রোজ নামচা-২৪ (শেকড়ের সন্ধানে- ২)

Rajesh-Leena
রাজেশের সাথে লেখক

লীনা হাসিনা হক: চেন্নাই শহরের পুদুপেট বিশাল এলাকা। পরদিন নয়টার মধ্যে পুদুপেট পৌঁছে ট্যাক্সি ছেড়ে হাঁটতে শুরু করি আমরা।  এলাকাটায়  নিম্ন আয়ের লোকের বসবাস, পাকা বস্তি, অনেকটা আমাদের পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি গলির মতন, পাকা দেয়াল টিনের ছাদ, আবার কিছু পুরো পাকা গায়ে গায়ে লাগানো ঘর বাড়ী, দোতলা তিনতলা বাড়ীও আছে- সরু সিঁড়ি, ঘরের ভেতর সূর্যের আলো প্রবেশের উপায় নাই, লাকড়ির চুলার ধোঁয়া বাড়ীগুলির দরজা জানালা দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বের হচ্ছে, রাস্তার উপরে বাচ্চারা খেলা করছে, সরকারী জলের কল ঘিরে নারী পুরুষের জটলা, কলের মুখে জলের কলসীর লম্বা লাইনে বুঝা যায় জলের কষ্ট আছে, ছোট্ট মন্দিরে প্রদীপ জ্বলছে, মন্দির ঘেঁসেই ডাস্টবিন, পাশেই কাঁচা বাজার, ইডলি দোসা’র রেস্টুরেন্ট, সামবারের ফোড়নের সুঘ্রাণ আসছে, পাশে জিলিপিও বিক্রি হচ্ছে। ওপাশে মাছের বাজার। আঁশটে গন্ধে নিঃশ্বাস আটকে আসে। প্যাঁচপ্যাঁচে কাদাজলে সয়লাব রাস্তার কিছু অংশ। এরই মধ্যে জীবন চলছে।

এলাকার একপাশে সরকারী গোডাউনের বিশাল মাঠ, ইতি-উতি ছড়ানো মালবাহী ট্র্যাক। সন্ধ্যে হলেই এই মাঠ মাদকসেবনকারীদের দখলে চলে যায়, অপরপাশে সিনেমা হল। রজনীকান্তের বিশাল কাটআউট- টিকিট ঘরের লম্বা লাইনে বুঝা যায় এই পড়তি বয়সেও তাঁর জনপ্রিয়তায় কমতি নাই।

মাথার উপরে তপ্ত সূর্য নিয়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাঁটাহাঁটির পরও কোনও সন্ধান পাই না ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা ঠিকানার। ওই নামে একটি রোড আর তিনটি স্ট্রিট আছে, স্ট্রিটগুলির আবার নম্বর আছে, ১ ২ আর ৩। চরম হতাশার সাথে দেখি ডেথ সার্টিফিকেটের ঠিকানাটা অর্ধেক, মানে যেই বাড়ীর নম্বরটি দেয়া আছে তা কত নম্বর গলির তা লেখা নাই।

পুলিশ বক্সে গিয়ে সাহায্য চাইলে উনারা বললেন যেহেতু সঠিক ঠিকানা নাই, তাই বরং প্রতিটি গলিতে খোঁজার চেষ্টা করাই ভালো। শুরু করলাম মেইন রোড থেকে, মেইন রোডে এই নম্বরটি একটি সেলুন, কেউ কিছু বলতে পারল না রাজেশের বাবার কথা!

শুরু করলাম প্রথম স্ট্রিট থেকে, প্রতিটি বাড়ীতে যাই, জিজ্ঞেশ করি রাজেশের বাবা মায়ের নাম ধরে, কেউ কিছু বলতে পারে না। কুড়ি বছরে কত কিছু বদলেছে, আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা নিজের জীবন ধারণেই বেহাল অবস্থায়, কে মনে রাখে দুই যুগেরও আগে কোন গলিতে সুমতি নামের এক তরুণী কিসের অভিমানে দুটি শিশু সন্তান রেখে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল!

বুঝতে পারি না রাজেশের মায়ের মৃত্যুর কারণটি বলে খুঁজবো কিনা, হোক কুড়ি বছর আগের ঘটনা, লোকে এইসব মনে রাখে। রাজেশের মুখের দিকে তাকাই, জানতে চাই এটা করবো কিনা, ছোট্ট শিশুর মতন করে বলে, তুমি যা ভালো মনে করো!

