রণক্লান্ত ইস্পাতের পাখীর জন্য…

Urmi ATN
ইশরাত জাহান ঊর্মি

ইশরাত জাহান ঊর্মি: আমি অনেক ভেবেছি। হাঁটতে, ঘুমাতে, খেতে খেতে অথবা স্নানঘরে-এমনও কি হয় ইস্পাতের পাখী? জয়শ্রী জামানকে আমি কখনও দেখিনি। কোন পরিচয় ছিল না। এ শহরের কোন কোণায় কে একা লড়াই করে, কে একা বাসের ভিড়ে গুমড়ানো কান্না চাপে -কজন তার খবর রাখে? কিন্তু কাল থেকে এই ঘটনাটা আমাকে আর ঘুমোতে দিচ্ছে না।

সকালে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে নিয়ে গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে আমারও ব্যস্ততা। সকালটা-দুপুরটা উড়ে যায়। এই শেষ অপরাহ্নে এসে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে জয়শ্রীর কি ঘুম ভেঙেছে? এই শহর, এই পৃথিবীর রাঙা আলো, খাওয়া-ঘুম-চাকরী-সামাজিক হুলস্থুল… এইসব জাগতিক কায়-কারবার তাঁর কেমন লাগছে? ফেসবুকে সুপ্রীতিদির স্ট্যাটাস পড়ি, সন্তানের দায়িত্ব কেন একা মায়ের হবে? কেন মাকেই অন্ন জোগাড়ের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতে হবে? কেন একাকি মা’কে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে কর্মস্থলগুলো বিমুখ থাকবে? কেন জন্মদাতা সব এড়িয়ে গিয়ে দিব্যি আরেকটা জীবন কাটাতে পারবে? কেন জয়শ্রীর সন্তানরা আত্মহত্যা করবে? কেন অন্ত:সত্ত্বা/মানসিক/শারীরিকভাবে অসুস্থ স্ত্রীকে ফেলে স্বামী চলে যেতে পারবে নতুন সুখের খোঁজে? শুধু তাই নয়, সেই স্বামী নামক পুরুষটা তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ত মানসিক পীড়ন দিয়েই যাবে। আমাদের কি করার কিছুই নেই? রাষ্ট্রের দায়িত্বই বা কি এক্ষেত্রে?

মন্টি আপার স্ট্যাটাস পড়ি, আমি আর সুপ্রীতিদি কাল জয়শ্রী আপাকে দেখে এসেছি। ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। তা না হলে কি বলে স্বান্তনা দিতাম আমি!! আমার যে স্বান্তনার কোন ভাষাই জানা নেই!উইমেন চ্যাপ্টারের একটা নিউজ থেকে জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা জয়শ্রীর চিঠির সারকথা।

গল্পটা কি খুব সাধারণ? জয়শ্রীর স্বামী নামক একজন ছিলেন।(তিনিও আবার সাংবাদিক, আর সাংবাদিকরা তালেবর হন, তা কে না জানেন!)দুই ছেলে-মেয়ের এই বাবা প্রেমে পড়েন এক সংবাদ পাঠিকার। (দুই ছেলে-মেয়ের বাবা হলেই তাঁর প্র্রেমে পড়ার অধিকার খর্ব হয় না, আমি এতে কোন দোষ দেবো না লোকটির। কিন্তু ভাবি, অপত্য স্নেহ বলে যে একটা বিষয় আছে, তা কি জানে এই লোক?)জয়শ্রী স্বামীর ভন্ডামী আর পরকীয়া সহ্য করতে না পেরে একসময় বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়। সংসার ভাঙতে মেয়েরা কত লক্ষবার ভাবে, কত অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণার রাত পাড়ি দিয়ে একটা বাচ্চার মা মেয়ে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়-তা ভুক্তভোগীই শুধু বুঝবে, আশীবিষে দংশিতরাই বুঝবে, আমি-আপনি বুঝবো না হয়তো। সাতবছর আগে সংসার ভাঙার পর জয়শ্রী ‘একলা থাকি মা’।

