নারী নিধনের নয়া অজুহাত ‘লাভ জিহাদ’

mourn picসরিতা আহমেদ: শাস্ত্রে বলেছে ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহ’। ভারতের নয়া গেরুয়া সরকারের অশুভ আঁতাতকামী দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ‘। ও আরও কিছু দল নারী নিধনের একটি নয়া তরিকা বের করেছে একটি আপাত আঁতকে ওঠা নাম দিয়ে – ‘প্রেম জেহাদ’ ।

কি এই বস্তু ?

উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খন্ডসহ বিক্ষিপ্ত কিছু প্রদেশে ভিন ধর্মে বিয়ে করার পরে নব বিবাহিত মেয়েরা নানা ভাবে ঠকেছে ও অত্যাচারিত হয়েছে। তাই নিয়ে সারা দেশ জুড়ে হৈ চৈ। বলা হচ্ছে, মুসলিমরা পরিকল্পিত ভাবে, ষড়যন্ত্র করে অসহায় হিন্দু মেয়েদের প্রলুব্ধ করে বা স্রেফ ভয় দেখিয়ে, অথবা বলপ্রয়োগ করে প্রেমের অভিনয় করছে, তার পর নিকাহ্ নামা পড়িয়ে বেগম বানিয়ে পর্দানশিন করে ফেলছে। এর পিছনে নাকি রয়েছে আন্তর্জাতিক চক্র, যারা অর্থ জোগাচ্ছে ধর্মান্তরকরণের এই অভিনব প্রকরণে। এই সব ঘটনাকে ডাকা হচ্ছে ‘প্রেম জেহাদ’ বা ‘রোমিয়ো জেহাদ’ বা ‘লাভ জেহাদ’ রূপে ।

তার উত্তর দিতে উঠে পড়ে লেগেছে মুসলিম সংঘ বা মোল্লা গোষ্ঠি । এই বিষয়টির সাথে ইসলামের কোনো আঁতাত নেই ইত্যাদি বলে পালটা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে তারা। এখন ব্যপারটা হল, হিন্দু মেয়েদের মুসলিম ছেলেদের প্রেমে পড়া ও পরিণামে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া ‘জেহাদ’ বলে গণ্য হবে কেন? কেনই বা ধরে নেওয়া হবে যে, প্রেম যখন জাতপাতের অবরোধ মানে না, তখন ধর্মের বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাধা মানবে? হিন্দু ছেলের মুসলিম মেয়ের প্রেমে পড়া বা উল্টোটা কি এতই অসম্ভব কোনও প্রকল্প যে, তা অস্বীকার করতে একটা বিশাল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গল্প ফাঁদতে হবে? আসলে ভিন জাতে বিয়ে মানে তো কেবল পরিবারের এত দিনের খেয়ে পড়া মেয়ে / ছেলেটা হাত ছাড়া হল তাই নয় ; এত দিনের ধর্মচর্চাও জোড় ধাক্কা খেল প্রেমিক যুগলের অ্যাডাল্ট ডিশিসনের কাছে ।

হিন্দু পিতৃতন্ত্রের পক্ষে এই ‘পরাজয়’ শিরোধার্য করা তো দুঃসহ। এই পিতৃতন্ত্র আজও খাপ পঞ্চায়েতের ফরমান দিয়ে ঘরের মেয়ে-বউদের অসূর্যম্পশ্যা রাখতে চায়, স্বগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ করে, অসবর্ণে বিবাহে চোখ রাঙায়, দলিত যুবকদের উচ্চবর্ণীয় মেয়েরা বিয়ে করলে বা প্রেম করলে জ্যান্ত ফাঁসি দেয় বা চণ্ডীমণ্ডপে মেয়েটিকে সমবেত ভাবে ধর্ষণ করে টাঙিয়ে বা পুড়িয়ে দেয়। হিন্দু
নারী হিন্দু পুরুষের, হিন্দু পিতৃতন্ত্রের একান্ত লীলাক্ষেত্র। সেখানে কোনও অনধিকার প্রবেশ বরদাস্ত হবে না। পরিবার ও সনাতন ধর্মের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় প্রয়োজনে বিধর্মীর দিকে ঝোঁকা মেয়েদের হত্যা করা হবে । তবু হিন্দু পুরুষের পৌরুষ কলঙ্কিত হতে দেওয়া যায় না।

বিজেপির সাংসদ যোগী আদিত্যনাথ তাই হুঙ্কার ছেড়েছেন— “ওরা যদি আমাদের একটা মেয়েকে বিয়ে করে, আমরা তবে ওদের একশোটা মেয়েকে বিয়ে করব।” মুশকিল হল, হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ বেআইনি। তার চেয়ে বরং মুসলিম বিদ্বেষ লালন করা ও ছড়িয়ে দেওয়ার সহজ পথটাই বেছে নেওয়া ভাল। বিদ্বেষ ও ঘৃণা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়, যদি তাকে নারীর সম্ভ্রম, শ্লীলতা, সতীত্ব ও যৌনতার ধারণার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেওয়া যায়। ‘প্রেম-জেহাদে’র ধারণাটা সে দিক থেকে বেশ উপযোগী । ‘প্রেম জেহাদ’ থেকে হিন্দু নারীদের রক্ষা করার নামে তাদের উপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া হবে। তাদের বাইরে বের হওয়া, সকলের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করায় নিষেধের দেওয়াল উঠবে, তাদের সদ্য-সূচিত ক্ষমতায়নের প্রকল্প মাঝপথে ধাক্কা খাবে। প্রেম-জেহাদ থেকে রক্ষা করার অজুহাতে হিন্দু নারীর প্রতি পিতৃতন্ত্রের বৈষম্য ও পীড়ন আরও বৃদ্ধি পাবে। নারীর বিরুদ্ধে ঘটতে থাকা পারিবারিক ও সামাজিক হিংসাও আরও প্রতিকারহীন হবে। পরিবারের সম্মানরক্ষার নামে ‘বিপথগামী’ মহিলাদের নিধন বাড়তে থাকবে ।

