‘আজ সকালের আমন্ত্রণে’র মৈত্রেয়ীর সাথে কিছুক্ষণ

0

with Maitree 1সুপ্রীতি ধর: আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা সকালে ঘুম ঘুম চোখেই টিভি পর্দায় ভারতীয় বাংলা চ্যানেল ‘তারা মিউজিক’ অন করে তাদের দিন শুরু করেন। প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে সকালটা গানে গানে ভরিয়ে তোলা। তারপর দিনময় সেই গানের অনুরণন বয়ে চলা। মন ভরে যায় একেকজন শিল্পীর চমৎকার গায়কীতে। সেইসঙ্গে উপস্থাপনাও যে একটা অনেক বড় শিল্প, নান্দনিকতাময়, তারা মিউজিক সেটাই প্রমাণ করে ছেড়েছে।

ভাবতে পারুন, সকালে ঘরের মধ্যে টিভি চলছে, টিভিতে গান বা কবিতা চলছে, আর চলছে কিছু কথাবার্তা। সেই কথাবার্তাগুলোকে একেবারে ঘরোয়া করে তোলার কৃতিত্ব যে কজন হাতেগোণা মানুষের, তারই একজন মৈত্রেয়ী। রিনি, মল্লিকাও আছেন।  ঠিক এই মূহূর্তে তারা মিউজিকের সাথে হয়তো তারা নেই, কিন্তু আছেন অন্য চ্যানেলগুলোতে, অভিনয়ের মধ্যে। কিন্তু তারা মিউজিককে সকলেই ধারণ করেন।

অভিনয় করলেও তাদেরকে মানুষ বেশি আপন করে নিয়েছে এই উপস্থাপনার মধ্য দিয়েই। আটপৌরে শাড়ি পরা, ভেজা চুল পিঠের ওপর এলানো, হাতে চা/কফির পেয়ালা নিয়ে অতিথির সাথে একেবারে ঘরের মতোন আলোচনা কেবল তাদেরই সাজে। মনে হয় না তারা কোনো দূর প্রান্ত থেকে ইথারে ভেসে আসা কেউ। মনে হয়, এতো আমাদেরই মেয়ে। কথা বললেই বলা যায়, ছুঁতে চাইলে ছোঁয়া যায়। মুখের ওপর বাড়তি মেকাপের প্রলেপ দিয়ে নিজেকে ভিনগ্রহের মানুষ সাজায় না এদের কেউই। তাইতো কাছের হয়ে উঠেন সহজেই। আপন করে নেয়ার ক্ষমতা যেন তাদের মজ্জাগত।

সেই মৈত্রেয়ী এসেছিলেন ঢাকায়। তাঁর সাথে শমীক পাল, দেখতে অবিকল উত্তম কুমার, আর কণ্ঠে হেমন্ত ঝরে পড়ে। বিনয়ের অবতার দুজনই।

ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তারা। অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে দেশে ফেরার দিন কিছুক্ষণের জন্য তারা দুজনসহ গ্রুপটার সাথে আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয় আমার।

সকাল ১১টায় ধানমন্ডি ক্লাবে যাওয়ার কথা, একটু দেরি হয়ে গেছিল বলে সেকী আফসোস আমার। প্রিয় মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখার লোভ আমার অনেকদিনের। কিন্তু না, দেরি আমার হয়নি। অতিথিরা ঢাকার জ্যামেরও অতিথি হয়ে পড়েছিলেন। তাই তাদের পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। আমাদের সবার নজর ঘন ঘন দরজার দিকেই ছিল।

অবশেষে খুবই ক্যাজুয়াল পোশাকে একটি মেয়ে এসে ঢোকে, সাথে লম্বা-চওড়া সুদর্শন উত্তম কুমার। কথার ফাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করি, আপনাকে কেউ উত্তম কুমার বলে না? সেকী লাজুক হাসি তার। বলে না আবার! সঙ্গে ঢোকেন মৈত্রেয়ী। একে একে সবাই আমরা তাকে জড়িয়ে ধরি, যেন ঘরের মেয়েটি ঘরে এসেছে। অনেকদিনের চেনা, এমন সুরে কথা বলি সবাই সবার সাথে। কোনো ভণিতা নেই, আরোপিত ন্যাকামি নেই। একফাঁকে বেশকিছু কথা হয় মৈত্রেয়ীর সাথে। যা তার পেশার সাথে যায়, যা আমাদের মনের খোরাক জোগায়।

তারায় ফিরবেন না আর?

