সোভিয়েত নারীর দেশে-১৯

Peter 3সুপ্রীতি ধর: মাঝে বেশকিছুদিন লেখা হয়নি কলামটি। কাজের ব্যস্ততা ছিল, সেইসাথে একটু ঘুরতে যাওয়াও হয়েছিল। সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লেখার জন্য যে পরিবেশ লাগে, সেটা ছিল না মোটেও। তবে এই ঘুরতে যাওয়ার মাঝেও সোভিয়েত রেশ ছিল। সেই কথাই বলবো আজ।

কয়েক বছর আগে একটা লেখায় লিখেছিলাম, আমরা যারা সবে কৈশোর পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম ভিন্ন এক দেশে, ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন ভাষায়, তাদের যেন নতুন জন্ম হয়েছিল। যখন আমাদেরকে নতুন ভাষায় বাবা-মা শব্দগুলো শেখানো হচ্ছিল, সত্যিই আমাদের পুনর্জন্ম ঘটেছিল। অনেকটা শিশুর বোল ফোটার মতো। নতুন একটা ভাষায় আমরা পাপা ডাকলাম হোস্টেলের নিরাপত্তা রক্ষীদের, মামা ডাকলাম হোস্টেলে যারা ক্লিনারের কাজ করতেন তাদের। এভাবেই আমরা আঁকড়ে ধরেছিলাম একটা দেশকে, একটা সংস্কৃতিকে, তদুপরি একটা দেশের মানুষকে।

সেই মানুষগুলোও আমাদের ভালবাসাকে ফিরিয়ে দেননি। আমাদের কারও কারও প্রতি তাদের ছিল অগাধ স্নেহ। কোন কোনদিন বাসা থেকে আসার পথে আমাদের জন্য হাতে করে নিয়ে আসতেন ঘরে তৈরি খাবার। এই অপত্য স্নেহে কোন খাদ কোনদিন পাইনি। বরং তা শিরোধার্য করে পথ চলেছি বিদেশ-বিভুঁইয়ে। মন খারাপের সময়টায় তাদের স্নেহের এই স্পর্শ সব ভুলিয়ে দিয়ে যেত। চিঠি পেয়েও কাঁদতাম, টেবিলে ছড়ানো অনেক চিঠির মধ্যে নিজের চিঠি না পেলেও কাঁদতাম। তখন এই মানুষগুলোই পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিত।

যেকথা বলছিলাম। ২০০১ সালে একটা স্কলারশিপ নিয়ে ডিপ্লোমা করতে গিয়েছিলাম দিল্লির আইআইএমসিতে। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সংলগ্ন ছিল আমাদের এই ইনস্টিটিউট। বিভিন্ন দেশের ১৬জন সাংবাদিক ছিলাম চার মাসের সেই কোর্সে। একদিন বাসে করে ফিরছি মূল শহর থেকে। হঠাৎ কানে আসে, কেউ একজন বলছে, আর ইউ লিপি? আমি চমকিত হই আমার আটপৌরে নামটি ভিনদেশের মাটিতে শুনে। পিছনে তাকিয়ে দেখি, অরুণিম দাঁড়িয়ে। কলকাতার ছেলে। সেই হাসি, সেই মুখ। সেন্ট পিটার্সবুর্গে আমার ইউনিভার্সিটিতেই ভাষাতত্ব নিয়ে পড়তো সে, কিছুটা জুনিয়র। অন্য হোস্টেলে থাকলেও আমাদের হোস্টেলে ভারতীয়দের সংখ্যাধিক্যের কারণে ও এখানে চলে আসতো প্রতিদিন, আর বাঙালী বলে আমার কাছেও আসতো। রান্না হলে একসাথে খেতাম। আমার মেয়েটা যখন হয়, তখন ওর উপস্থিতি বেশ ভাল সহায়ক ছিল আমার জন্য। ওর কাছে রেখে স্নান করতাম, ঘরের কাজকর্মগুলো সারতাম। সেই অরুণিম আমার সামনে বাসের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে।