বাসস এ স্থায়ী না হওয়া একটা চাকরী তিনি করতেন।অর্থকষ্ট, মনো:কষ্ট, সামাজিক কষ্ট, ছেলে-মেয়ের বাবার আদর না পাওয়ার অভিঘাত সব মিলিয়ে জয়শ্রী কেমন ছিলেন আমরা জানি না। কারণ, পত্রিকায় পাতায় প্রকাশ, তার সংসারে যে কোন অশান্তি ছিল এমন কথা জয়শ্রী কর্মক্ষেত্রে বা অন্যকোথাও বলেননি। পত্রিকান্তরেই জানতে পারি, অন্য কোন আত্নীয়র সাথেও খুব একটা যোগাযোগ ছিল না দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে যুদ্ধ করা জয়শ্রীর। একটা সময় আর্থিক সাচ্ছন্দ্যে বড় হওয়া ছেলে-মেয়ে দুটি হঠাতই পড়ে যায় অভাবে। তাদের ইংরেজি স্কুলে পড়ার খরচ, বার্গার-পিৎজার খরচ, অন্যান্য ঠাঁটবাঁটের খরচ জোগাতে হতো জয়শ্রীকেই। অফিস শেষে রাতে বাজার করে বাড়ি ফিরতেন জয়শ্রী-ইস্পাতের পাখী। আর তাঁর এক্স স্বামী তখন দ্বিতীয় স্ত্রী আর সেইঘরের সন্তান নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেসব বেড়ানোর ছবি আপ করছেন ফেসবুকে। বর্তমানে থাকেন চীনে, চাকরিসূত্রে। নিজের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, আই লাভ কিডস।

আর উত্তরার বদ্ধ ঘরে সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দুটো কিশোর-কিশোরীকে কেউ বলছে না, আলীম-চিরশ্রী…উপেক্ষা করো, বুক বেঁধে দাঁড়াও, জগতের আনন্দযজ্ঞ আবারও ডাকবে তোমাদের, আঁধার কেটে যাবে…সামাজিক অন্তর্জালে ঢাকা এই শহরে দুটি বাচ্চা কত একা, কতটা সমাজের বাইরে আমাদের সময় হয় না তা জানার। জয়শ্রী যখন উদয়াস্ত খাটছেন, তখনই হয়তো সূতো আলগা হচ্ছিল সন্তানদের কাছ থেকে-তিনি হয়তো বুঝতে পেরেও কিছুই করতে পারছিলেন না। স্থায়ী না হওয়া চাকরীতে কি আর প্রণোদনা থাকে? ছুটির দিনে মায়ে-ঝিয়ে মিলে ফ্যান্টাসি কিংডম যাওয়া অথবা লম্বা ভ্যাকেশন দূরে কোথাও কাটিয়ে আসার মতো পয়সা কি ওদের ছিল? মনে হয় ছিল না।তবু তো লড়াই করছিলেন জয়শ্রী। হয়তো চাকরী স্থায়ী করার জন্য সাংবাদিক নেতা ধরতে পারেননি, ছেলে-মেয়েদের ভোরণ-পোষনের জন্য এক্স স্বামীর কাছে হাত পাততে তাঁর রুচি হয়নি, হয়তো, হয়তো…অনেককিছুই ‘হয়তো’ হয়েছিল, হয়তো হয়নি, কিন্তু লড়াই যে করছিলেন তিনি এটা তো জ্বলজ্বলে সত্য। চিরশ্রী আর আলীম মায়ের সেই লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হলো না।

ওদের আত্মহত্যায় অপমৃত্যুর মামলা হোক আর যাই হোক, কেউ কি তাদের প্র্রেমিক বাবাকে ডেকে জানতে চাইবে, তার দায় কি এই মৃত্যুতে? তার দায় বা কারই বা দায়? কার এত ঠেকা পড়েছে এইসব মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব নিতে। আমি শুধু ভাবছি, ঘুম ভাঙার পর জয়শ্রী জামানকে একটু স্বস্তি আর জীবনে ফেরার জন্য আমরা কি সাহায্য করতে পারি না? ইস্পাতের পাখীটিকে একটু শক্ত দাঁড়ের উপর দাঁড় করাতে পারি না? সন্তান হারানোর যন্ত্রণাকে একটু হলেও সইয়ে আবারও কি জীবনের গানে সহশিল্পী হতে পারি না?

মন্টি আপা লিখেছেন, ভাগ্যিস উনি ঘুমিয়ে ছিলেন না হলে কি সান্ত্বনা দিতাম তাঁকে? এর কোন সান্ত্বনা হয়? কিন্তু উনি তো জাগবেনই একসময়। তখন কি হবে?

পুনশ্চ: লেখাটা আমি শেষ করতে পারলাম না। আমি সত্যিই জানি না, এরপরে কি হবে!কি সমাধান!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.