শিশু সন্তান জানুক, কোন প্রক্রিয়ায় সে এই পৃথিবীতে এসেছে

0
Mitu

শামীমা মিতু

শামীমা মিতু: ফেসবুকজুড়ে সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত ‘শাড়ীর উপর ব্লাউজ কাহিনি’কে কেন্দ্র করে গাজী টিভির শ্রদ্ধেয় অঞ্জন রায় দাদা একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। লেখাটা এমন ‘লাক্সফটো সুন্দরীরা শাড়ীর ওপরে ব্লাউজ পরে বেড়াল হাঁটা হাঁটছেন। দশ বছরের মেয়েটি বাবাকে প্রশ্ন করছে, বাবা ডেট করা কি? পেপসি বলে দিয়েছে- পিও লাইট জিও লাইট। সানি লিওন লিপিষ্টিকে আধুনিকতা। আমরা হাঁটছি নষ্ট সময়ের হাত ধরে আরো বেশি নষ্টামোর দিকে। এগুলো কোনটাই কর্পোরেট চোখে অপরাধ নয়- মার্কেটিং। তাহলে ইতিহাস নিয়ে একটু নষ্টামো করলে দোষটা কোথায়? সময় যখন নষ্ট হয়ে যায়- তখন ইতিহাস ভূগোল অথবা সন্তানের সতীত্ব কোনটাই রক্ষা পায় না’।

এই লেখার একটা বাক্যে আটকে গেলাম এবং প্রচণ্ড হতাশ হলাম।

বাক্যটা ‘দশ বছরের মেয়েটি বাবাকে প্রশ্ন করছে ‘বাবা ডেট করা কি?’ এটা কি কোনো নষ্ট প্রশ্ন? এই প্রশ্ন করার কারণে কি কেউ বলতে পারে সমাজ নষ্টামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? দাদার স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছিলাম- ‘নষ্ট সময়ের উল্লেখ করতে যেয়ে আপনি যে বললেন ১০ বছরের মেয়ে বাবার কাছে জানতে চেয়েছে ডেট করা কি, এটাকে নষ্টামো বলা ভুল। তাকে জানানো উচিত ডেট কি জিনিস। কেন বাবা-মা একে অপরকে চুমু খায়, কেন সিনেমায় প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে আদর করে। এসব বিষয়ে বাবা-মা জানালেই সবচেয়ে ভালো, যাতে করে ভুল শিখে অস্বাভাবিক জীবনের পথে পা না দেয়।

ডক্টর শ্যামল চক্রবর্তীর একটা লেখায় বর্ণনা পাই, এক কিশোরের রাতের ভয়ংকর স্বপ্নের উৎস খুব ছোটবেলায় মা-বাবাকে যৌন ক্রীড়ারত অবস্থায় দেখে ফেলা। এরকম শৈশব স্মৃতি কোনো বাচ্চার মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। যা থেকে ছেলেবেলায় বয়ো:সন্ধিতে বা যৌবনে অকারণে নানা পাপবোধের জন্ম নেয়, দেখা দেয় অকারণ উদ্বেগ বা দুঃশ্চিন্তা। মনস্তত্ত্বে বলে এরকম শৈশব স্মৃতি বাচ্চাদের মনস্তত্ত্বে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এক কিশোর টেলিভিশনে শয্যাদৃশ্য দেখে ফেলার পর মাঝে মাঝেই আতংকের স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে উঠতো।

আমার ছোট বোনের আড়াই বছরের মেয়ে ডুম্পা (আদর করে আমি ডাকি) আমার সাথেই থাকে। হঠাৎ একদিন সে আমাকে বলে বসলো ‘আই দাবিউ’ আমরা বেশ অবাক হলাম এবং কিছুক্ষণ হাসাহাসি করলাম। এতটুকু মেয়ে কিভাবে শিখলো এই বাক্য! এরপর তাঁর নানু মানে আমার মা তাঁকে বোঝাতে লাগলো ‘এইসব পচা কথা বলতে নেই নানো’।

আমি আমার মাকে থামালাম। বললাম, এটা কোনো পচা কথা না, এটা একটা আদুরে বাক্য। ডুম্পাকে বুকে নিয়ে আমিও তাঁকে বললাম ‘আই দাবিউ টু’। এখন আমি যদি কখনো গাল ফুলিয়ে থাকি, ওর উপর কপট রাগ দেখাই, তখন সে আমাকে বলে, আই দাবিউ।

আমাদের দেশের বাচ্চারা অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে শোয়। ফলে তারা কিছু না কিছু দেখে, বোঝে বা ধরে নেয়। টিভিতে দেখে। সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলে বাবা-মা এড়িয়ে যান, অথবা ধমক দেন, ওরা ভাবে এটা খারাপ কাজ। বাবা-মায়ের ধীরে ধীরে চেষ্টা করা দরকার বাচ্চাদের বোঝানোর যে, ওটা স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ। যদিও এটা বড়দের প্রাইভেট ব্যাপার, কিন্তু বিশেষ একটা কিছু নয়। রোজকার অন্যান্য কাজের মতোই স্বাভাবিক। এটা একটা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, এভাবেই মানুষের জন্ম হয়। বাচ্চা কিছু দেখে ফেলেছে বলে বাবা-মা যদি আপসেট হন, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের একদম মিথ্যে কথা বলা চলবে না। বাবা-মা মিথ্যে বললে ওরা ঠিক মনে রাখে। বাচ্চারা প্রশ্ন করলে সোজা সত্যি বলা উচিত। বলা যেতে পারে, যখন বড় হবে, তখন তোমরাও ওরকম করে আদর করবে। বড়দের আদর একরকম আর ছোটদের আদর একরকম’।

রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছিলেন, ইউরোপের আর্ট গ্যালারিতে যেসব ছবি টাঙ্গানো থাকে, তা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সামনে টানানো যায় না। কিন্তু যা স্বাভাবিক তা দেখলে বাচ্চাদের কোনো খারাপ হয় না। বাচ্চাদের যা বলা যায় না, শিল্পের মাধ্যমে তা বলা যেতে পারে। ছোট থেকে ভালো শিল্পীর আঁকা নারী-পুরুষের ছবি দেখলে ওরা সেটাকেই স্বাভাবিক বলে জানবে’।

মল্লিকা সেনগুপ্ত তাঁর পাচ বছরের ছেলে রোরোর সাথের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে- টিভিতে বসে ‘বেসিক ইনস্টিংক্ট’ সিনেমা দেখছিলাম। হঠাৎ রোরো ঘুম থেকে উঠে এসে এ ঘরে বসলো। আমরা অস্বস্তিতে, রোরোর চোখ বিস্ফোরিত। ওরা এরকম করে আদর করছে কেন? ওরা জামা পরেনি কেন? আমি বললাম, বড়রা যখন দুজনে একা থাকে, তখন মাঝে মাঝে ওরকম করে আদর করে দুজন দুজনকে। মানুষ যেমন স্নানের সময় জামা পরে না, তখন তো অন্য কেউ তাদের দেখছে না। আদর করার সময় বড়রা অনেক সময় জামা খুলে ফেলে। মৌমাছি, পাখি, বেড়াল, কুকুর, বাঘ, হরিণ সিংহ কেউ তো জামা পরে না। শুধু মানুষ পরে। কারণ মানুষেরই শুধু জামা বানানোর বুদ্ধি আছে। মানুষ জামা পরতে শুরু করেছে শীত, রোদ, বৃষ্টি থেকে শরীর বাঁচানোর জন্য। যেরকম মানুষ বাড়ি বানিয়েছে, খাবার বানিয়েছে, সেরকম জামা কাপড়ও বানিয়েছে। কিন্তু জামা কাপড় ছাড়া চেহারাটা মানুষের আসল চেহারা। তাই মাঝে মাঝে মানুষ জামা খুলে ফেলে, যখন বাইরের অন্য লোক দেখছে না তখন।

রোরোর প্রশ্ন-বড়রা বাচ্চাদের ওরকম আদর করে না কেন?
বড়রা বাচ্চাদের যেরকম করে আদর করে সেটা তো সব থেকে ভালো আদর। গুল্লিসোনাকে কোলে নিয়ে হাম্পি খেয়ে চটকাই-মটকাই আদর। ছোটদের কি কেউ বড়দের মতো আদর করে? ছোটদের আদর আলাদা। বাচ্চা মায়ের পেটের মধ্যে হয়। আদর করে বাবা-মায়ের পেটে x বা y পাঠাতে পারে। xy হলে ছেলে আর xx হলে মেয়ে।
বাবা যদি মাকে অনেক আদর করে তাহলে তাহলে কি অনেক বাচ্চা হবে?
হ্যাঁ হবে, যদি বাবা-মা বাচ্চাকে আনতে চান। বাবা-মা যদি না চান, আদর করলেও বাচ্চা হবে না।
তাও কি বাবা-মা আদর করবে?
হ্যাঁ করতেই পারে, আদর করতে এমনিও তো ভালো লাগে। বাবা-মা বাচ্চাকে ভালোবাসে, তাই কতবার বাচ্চাকে আদর করে, দেখো না। সেরকম বাবাও তো মাকে অনেক ভালোবাসে, মা-ও বাবাকে অনেক ভালোবাসে, তা হলে ওরা দুজনকে আদর করবে না?

আমি বড় হলে কি আমিও কাউকে ওরকম আদর করবো?
হ্যাঁ তুমিও করবে, সবাই করে।
কিন্তু আমি আদর করবো কাকে?
যাকে তুমি ভালোবাসবে। বড় হলেই দেখবে তুমি কাউকে ভালোবাসবে, আদর করবে। তারপর তোমারও বাচ্চা হবে, তাকেও আদর করবে। আস্তে আস্তে সেও বড় হবে।

মূলত প্রাথমিক স্কুলে পড়া শিশুদের জন্য প্রয়োজন তাদের বয়স অনুযায়ী তাদের শরীর সম্পর্কে সঠিক তথ্য, তাদের বয়ো:সন্ধি, সেক্স জীবন, প্রজনন ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া। এটা কোন বড় ধরনের আলোচনার দাবি রাখে না, শুধুমাত্র ছোট ছোট আলোচনাগুলোই বার বার পুনরাবৃত্তি করতে হয় শিশুদের ক্ষেত্রে। কারণ বয়ো:সন্ধি সম্পর্কে আগে থেকেই কিছু জানা না থাকলে সেক্ষেত্রে শিশুরা আতংকিত হয়ে পড়তে পারে। সেক্সুয়াল দায়িত্বশীলতা এবং সম্পর্ক এ দুটোও আবশ্যিক জ্ঞান।

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.