চিৎকার দিতে গিয়ে আমার মুখ হাঁ করেই রইলো কিছুক্ষণ। তারপর অনেক কথা। প্রায় ছয়/সাত বছর পর দেখা তখন। দিল্লিতে বিসমিল্লাহ খানের প্রোগ্রামে সেই আমাকে নিয়ে গেছিল। এবার ১৩ বছর পর আবার দিল্লিতে তার সাথে দেখা। এবার আর একা নয় সে। ভারী মিষ্টি একটা বউ, অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নিউজ পড়ে। নাম জাহানারা রায়চৌধুরী। এই নামে আমার চোখ কপালে উঠে। সেইখান থেকে চোখ ঠিক জায়গায় নামিয়ে নিয়ে আসে ওর বউই। বলে যে, তার বাবার প্রিয় চরিত্র ছিল সম্রাট শাহজাহানের মেয়ে জাহানারা। সেই কারণেই এমন নামকরণ। কিন্তু তাই বলে অপ্রস্তুত কান আমার কেবলই বলে চলে, জাহানারার সাথে রায়চৌধুরী? কেমন যেন বেখাপ্পা না? আমাদের এই বাংলায় কি তা সম্ভব হতো? তিয়াশা বলে একটা মিষ্টি মেয়েও এখন তাদের ঘরে। অরুণিম জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর।

ভারী মজার একটা আড্ডা হলো ওর বাসায়। সেই আড্ডার অণুঘটক ছিলেন চঞ্চলদা, চঞ্চল ভট্টচারিয়া। উনিও সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলেন। খারকভে থাকতেন বলে খারকভবাসী বাংলাদেশিদের সাথে তার ছিল দহরম-মহরম। ফেসবুকের কল্যাণে আমার সাথে পরিচয় হলেও একবারের জন্যও মনে হয়নি, উনি কোনদিন আমার অচেনা ছিলেন। আমার দিল্লিপ্রবাসী মেয়ের মামা এখন সে। সেই সুবাদে মেয়ের ইউনিভার্সিটির সব বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদেরই মামা বনে গেছেন। আর আমি তার রাশিয়াতুতো বোন, এভাবেই সম্বোধন করেন আমাকে।

আমার ছেলে বলে, চঞ্চল মামা যখন কথা বলেন, তখন দাড়িকমা ছাড়াই বলেন। একনাগাড়ে বলে যান। কিছুটা শুনি, কিছু বাদ দেই। তবুও সম্পর্ক এগিয়ে চলে। এতোটুকু ছেদ ঘটে না। আসলে সোভিয়েত সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন করা দু:সাধ্য, কঠিন কাজ। খাবার টেবিলে জমজমাট আড্ডা হয় তিন রুশফেরতাদের। সেই আড্ডায় রসদ জোগায় আমাদের জাহানারা।

কত স্মৃতি, কত কথা। অনেক কথাই আবার এলোমেলো, যার কোনো সঠিক অর্থ নেই, তবু বলে চলি। রাত ঘনিয়ে এলে উঠতে হয় গেস্ট হাউজের উদ্দেশ্যে। জেএনইউ এর বিশাল ঘন বনরাজি মনে আতংক জাগায়। চার মাস থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এখানে সাপ যেমন আছে, তেমনি নীলগাইও আছে, অবলীলায় ঘুরে বেড়ায় নীলগাই, ময়ূরের ডাক শুনে সকালে ঘুম ভাঙতো আমাদের। আমার ছেলের দুচোখ খুঁজে বেড়ায় নীলগাই, মেলে না। কোটি মানুষের আবাসভূমির রাজধানী এমন অনেক কিছুরই চারণভূমি। তাই তড়িঘড়ি করে রুমে ফেরা। সঙ্গে করে নিয়ে আসি আরও কিছুদিন জাবর কাটার মতো কিছু স্মৃতি।

অরুণিমের সাথে আলাপচারিতায় উঠে আসে পূরবীদি, মানে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পূরবী রায়ের প্রসঙ্গ। একাত্তরের দিকে ঊনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে গিয়েছিলেন। মায়াকোভস্কির ওপর তাঁর বিশাল গবেষণা আছে যতদূর জানি। তাঁর সাথে আমার দেখা হয় ১৯৯২-৯৩ এর দিকে, ঊনি ছয় মাসের জন্য একটা কাজে গিয়েছিলেন। থাকতেন আমাদের হোস্টেলেই। পরিচয়ের পর প্রস্তাব রেখেছিলাম, দিদি, প্রতিরাতে আমার এখানে আপনার খাওয়া ফ্রি, একার জন্য আর রাঁধবেন না। ঊনিও রাজী হয়ে গেলেন প্রস্তাবে। সেই থেকেই কাছে আসা।

