবনা জানার, তেমন সুযোগ ছিল না কাল। কারণ সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম নিজের একটা কাজে। কিন্তু দিনশেষে ফেসবুকে ভিন্ন একটা বিষয়ে কিছু পোস্ট দেখে বেদনা ও বিষাদে মন ছেয়ে গিয়েছিল খুব। ওগুলি ছিল উত্তরায় চিরশ্রী জামান ও মোহাম্মদ বিন আলীম নামের দু’জন ভাইবোনের সম্ভাব্য আত্নহত্যার খবরকে ঘিরে। এ ধরনের খবর সবসময়ই বেদনাদায়ক। তার উপর সেই দুই টিনএজারের মা হলেন জয়শ্রী জামান নামের এক সাংবাদিক, যিনি বিবাহবিচ্ছেদের পর একাই সন্তানদের লালনপালন করছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই খবরটা সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত অনেককে – বিশেষ করে নারীদের – খুব ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু দু’জন ফেসবুক বন্ধুর পোস্ট পড়ে বুঝলাম, এই ঘটনার তাৎপর্য অনেক গভীর, চলমান একটা সামাজিক সমস্যা হিসাবে যেমন, তেমনি প্রতীকীভাবেও, যেখানে জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে গোটা বাংলাদেশের অমীমাংসিত কিছু মৌলিক সংকটের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।

বিভিন্ন প্রকাশিত খবর ইঙ্গিত দেয়, বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ, এবং বাবার নূতন সংসার পাতার ঘটনা চিরশ্রী জামান ও মোহাম্মদ বিন আলীমকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক সংকটের পথে ঠেলে দিয়েছিল। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস -ফারহানা মিলির একটা ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা গেল – তাদের বাবা আলিমুল হকের ‘আত্মহত্যা’ শিরোনামের একটা লেখা আছে যা সেপ্টেম্বর ৬, ২০১০-এ বেরিয়েছিল bdnews24.com-এর মতামত বিশ্লেষণ পাতায়। লেখাটার উপর চোখ বুলাতে গিয়ে দেখলাম একজায়গায় বলা হয়েছে, ‘এখন তো আত্মহত্যাকারীদের বেশীরভাগই ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী।’ লেখকের যে দুই সন্তান আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের দু’জনের বয়সও এই সীমানার ভেতরেই, বিন আলীমের ১৫, আর চিরশ্রীর ১৯!

উল্লিখিত প্রেক্ষিতে আরেকটা ফেসবুক পোস্টে চোখ আটকে গিয়েছিল কাল। সুপ্রীতি ধরের একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন যার শুরুটা এরকম: “….সাঈদীর যাবজ্জীবন হোক বা ফাঁসি হোক, আজ আমার কিছুই যায় আসে না তাতে। আমি বার বার ফিরে আসি বাস্তবে, রাতভর অস্থির অস্থির করেছি। নিজেকে জয়শ্রী জামানের জায়গায় বসিয়ে দেখেছি বার বার।” এদিকে তাঁরই দেওয়া অন্য একটা পোস্ট থেকে জানলাম প্রাসঙ্গিক আরো কিছু পেছনের বিষয়। জুলাই ৩, ২০১৩ সালে ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে একজন নারী সাংবাদিকের খোলা চিঠি…’ শিরোনামে জয়শ্রী জামানের একটা লেখা বেরিয়েছিল একটা অনলাইন পত্রিকায়, যেখান থেকে জানা যায় তিনি এককালে এরশাদ-বিরোধী বিভিন্ন মিছিলের পুরোভাগে থাকতেন, এবং ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ, যেটির শিরোনাম ‘ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। একই বছর আবার তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে আলিমুল হকের সাথে, যাঁর সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের দু বছরের সিনিয়র আলীমুল হক নামে এক ভন্ডের সঙ্গে বিয়ে হলো, বিয়ের ১৪ বছরের মাথায় তার রাজাকার মনোবৃত্তি আর পরকীয়া প্রেমের ব্যাপারে আর আপোশ করতে না পারায় ছাড়তেই হলো তাকে।”

সংশ্লিষ্টদের কাউকে আমি চিনি না, এবং গতকালকের আগ পর্যন্ত কারো সম্পর্কেই কিছু জানতাম না। তাই তাঁদের কারো রাজনৈতিক বিশ্বাস বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু প্রাক্তন স্বামী সম্পর্কে জয়শ্রী জামানের অভিযোগ খেয়াল করুন।

রাজাকার মনোবৃত্তি আর পরকীয়া প্রেম!

একভাবে রাজনীতির আঙিনাতেও কি একই অভিযোগ উঠছে না, বা ওঠেনি কয়েক দশক ধরে? পিতামাতাদের (বিশেষত পিতাদের) স্বার্থপরতা সন্তানদের জীবনে কি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, চিরশ্রী জামান আর মোহাম্মদ বিন আলীম হয়ত সেটাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। আর রাষ্ট্রীয়ভাবেও কি নূতন প্রজন্ম হাহাকার করে ঘুরে বেড়াচ্ছে না – শাহবাগ থেকে মতিঝিল, সাজেক থেকে সুন্দরবন, রামু থেকে রৌমারি?

সকাল থেকে কেন জানি একটা গানের কলি মাথায় ঘুরছে, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি।’ দু’দিন আগে ঝরে যাওয়া দুটি ফুলের জন্য জয়শ্রী জামান ছাড়া আর কতজন যুদ্ধ করছিলেন জানি না। ব্যবসার লাইসেন্স, নির্বাচনের টিকেট বা পরপারের ছাড়পত্রের চিন্তা ছেড়ে শুধু ফুলের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য, বাংলাদেশে এখনো যুদ্ধ করছে, চল্লিশোর্ধ এমন কেউ আছেন কি?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.