বিয়ের পর ভালবাসা কি কর্পূর হয়ে যায়?

Aparna 2সেবিকা দেবনাথ: আচ্ছা বিয়ের পর কি ‘ভালবাসা’ কর্পূরের মতো উবে যায়? নাকি ভালবাসার মানুষ কাছে আসলে দূরত্ব বাড়ে? যদি তা না-ই হয় তবে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে নানা কাহিনী করে ভালবেসে বিয়ে করার পরও কেন অনেকের সংসার টেকে না? কেন সম্পর্কে চিড় ধরে? কেন ভালবাসার আসনে গেড়ে বসে অবিশ্বাস? যে মানুষটাকে একসময় সব ভালবাসা নিংড়ে উজার করে দেয়া হয়েছিল, কেন তার প্রতি মন বিষেয়ে ওঠে? ছোটবেলা থেকে প্রায়ই একটা কথা শুনতাম, ‘প্রেমের বিয়ে নাকি টেকে না’, ‘সুখী হওয়া যায় না’। সত্যি-ই কি তাই?

এই কথার প্রেক্ষিতে প্রেমিক যুগলের ভাষ্য, ‘ওসব কিছু না, ভয় দেখানো আর কি’। আমি ভাবি, প্রেম করে বিয়ে করাটা কি পাপ জাতীয় কিছু নাকি যে ভয় দেখাবে? প্রতিনিয়তই তো দেখছি সেলিব্রিটিরা ঘটা করে প্রেম-ভালবেসে ঘোষণা দিয়ে বিয়ে করছেন। আর সংসার ভাঙ্গার ঘোষণাও দিচ্ছেন ঘটা করে। ওদের না হয় ইন্টালেকচুয়েল সমস্যা। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ-অতি সাধারণ, তাদের সমস্যাটা কোথায়? নিজের খুব কাছের কিছু মানুষের ঘটনাই বলি।

ঘটনা ১:

জয়ন্তী গোস্বামী। গ্রাম সম্পর্কে তিনি আমার দিদা হন। বয়সের ব্যবধান কম হওয়ায় তাকে দিদি বলেই ডাকি। নানা ঝড়-ঝাপ্টা পেরিয়ে একই গ্রামের সুজিতদাকে (সুজিত বিশ্বাস) বিয়ে করেছিলেন। তাদের প্রেম সিনেমাকেও হার মানিয়েছিল। বংশের কৌলিন্য ও পরিবারের আভিজাত্যে দোহাই দিয়ে জয়ন্তীর পরিবার এই সম্পর্কের ঘোর বিরুদ্ধে ছিল। সুজিত দা’র পরিবারও বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। এই সম্পর্ক রাখার দায়ে জয়ন্তীদিকে যে কত লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে, তা যারা দেখেছে তারাই বলতে পারবে।

এমন একটা দিন বোধ হয় ছিল না যেদিন জয়ন্তীদি মার খায়নি। এই মারামারি নিয়ে সুজিত দা’র মনে যে কত কষ্ট ছিল। জয়ন্তীদিকে রাস্তায় মারার জন্য দিদির বড়দা’র গায়েও হাত তুলেছিল সুজিতদা। এ নিয়ে কত কাহিনী। তাদের প্রেম দেখে সবাই বলতো ‘লাইলী-মজনুর জুটি’। না জানিয়ে দিদির বড় বোনের শ্বশুর বাড়িতে তার বিয়ে ঠিক করা হয়। খবরটা জানতে পেরে একদিন রাতে দু’জনে মিলে উধাও হয়ে গেল। মাস খানেক পরে খবর এলো ওরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে বিয়ে করেছে। সম্পর্কটা মেনে নিতে গ্রামের সবাই দুই পরিবারকে বোঝালো। অনেকটা চাপের মুখেই সম্পর্কটা মেনে নিল দুই পরিবার। প্রায় বছর খানেক পর জয়ন্তীদি আর সুজিতদা বাড়ি ফিরলো। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কটা স্বাভাবিক না হলেও আগের মতো সাপে-নেউলে রইলো না। তাদের ভালবাসা দেখলে মনে হতো শুধু এই জন্মে নয়, জন্ম জন্মান্তরের জন্য তারা একে অপরকে বুকিং দিয়ে রেখেছেন।

সময় গড়ালো, দিদি ছেলের মা হলো। দিদি’র এক আত্মীয়ের বিয়েতে বেড়াতে গিয়ে তিন বছরের ছেলেটা জলে ডুবে মারা গেল। সুজিতদা আর তার পরিবারের সবাই ওই দুর্ঘটনার দায়ভার চাপালো দিদির ঘাড়ে। বাড়তে থাকলো দূরত্ব। ওই ঘটনায় মানসিকভাবে অনেকটা ভারসাম্য হারালো জয়ন্তীদি। সেইসঙ্গে বোধ হয় সুজিত দা’র ভালবাসাটাও হারাতে শুরু করেছিল। হিন্দু ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন তেমন একটা নেই। তাই ওদের সম্পর্কটা লিখিতভাবে ছাড়াছাড়ির স্বীকৃতি পেল না। কিন্তু দিদিকে এখন থাকতে হয় তার বাবার বাড়িতে। কয়েকদিন আগে বাড়ি গিয়ে শুনলাম সুজিতদা’র বিয়ের কথাবার্তা চলছে।

ঘটনা ২:

ছন্দা চৌধুরী। ইডেন কলেজে পড়ার সময় ছন্দার সাথে আমার পরিচয়। ওর আর আমার মামার বাড়ি একই এলাকায়। তাই ভাবটা ছিল একটু বেশিই। প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ঢাকা কলেজের ছাত্র জুয়েলের সঙ্গে পরিচয় হয় ছন্দার। সেখান থেকে শুরু হয় দু’জনের মধ্যে ভাব-ভালবাসা। দু’জন দুই ধর্মের। তাতে কি? প্রেম কি জাত-ফাত মানে নাকি? ভালবাসার ভেলায় চড়ে ওরা বেশ কিছু বছর কাটিয়ে দিলো। ওদের দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যেতো।

ছন্দার সাথে দেখা হলেই ও বলতো, বাসায় বিয়ের কথা বার্তা চলছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। কথাটা শুনলে আমার নিজেরও ভীষণ অসহায় লাগতো। একদিন ছন্দা আমায় ফোন করলো। ফিসফিস করে বললো, ‘সেবি, আমার খুব বিপদ। বাসায় আমাদের সম্পর্কটা জানাজানি হয়ে গেছে। আমার মোবাইল মা নিয়ে নিছে। বাসা থেকে বেরুনো বন্ধ। তুই বাসায় ফোন করে বলবি আমাদের টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। ঠিক আছে?’

আমি কিছু বলার আগেই ছন্দা ফোন কেটে দিল। কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে কেমন যেন অস্থির লাগছিল। ছন্দার কথামতো কাজ করতে পারলাম না। কারণ আমার মনেও ভয় ছিল। বেশ কয়েক দিন পর নিউমার্কেটে ছন্দার সাথে দেখা। জুয়েলের হাত ধরে আছে। আমিতো দেখে অবাক। ছন্দা জানালো, বাড়ি থেকে পালিয়ে ওরা বিয়ে করেছে। জুয়েলের বড় আপা ওদের এই ক্ষেত্রে বেশ সাহায্য করেছে। বড় আপার কলাবাগানের বাসাতেই ওরা থাকছে। জুয়েলের একটা চাকরি হয়ে গেলে ওরা আলাদা বাসা নেবে। ওদের দেখে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দম্পতি ওরা। ওদের বাসায় যাবার জন্য আমাকে খুব করে বললো। সুযোগ হলে যাবো বলে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। কারণ আমার হোস্টেলের গেইট বন্ধ হয়ে যাবে।

এরপর ছন্দার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, ছন্দা আর জুয়েলের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কারণটা কি তা কেউ বলতে পারলো না। এটা শোনার পর আমি শুধু ভাবছি, যার ভালবাসা পাবার জন্য ছন্দা বাবা-মা, ভাই-বোন, পরিবারের সবাইকে অগ্রাহ্য করেছিল, কি এমন হলো সেই মানুষটার সঙ্গেই সে থাকতে পারলো না?

ঘটনা-৩ :

মালা আন্টি আর মুকুল মামা। আমার ছোট মামার জিগরি দোস্ত। সালটা ১৯৯২। বাবার চাকরি সূত্রে তখন আমরা থাকতাম ঘোড়াশাল সার কারখানা কলোনীতে। ছোট মামা আমাদের ওখানে বেশ কিছুদিন ছিল। একদিন খবর এলো মুকুল মামা হাসপাতালে। অবস্থা খুব জটিল। খবর পেয়ে ছোট মামা কাঁদতে কাঁদতে ঢাকায় রওনা দিলো। পরে জানতে পেরেছিলাম, মুকুল মামা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। মালা আন্টিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল মুকুল মামা। এ কথা শুনে মালা আন্টি নাকি জানিয়েছিল যে, মুকুল মামাকে তিনি বন্ধুই ভাবেন। এর বেশি কিছু না। কথাটা হজম করতে পারেনি মুকুল মামা। তাই প্রাণ ত্যাগের সিদ্ধান্ত।

কথাটা জানার পর বন্ধুর ‘প্রেম সফল’ করতে মাঠে নামলো ছোট মামার বন্ধুরা। মালা আন্টিকে রাজি করাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে তাদের। সৎ শ্বাশুড়ি-ননদের সংসারে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি ছিল না মালা আন্টির পরিবার। এই বরফও গলাতে সফল হলো ছোট মামার গ্যাং। মালা আন্টি আর মুকুল মামার বিয়ে হলো।

বিয়ের বছর দুই পর কাজের সন্ধানে মুকুল মামা বিদেশ গেলো। ছুটিতে দেশে আসতো। মুকুল মামা প্রায়ই ছোট মামার কাছে ফোন করতো। সবার খবরাখবর জানতো। একদিন শুনলাম মুকুল মামা দেশে আসছে। সবটা না জানলেও যেটুকু জেনেছিলাম তাহলো; সংসারের অশান্তি আর ঝামেলা মিটমাট করতেই মুকুল মামা সেইবার দেশে এসেছিল। মালা আন্টির সাথে মুকুল মামার দূরত্ব এতটাই বেড়েছিল যে প্রায় ছাড়াছাড়ি পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। ছোট মামার গ্যাং এইবারও ঝাঁপিয়ে পড়লো। ডিভোর্সটা কোনরকমে ঠেকানো গেলো। কিন্তু তাদের দূরত্ব ঘুচলো না। মালা আন্টি চলে গেল তার বাবার বাড়ি। আর মুকুল মামা বিদেশে। এখনও মালা আন্টি ওখানেই আছে। মালা আন্টি আর মুকুল মামার কোন সন্তান হয়নি।

প্রবাদ আছে ‘অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায় ভালবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়’। এই অভাব কি শুধুই অর্থের? নাকি ভালবাসার? নাকি বোঝাপড়ার? নাকি আস্থার? এর বিপরীত চিত্রও যে নেই তা কিন্তু নয়। ###

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.