মৈত্রেয়ী: হয়তো ফিরবো, তবে এখনই না। চ্যানেলটির সাথে একটা অভিমান কাজ করেছে, তাই এই সরে আসা।

এখন কি তাহলে শুধু অভিনয় নিয়েই থাকবেন?

মৈত্রেয়ী:হমম। অভিনয়ই করছি, এটা তো আগেও করতাম। এটাই তো মেইন কাজ আমার।

কিন্তু আমরা যে সকালে উঠে আপনার মুখটা দেখতে চাই!

মৈত্রেয়ী: (খানিকটা হেসে) আমিও মিস করি। তবে আমার মনে হয়, যে যে পেশাতেই থাকুন না কেন, তাদের কিছুদিন গ্যাপ দেয়া উচিত। এটা শুধু নিজের জন্যই না, পেশার জন্যও। এতে করে কাজটা সম্পর্কে আরও নৈকট্য অনুভব করা যায়। ছয় মাসের অনুপস্থিতি কোনকিছু শেখায় না। সেজন্য বছরখানেক দরকার। সময় নিলে নিজের কাজের টুকটাক ভুলত্রুটিগুলোও শোধরানো সম্ভব হয়। তাছাড়া নিজেকে আরও যোগ্য করেও গড়ে তোলা যায়।

উপস্থাপনায় যোগ্যতা অর্জনের জন্য আপনি কি কি করেন?

মৈত্রেয়ী: নিয়মিত অন্যদের উপস্থাপনা দেখি, বিশেষ করে বাইরের বিশ্বের। এবং সেখান থেকে ভাল লাগার জায়গাটুকু রপ্ত করে সেখানে বাঙালীয়ানা দেয়ার চেষ্টা করি। আমাদের অডিয়েন্স যেহেতু বাঙালী, কাজেই শতভাগ বাঙালীয়ানা বজায় রাখার চেষ্টা করি।

উপস্থাপনাটাকে আপনারা কয়েকজন রীতিমতো শিল্পে রূপ দিয়েছেন। এটা কি করে সম্ভব হলো?

মৈত্রেয়ী: আসলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলি, আর যার সাথে কথা বলছি, তাকে ভালভাবে জেনে নিয়েই কথা বলি। এতে করে অতিথি এবং উপস্থাপকের মাঝে দূরত্ব বা ব্যবধানটা কমে যায়।

আপনারা তো সাজেন কম। যে কারণে মনে হয়, ঘরের বোনটা বুঝি স্নান সেরে এসে কথা বলছে।

মৈত্রেয়ী: একদম ঠিক বলেছেন। মাঝে মাঝে তো চুল আঁচড়াতেও ভুলে যাই। চুল দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকে। আমার মনে হয়, এই ভাবটাই আমাদের সাবলীলতা এনে দেয়। সাতসকালে উঠে কড়া মেকআপ দিয়ে কেউ গান শুনতে বসে না নিশ্চয়ই।

আপনারা তো এই প্রথম এলেন বাংলাদেশে। কেমন লাগছে?

মৈত্রেয়ী: আসলে বলা যায় এটা একটা ঝটিকা সফর। গত চার বছর ধরে আসার কথা হচ্ছিল। হয়তো এই সময় আসবো, এমনই লেখা ছিল কোথাও। আবার যখন লেখা হয়ে আছে, তখন আবার আসা হবে। ঢাকার রাস্তায় জ্যাম ছাড়া তেমন কিছু দেখা হয়নি। তবে বিমানটা যখন ল্যান্ড করছিল, তখন বাংলাদেশকে অনেক ভাল লাগছিল। এতো জল চারিদিকে। কেমন যেন ভেজা ভেজা। অথচ ওই বাংলাকে রুক্ষ, শুষ্ক মনে হচ্ছিল।

আরেকটা কথা, এই ডিজিটাল যুগে সবার সাথেই কেমন যেন একটা আত্মিক সম্পর্ক হয়েই আছে আগে থেকে। আজ সকালের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে যারা এখান থেকে ফোন করেন, তাদের কোনদিন চোখে দেখিনি। কিন্তু তাদেরকে কিভাবে যেন চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছিল, এরাই তো।

এই যে এখন সবার সাথে দেখা হলো, কেমন লাগছে?