বের হয়ে আসি মেইন রোডে, বসি চায়ের দোকানে। বলি তাকে, দেখো আসল ঘটনাটি বলে খোঁজার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধা হলো হয়তো কাউকে পেতেও পারো যে জানতো, আবার নাও পেতে পারো, তবে এই সেনসিটিভ ঘটনাটি উল্লেখ করা মাত্র লোকের কৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হবো আমরা, সেই বিশাল কৌতূহল আমার যৎ সামান্য কাজ চালানো তামিল ভাষা দিয়ে সামলাতে পারার সাহস আমার নাই। শেষে না পুলিশের শরণাপন্ন হতে হয়। এমনিতেই গত কয়েকঘণ্টায় লোকের চোখে পড়েছি আমরা, অনেকেই জানতে চাইছে কি কারণে খুঁজছি আমরা।

রাজেশ মাথা নাড়ে, ঠিক আছে, এমনিই খুঁজি। মা-বাবাতো পাব না অন্তত বাড়ীটা যদি আইডেনটিফাই করতে পারি সেটাই অনেক! প্রতিটি গলির প্রতিটি বাড়ী খুঁজলাম। কোনও হদিস করতে পারলাম না। প্রতিটি ওই নম্বরের বাড়ীর ভিতরে ঢুকলাম আমরা অনুমতি নিয়ে, ঘুরে ঘুরে দেখল সে শোবার ঘর, রান্না ঘর, বাথরুম। ছোট্ট চিলতে উঠোন। প্রতিটি গলির সেই বিশেষ নম্বর বাড়ীটির ছবি তুলে নিলো রাজেশ। আমি তার সাথে সাথে হাঁটি আর লুকিয়ে চোখের জল মুছি।

শেষ বিকেল পর্যন্ত চেষ্টা করেও কোনও শিবালিঙ্গাম বা সুমতি দম্পতি যাদের বাসন্তী আর রাজেশ নামে দুটো সন্তান ছিল তাদেরকে জানতো এমন কারো খোঁজ পেলাম না। তাছাড়া সুনামির পরে নুতন বাড়ীঘরের সাথে মানুষও বদলেছে।

ফিরতি পথে অটোতে বসে বাইরে তাকিয়ে রাজেশ শূন্য দৃষ্টিতে। আমার ফোন বেজে উঠে, মাহেশ্বরীর ফোন, ফাইলে একটা কাগজ পাওয়া গেছে যা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ। আজ অফিস বন্ধ হয়ে গেছে আমরা যেন কাল সকালে ১০টার মধ্যে আসি। রাজেশ জিজ্ঞ্যেস করে, আচ্ছা যেই শ্মশানে দাহ করা হয়েছিল আমার মাকে, সেখানে যাওয়া যায় না? আমার বুকটা কেঁপে উঠে। বলি সেখানে তো কোনও চিহ্ন থাকে না কবরের মতন! আজ থেকে ২৩ বছর আগে কোন ঘাটে দাহ হয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল তার গর্ভধারিণী মায়ের দেহ, কে বা জানে তা! কি খুঁজে বেড়াচ্ছে এই ছেলেটি!

ফিরে এসে সারা সন্ধ্যে আমরা সাগরের তীরে বসে থাকি চুপচাপ। এই অবস্থায় কোনও আলাপ কেমন যেন অবান্তর লাগে। রাজেশই এক সময় শুরু করে যেন নিজেকেই শোনায়,’ আমি জানি, আমি আর বাসন্তী যে জীবন পেয়েছি তা  প্রায় এক অলৌকিক উপহার। পুদুপেটের এই পরিবেশে থেকে বড় হয়ে কি হতাম আমরা জীবনে! বাসন্তীর হয়তো বিয়ে হয়ে যেতো ২০ বছর বয়সের আগেই আর আমি হয়তো বড়জোর সরকারী গোডাউনে দারোয়ান বা ট্রাকের ড্রাইভার হতাম। মাদকেও আসক্ত হতাম হয়তোবা। ডেনিশ নাগরিকত্ব ঈশ্বরের উপহার! আমার মা (ডেনিশ মা) আমাকে অসম্ভব ভালবাসেন। প্রথম প্রথম আমি রাতে কাঁদতাম বলে মা আমাকে পাশে নিয়ে ঘুমাতেন। আমার মুখে ঘা ছিল, মা আমাকে মিষ্টি পরিজ চামচ দিয়ে তুলে খাইয়ে দিতেন। পাঁচ বছরের আমাকে টয়লেট করতে সহায়তা করতেন। আমি যখন অন্য শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই, মা আমাকে হঠাৎ দেখতে চলে আসতেন, এখনো প্রতিদিন একবার করে ফোন করেন আমি ঠিক আছি কিনা জানতে। তারপরেও আমি যে আমার গর্ভধারিণী মায়ের সম্পর্কে জানতে চাই, তা কি অকৃতজ্ঞতা? দত্তক এই মাকে তো আমি ভালবাসি অনেক, এই মাই-ই আমার মা, তবু কেন আমার জানতে ইচ্ছে করে আমার নিজের মায়ের কথা? কেমন দেখতে ছিল আমার সেই সুমতি নামের মা ? বাসন্তী বলে মা আমাদেরকে দুই পাশে নিয়ে ঘুমাতেন। বাসন্তীকে নাকি মারতেনও রাগ হলে। আচ্ছা, হিন্দু ধর্মে মৃতের কোনও এপিটাফ কেন রাখার নিয়ম নাই!”