এই ভিন জাতে বিয়ের ব্যাপারে প্রথম থেকেই নানা বাধা , অত্যাচার , অনার কিলিং ইত্যাদি আপদ বিপদ মেয়েদের জন্য একচেটিয়া বিষয় ছিলই । কি গুজরাটে, কি মহারাষ্ট্রে , কিম্বা পশ্চিমবঙ্গে। এখন ধর্মব্যবসায়ীদের জারি করা এই নব্য আইটেমে এবার তাহলে হিন্দু মেয়েদের ‘সম্মান’ বাঁচাতে পায়ের বেড়ি আরও মজবুত করা হবে, মেয়েবেলা থেকে লালিত পাশের বাড়ির যুবকটির দিকে প্রমাতুর দৃষ্টিতে তাকানোমাত্র জবাই করার জন্য রামদা হাতে ছুটে আসবে রামপন্থি , গেরুয়া ধারী , তিলককাটা তাবৎ ধর্মরক্ষক বাহিনী ।

আন্তর্জাতিক বাজারে এমনিতেই মেয়েদের জন্য নিরাপদ কোনও দেশ নেই । এত দিন মুসলিম জেহাদি, তালিবানি, শরিয়তি নানাবিধ ফতোয়ায় জেরবার ছিল নারী জীবন । কি ঘরে, কি বাইরে সর্বত্র ধর্মের বেড়ি নিষিদ্ধ করেছে তাদের ঋজু চলাফেরা । না মানলে কোতল করেছে প্রকাশ্যে , নইলে ছুঁড়েছে ঢিল মৃত্যু না আসা পর্যন্ত। আবার অন্য ধর্মের মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের ডানা ছাঁটতে ‘অনার কিলিং’ এর নামে নির্বিচারে নারীহত্যাকে আধুনিক ধর্মরক্ষা, পরিবারের মান রক্ষার মত ডাকসাইটে নাম দিয়ে এসেছে সুশিল সমাজ । না, এটা ভাবলে ভুল হবে যে শুধু
অবাঙ্গালি রাজ্যে-পরিবারেই মেয়েদের এই বলিপ্রথা চলছে ; বরং এই পশ্চিমবঙ্গেও এর ধারা চলে এসেছে । খোদ কলকাতাতেই একটি থানায় বোনের কাটা মুণ্ডু হাতে দাদা ধরা দিতে এসেছে – বুক ফুলিয়ে স্বীকার করেছে অনার কিলিং এর কথা ।

এবার এই নয়া ‘লাভ জেহাদ’ এর ধূঁয়া তুলে রাজনীতির কারবারি আর তাদের অশুভ মিত্রশক্তিরূপী সাম্প্রদায়িক দল গুলি যদি এইভাবে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের জঘন্য খেলায় নেমে পড়ে তবে ভারতীয় মেয়েরা যাবে কোথায় ?

আমার চেনা কয়েক জন মুসলিম মেয়ে বাড়িতে শরিয়তি অত্যাচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে হিন্দু প্রেমিকের হাত ধরে, তারা বিয়ে করেছে, সংসার পেতেছে সানন্দে । এবার এই ফতোয়ায় এসব হিন্দু-টার্ন্ড মেয়েদের কি পরিচয় হবে ? ‘লাভ জেহাদ’ নাকি গ্লোবাল ইসলামাইজেশনের একটা নরমপন্থী প্ল্যান যার জেরে হিন্দু মেয়েরা তাদের হিন্দুত্ব খোয়াচ্ছে । কিন্তু যেসব হিন্দু ছেলেরা মুসলিম মেয়েদের বিয়ে করেছে তাদের ক্ষেত্রে এটা কেমন বিষয় ? ভাববার কথা ।

ভাববার বিষয় এটাও যে, ইসলামি শরিয়তি ফতোয়াই হোক , হিন্দু সংঘের ফতোয়াই হোক ধর্মের যূপকাষ্ঠ কিন্তু সর্বদা হাঁ-মুখ খোলা রেখেছে নারী রক্ত-মাংস-হৃদয় ভক্ষণের জন্যই । সব সংগঠন বা জামাত, পুরুষদেরই কেবল ক্লিনচিট দিয়েছে সব ক্ষেত্রে । এই ভিন ধর্মে বিয়ের ব্যাপারেও কেবল মেয়েদের ‘রক্ষা’ র নামে তাদের পায়ের শিকল মজবুত করতে নির্দেশ দিচ্ছে সব সমাজের অভিভাবকরা । যেন বিয়েটা কেবল একজন মেয়েই করে । ‘অনার কিলিং’ , ‘ স্টোন কিলিং ‘ , ‘কিলিং ফর লাভ জেহাদ’ রকমারি সব হাঁড়ি কাঠ । জবাইয়ের বকরি কিন্তু সেই একটি জাতই – নারী। যে হিন্দুই হোক, মুসলিমই হোক , ইজরাইলি হোক , ফিলিস্তিনী হোক , ভারতীয় হোক, বাংলাদেশি হোক, পাকিস্তানী হোক , হিন্দীভাষী হোক কিম্বা বাঙালি হোক … শেষমেশ তুমি এক তাল মাংসপিন্ডমাত্র যা জন্ম হইতেই পুরুষ-সমাজ-জাতধর্ম ইত্যাদি সবার জন্য একটি এন্টারটেইনমেন্ট এর বস্তু এবং জন্মক্ষণ হইতেই বলি প্রদত্ত । ]

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.