মৈত্রেয়ী: কই, নতুন করে তো মনে হচ্ছে না, কাউকে দেখছি। ফেসবুকের কল্যাণে সবাইকেই তো পুরনো পরিচিত মনে হচ্ছে।

অনুরোধে পড়ে শমীক পাল দুটো গানের কয়েক লাইন গেয়ে শোনান এক ফাঁকে। এর উদাহরণ টেনে মৈত্রেয়ী বলেন, শিল্পীদের সুবিধে হলো, তারা দুলাইন গেয়ে দিলেই শেষ। কিন্তু উপস্থাপক কি করবে? সে যদি বেশি কথা বলবে, তাহলে লোকে বলবে, বাচাল। অন্যদিকে তাকে আনাই হয় কথা বলার জন্য। কথায় কথায় জানালেন, এখানে আসার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটা দেখে এসেছেন। শাহবাগ দেখেছেন। বললেন, শাহবাগ মুভমেন্টের সময় তাদের সবার নজর ছিল এদিকে। সকালে উঠেই খবরের কাগজে দেখতে চাইতেন, কি হচ্ছে এখানে। সেই রেশ তাদের অনুষ্ঠানেও ছিল। আমার ভাল লাগে এ কথায়।

আড্ডা এগিয়ে চলে, এর মধ্যে প্রায় সব কথাই ঘরোয়া আলাপ। জিজ্ঞাসা করা হয়, বাংলাদেশে যেমন ভারতীয় চ্যানেল দেখি আমরা, তেমনি তারা তো আমাদের চ্যানেল দেখতে পায় না। এ নিয়ে তাদের কোন ক্ষোভ আছে কিনা!

মৈত্রেয়ী স্বীকার করেন ক্ষোভের কথা, কিন্তু যেহেতু এই সিদ্ধান্ত সরকারের বিষয়, তাই এ নিয়ে আর কথা বাড়ান না। তবে তিনি মনে করেন, তার ছোটবেলায় তিনি ‘ঢাকায় থাকি’ আর ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামের দুটি সিরিয়াল দেখতেন বাড়ির সবার সাথে। তিনি বলেন, কলকাতায় তখনও মেগা সিরিয়াল হতো না, ঢাকার এই দুটি সিরিয়াল তখন সেখানে লোকে দেখতো খুব। এই নাটকগুলোর পাত্রপাত্রীদের নামও তার জানা আছে। শমীক পাল এসময় নাইট রাইডার দেখার কথা স্মরণ করেন। এখন এসবই মিস করেন, এমন আক্ষেপও শোনা যায় তাদের কণ্ঠে।

খুবই ত্বরিৎ সফর হলেও শিগগিরই হাতে সময় নিয়ে এখানে আবার আসবেন, ঢাকা ছেড়ে গ্রামের পথে হাঁটবেন, এমন স্বপ্নের কথা জানিয়ে গেছেন দুজনই। আমরাও তাদের নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলাম। আড্ডা শেষে খাওয়া, আর খাওয়া শেষে আবার পা বাড়ানো গন্তব্যে। তাদের ফিরতে হবে হোটেলে, সেখান থেকে আরও একট জায়গা হয়ে আজ রাতেই ফিরবেন কলকাতায়। প্লেনে মাত্র আধ ঘন্টার রাস্তা। কিন্তু এতো ভালবাসার বন্ধনও কেন বার বার কাছে নিয়ে আসে না প্রিয় মানুষগুলোকে, এই আক্ষেপ নিয়ে আমরাও পা বাড়াই ঘরের পথে। সাথে থাকে কিছু সুখস্মৃতি, প্রিয় শিল্পীকে স্পর্শের সুখ……..এই স্পর্শ আত্মীয়তার, পরম মমতার।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.