ভাবি, ছেলেটি কাঁদে না কেন! কাঁদলে তো একটু হালকা হতো!

পরদিন আটটা না বাজতেই দরজায় নক, রাজেশ রেডি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝি সারারাত সে ঘুমায় নাই। সকাল নয়টা বাজার আগেই আমরা হোমের অফিসের বারান্দায়। ফাইলের কাগজপত্রের মাঝে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা কাগজ- তামিল ভাষায় লেখা।  পি. শিবালিঙ্গম আর বিজয়া সুমতি’র বিয়ের আমন্ত্রণ পত্র। ঠিকানার জায়গায় জেলার আর গ্রামের নাম দেয়া আছে। চেন্নাই থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের সমুদ্রতীরবর্তী জেলা। আর কিছু নাই। এযে প্রায় খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতন হবে। এদিকে রাজেশের ভিসার মেয়াদ শেষ, তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে আজই রাতের ফ্লাইটে দিল্লী সেখান থেকে কাল সকালে কাঠমান্ডু হয়ে তার নিজের দেশে! নিজের দেশে!

ফিরে আসি হোটেলে। রাতে ফ্লাইট- সারাদিন রাজেশ মন খারাপ করে বসে থাকবে? হঠাৎ মাথায় আসে, আচ্ছা পুরনো হোম, যেখানে রাজেশরা ছিল সেখানে একবার যাওয়া যায় না? ঠিকানা তো আছে। হোমটিতে এখন শারীরিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত অনাথ শিশুদের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা দেয়া হয়।

অনাথালয়টি নামকরাই ছিল, অটো আমাদের একটানে নিয়ে আসে। ইন চার্জ মহিলা, সব শুনে আমাদের ঢুকতে দেন ভিতরে। রাজেশ আর আমি ঘুরে ঘুরে দেখি। রাজেশ হোমের প্রতিটি ঘর, বারান্দা,  এমনকি টয়লেট পর্যন্ত যেন দৃষ্টি দিয়ে ছুঁয়ে দেখে। বড় লম্বা খাবার ঘর- খাঁ খাঁ করছে, রাজেশ জানায় তার হালকা মনে পরে, খাবার সময় ঘণ্টা বাজত আর তারা দৌড়ে আসতো। সে মনে করতে পারল সেই সময় হোমের দেয়ালে নানা কার্টুন আঁকা ছিল। এখনো তাই আছে। রাজেশদের ফাইল থেকে দু ভাইবোনের সেই সময়কার একটা রঙ্গিন ছবি আমরা ফোনের ক্যামেরায় তুলে এনেছিলাম। মিলিয়ে দেখলাম ঠিকই বলছে রাজেশ। ঠিক সেই বারান্দার সেই কোনটিতে দাঁড়িয়ে রাজেশের একটা ছবি নিলাম। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো ছবিতে মাতৃহীন সেই পাঁচ বছরের অসুখী শিশুটির সাথে পঁচিশ বছর বয়সী শেকড় সন্ধানী এই তরুণের মধ্যে কোনও ফারাক নাই।

হোমের বারান্দায় বসে রইল অনেকক্ষণ রাজেশ। একসময় আমি গিয়ে তার পাশে বসি। জানায় সে, “আগামী বছর টাকা জমিয়ে লম্বা ভিসা নিয়ে আমি আবার আসবো। খুঁজবো আমার মায়ের গ্রাম। শেষবারের মতন একটা চেষ্টা করবো, যদি সেই গ্রাম পাই, যদি পাই কাউকে যে সুমতি নামের সেই তরুণীকে জানতো, কেমন ছিল সে, আমার নিজের মা! বড্ড জানতে ইচ্ছে করে যে!”