এতোদিন পর ঊনার বেঁচে থাকার খবর পেয়ে আর সেইসাথে ফোন নম্বর পেয়ে কী আনন্দই না হলো। ফোন করে ‘নমস্কার দিদি’ বলতেই উনি কেমন করে যেন, ‘বাংলাদেশের লিপি’ চিনে ফেললেন। হয়তো আমার ‘নমস্কার’ শব্দেই বাংলাদেশ বাংলাদেশ গন্ধ ছিল, তাই বুঝে গেছেন। এরপরে ঊনি বললেন, ‘তোমাকে আমি এতো খুঁজেছি, এতো খুঁজেছি, আজ পেয়ে গেলাম, আর হারাবো না’। তাঁর এই বলায় আন্তরিকতা ছিল, ছিল অনেক হৃদ্যতা, চোখে জল এনে দেয়।

এসবই কিন্তু আমার সোভিয়েত জীবনের দারুণ প্রাপ্তি। যে জীবন আমি যাপন করে এসেছি আমার সোনালী বেলায়, সেই জীবনের স্বাদ কেবল আমিই জানি। দৈনিক প্রথম আলো’তে চাকরির সময় সমসাময়িক সহকর্মীদের বলতাম, তোমরা যে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছো, সেইসময়ে আমি সেন্ট পিটার্সবুর্গের নেভা নদীর তীর ধরে হেঁটে হেঁটে কবিতা আওড়েছি, সেখানকার ইটপাথর থেকে ইতিহাসের শিক্ষা নিয়েছি, দস্তয়েভস্কির লেখার টেবিল ছুঁয়ে প্রিয় লেখকের অস্তিত্ব খুঁজেছি, জিমনি দভারেৎস বা জারের শীতকালীন প্রাসাদ, যেখান থেকে রুশ বিপ্লবের সূচনা, সেই প্রাসাদের গা ছুঁয়ে বিপ্লবের সুফল নিয়ে জীবন ভরেছি। এক জীবনে এটা তো কম পাওয়া নয়!!!

কিন্তু সব তছনছ হয়ে যাচ্ছিল নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এসে। অর্থনৈতিক মন্দা এসে গ্রাস করে আমাদের প্রাপ্তির জীবনেও। একে-অন্যকে হঠাৎই চিনতে পারি না যেন। আমাদেরই কেউ কেউ প্রচুর টাকার মালিক হয়ে যেতে থাকে অজানা কোনো উৎস থেকে, আর আমরা হতে থাকি দুর্বল থেকে দুর্বলতর। বৈষম্যহীন, শ্রেণীহীন সমাজে হঠাৎই শ্রেণী ভেদাভেদ প্রকট আকার নেয়। আমরা তখন ছুটতে শুরু করি টাকার পিছনে। কোথায় পাওয়া যায়, কিভাবে পাওয়া যায় সেই টাকা! পেটে টান পড়ে। বন্ধুরা অচেনা হয়ে যেতে থাকে ক্রমশ।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে এসে যাদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতাম না তাদের ‘অনৈতিক’ জীবনযাপনের কারণে, আমাদেরই কেউ কেউ তাদের দ্বারস্থ হই। খাবারের দোকানের লাইন দীর্ঘতর হয়, কুপন বেচাকেনা চলে। আমি আমার মাংসের কুপন, সুজির কুপন দিয়ে চালের কুপন বিনিময় করি। ভাত না খেয়ে কি থাকা যায়? বাধ্য হই সিঙ্গাপুর যেতে। সেসময় ব্যবসায়ীরা ‘পাইলট’ হিসেবে আমাদের মতোন সাধারণদের পাঠাতো সিঙ্গাপুরে। যথার্থ পাইলটই আমরা। আমাদের খরচ দিয়ে পাঠানো হতো, সেখান থাকতাম, নির্দ্দিষ্ট একটা মার্কেটে গিয়ে একজনের সাথে দেখা করতাম। আর আসার সময় আমাদের ওজনে আসতো কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন, ফ্যাক্সসহ নানান ইলেকট্রনিক পণ্য। সেসব চোখেও দেখতে পেতাম না। বিনিময়ে আসা-যাওয়া ফ্রি ছিল, হাত-খরচ হিসেবে টাকা পেতাম তিনশ থেকে পাঁচশ ডলার। খারাপ না। সেই ৮৯ সালে মোস্তফা মার্কেটে অনেককিছুই কেনা যেতো সেই টাকায়।

তো, আমার সেই সিঙ্গাপুর ভ্রমণ নিয়ে মজার অভিজ্ঞতা আছে। সেই কথা পরে বলবো। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.