নারীর সমস্যাকে সবার সমস্যা ভাবতে হবে

DSCN2100আঙ্গুর নাহার মন্টি, টোকিও থেকে: বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ায় শুধু নারীর ক্ষমতায়নই হয়নি, বরং তাদের পরিবারের উন্নতি হয়েছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। অথচ জেন্ডার বৈষম্যের মতো নারীর সম্ভাবনাগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। নারীর সমস্যাগুলোকে সবার সমস্যা হিসেবে আমলে নিয়ে সমাধানের এখনই উপযুক্ত সময়। আর এটিই এখন দেশে দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

জাপানের রাজধানী টোকিওতে শুক্রবার শুরু হওয়া ‘ওয়ার্ল্ড এসেম্বলি ফর উইমেন টোকিও ২০১৪: টুওয়ার্ডস এ সোসাইটি হয়্যার উইমেন শাইন’শীর্ষক আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে বিশ্ববরেণ্য বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

শুক্রবার দুপুরে কেইডারেনের সম্মেলন হলে উইমেন পাওয়ার এজ দি সোর্স অফ গ্রোথ’এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত সিম্পোজিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা নারীর সমস্যাগুলো নিরসন করে তাদের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তারা বলেন, এই সিম্পোজিয়াম আমাদের নারী ইস্যুতে জেগে উঠার জন্য সত্যিই এক শক্তিশালী ও জোরালো আহ্বান। তা না হলে একুশ শতকেও আমরা প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হবো।

বক্তারা আরো বলেন, ঘরে-বাইরে বিশাল অবদান রেখে চলার পরও দেশে দেশে নারীরা জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন যা তাদের শ্রম বাজারে অর্থবহ অংশগ্রহণের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে পুরুষের ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টোটা। তারা কাজের নিরাপত্তা, উচ্চ বেতন কাঠামো এবং তাদের সম্ভাবনাগুলোকে তুলে ধরার সকল সুবিধাগুলো পাচ্ছেন। এদিকে বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে বৈষম্যের মধ্যে রেখে অর্থনীতিও খুড়িঁয়ে খুঁিড়য়ে চলছে। সকল ক্ষেত্রে নারীর সমতা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক সংকটের মতো ভয়াবহ রূপ বিশ্বকে দেখতে হতো না। তাই নারীর সমস্য্যকে সবার সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। নারীর সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সিম্পোজিয়ানের উদ্বোধন হয়। শিনজো আবে সেদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন জানিয়ে বলেন, নারীর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে জাপান নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে অঙ্গিকারবদ্ধ। নারীর উজ্জ্বল অবস্থা হতে থাকবে এমন সমাজ গঠনের লড়াইয়ে আমি নিজে সামনের সারিতে থাকতে চাই। তাই ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছি। এই কাজে আপনাদেরও সহযোগিতা চাই।

উন্নত দেশ হলেও জাপান নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে আছে স্বীকার করে আবে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উন্নত না হয়েও নারীর ক্ষমতায়নে অনেক অগ্রগতি করেছে। আমি সেই ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো জানতে চাই। জাপান ও বিশ্বে নারীর শক্ত ভিত তৈরীতে তা কাজে লাগাতে চাই।

মূল বক্তব্যে আইএমএফে’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টিনা লাগার্ডে বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন নারী বা জাপানের জন্যই নয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সারা বিশ্বেই নারী সমান শিক্ষিত ও দায়িত্ব পালন করেও পুরুষের চেয়ে কম বেতন পায়। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব সমান হলেই বেশিরভাগ দেশে নারীকেই ঘরে-বাইরে সামাল দিতে হয়। যা তার ক্যারিয়ার, পদোন্নতি, বেতনসহ বিভিন্নক্ষেত্রে বাধাঁ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সকলের সহযোগিতা পেলে নারীর সম্ভাবনাগুলো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ নারীকে বাদ দিয়ে কোন দেশের অর্থনীতিই এগিয়ে যেতে পারবে না। আর একুশ শতকের অর্থনীতি গঠনে নারীই হয়ে উঠবে মেরুদন্ড।

তিনি কর্মক্ষেত্রগুলোকে নারীবান্ধব করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারীর সমতা নিশ্চিত করে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কোম্পানী ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে, নারী সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলেই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়। তাই নারীর ক্ষমতায়নে আজ অর্থনৈতিক নীতি ও মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

অনুষ্ঠানে জাপানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন কেনেডী তার নিজের ও তার সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে নারীর ঘরে-বাইরে ভারসাম্য রক্ষায় প্রানান্ত চেষ্টার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, একুশ শতকের এজেন্ডায় নারীর ক্ষমতায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বেইজিং সম্মেলনের পর গত বিশ বছরে নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণ করেছে। নারী ও মেয়েশিশুদের পেছনে রেখে কোনভাবেই উন্নয়ন সম্ভব না।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর আকিকো ইয়ামানাকার সঞ্চালনায় ‘টুওয়ার্ডস এ সোসাইটি হোয়্যার উইমেন শাইন’ শীর্ষক এক সংলাপে অংশ নেন জাপানী প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী আকি আবে এবং যুক্তরাজ্যের চেরী ব্লেয়ার ফাউ-েশন ফর উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা চেরী ব্লেয়ার। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, স্বামী প্রধানমন্ত্রী হলেও তারা ঘরে-বাইরে তাদের কাজে সহযোগিতা করছেন যা অন্যদের উৎসাহ দিতে পারে।

প্রসঙ্গত, জাপান সরকার, জাপানের বিজনেস ফোরাম কেইডানরেন, দি নিক্কি এবং দি জাপান ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সের (আইইইএ) উদ্যোগে এবং জাপান সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চের (জেসিইআর) সহায়তায় এ সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়েছে। এতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত বিশ্বের ৫০ জন এবং জাপানের বিভিন্ন অঙ্গনে উচুঁ পদে অধিষ্ঠেত ৫০ জন নারী অংশগ্রহণ করছেন। আজ শনিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অর্থনীতিতে নারীকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করা এবং বৈশ্বিক সমস্যা ও নারীর উদ্যোগ বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

শিনজো আবে’র সঙ্গে স্পিকারের বৈঠক: টোকিও সফররত জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’র সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সিম্পোজিয়াম ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শিনজো আবে তার সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের আতিথিয়েতায় মুগ্ধ হয়েছেন বলেও জানান। বৈঠকে জাপান-বাংলাদেশ সমন্বিত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। একইসঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জাপানকে সমর্থণ দেয়ায় শিনজো বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণে এই সিম্পোজিয়ামে যোগ দিতে স্পিকার গতকাল আজ তিনদিনের সফরে টোকিও আসেন। নারিতা বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এবং কাউন্সেলর মোহাম্মদ নূরে আলম।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.