চলেছি এয়ারপোর্টের দিকে। অটোরিকশার প্রচণ্ড শব্দের ভেতর রাজেশের গলা কানে আসে, ‘জানো, বাসন্তীর তো পাঁচ বছর বয়স ছিল, ওর কিছু কথা আবছা হলেও মনে আছে, সে বলেছে মা-বাবার মধ্যে অনেক ঝগড়া হতো। বাবা-মাকে মারত, বাসন্তীকেও মারত। মা’র অনেক কষ্ট ছিল। নইলে কেন ছোট্ট আমি যে তার বুকের দুধ খেয়ে বাঁচতাম, তাকে রেখে মা চলে যাবে? বাসন্তী বলেছে, মা আমাকে ‘রাজা’ বলে ডাকতো।’

আমি বলি, থাক এসব কথা রাজেশ। এই প্রথমবারের মতন হঠাৎই কেঁদে ওঠে রাজেশ, তীব্র হাহাকারে পূর্ণ পঁচিশ বছরের জমে থাকা সেই রোদন অটোর শব্দ ছাপিয়ে চেন্নাই শহরের কোটি মানুষের কোলাহল ছাড়িয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে আসা নোনতা হাওয়াকে পিছে ফেলে গনগনে আকাশ ভেদ করে কি পৌঁছে যায় অন্য কোথাও? আমি তার কেঁপে ওঠা পিঠে হাত রেখে চুপচাপ বসে থাকি। অটোচালক পেছনে ফিরে দেখে, কি বোঝে কিছু জিজ্ঞ্যেস করে না।

সময়ের বেশ আগেই এয়ারপোর্টে এসে বসে থাকি দুজনে। বলি, আগামী বছর তুমি যদি সত্যি সেই ঠিকানায় যাও, আমাকেও সঙ্গে নিও রাজেশ। সে মাথা নাড়ে। একটু পরে বলে, ‘জানো, এই শেকড় খোঁজার ব্যাপারটি আমাকে আরও বেশী করে আমার মাকে (দত্তক) ভালবাসতে শেখাচ্ছে। আরও বেশী ডেনমার্কের জন্য মন কেমন করছে। এবার ফিরে গিয়ে মা-বাবার সাথে না হলেও কাছাকাছি থাকবো। আসলে তো আমার কোনও শেকড় আর এখানে নাই! তবু ভাবছি একটা ফাইল করবো। আমার সন্তানদেরকে জানাবো আমি কোথা থেকে এসেছিলাম! বেসিক্যালি আই এম আ চেন্নাই বয়!’ একটু চুপ থেকে আবার বলে, ‘ যখন আমার সন্তান হবে, ছেলের নাম রাখবো ডেনিশ বাবা আর জন্মদাতা বাবার নাম মিলিয়ে, কিন্তু মেয়ে হলে নাম রাখাটা সমস্যা হবে! জিজ্ঞ্যেস করি, কেন?

গত কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম রাজেশের মুখে হাসি দেখি,’ আসলে তিনটি মেয়ে সন্তান লাগবে আমার, নইলে এক মেয়ের জন্য নাম একটু লম্বা হয়ে যাবে যে-‘সুমতি আনা হাসিনা’! অবাক চোখে তাকালে আমাকে জড়িয়ে ধরে সে, তুমি তো আমার আরেকটি মা, সেই প্রথম দিন থেকেই! আমার এই শেকড় খোঁজায় আমার মৃত মায়ের কোনও তথ্যই আমি পাইনি হয়তো, কিন্তু নিশ্চিত করে পেয়েছি আরেকটি মাকে, যে মা আমায় আগলে রেখেছে গভীর মমতায়! আই নো ডীপ ইন মাই হার্ট দ্যাট আই হ্যাভ মাই এক্সটেনডেড ফ্যামিলি ইন বাংলাদেশ! ইজন’ট ইট গড’স স্পেশাল গিফট ফর মি?”

নিজের চোখের জল লুকাতে পারি না, আসলে চাইও না।

নোট: যদি রাজেশ শেষপর্যণ্ত খুঁজে পায় তার মায়ের গ্রাম, জানাবো পাঠকদেরকে।

শেয়ার করুন:
  • 153
  •  
  •  
  •  
  •  
    153
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.