আগুন হয়ে ফিরে এসো নাজনীন

naznin
নাজনীন আক্তার তন্বী

মনিজা রহমান: আমি কখনও আত্মহত্যা করতে গিয়ে ফিরে আসা কোন মানুষকে দেখিনি। তাও আবার কোন কাছের মানুষকে!

‘একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি:

হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন- গিয়েছে সে শান্ত হিম ঘরে,’

সবাই থাকবে। আমি চলে যাব। সবাই তখন বাধ্য হয়ে ভাবতে শুরু করবে আমাকে নিয়ে। আত্মহত্যা করার মতো রোমান্টিক ভাবনা অনেকের মধ্যেই সুপ্ত থাকে। কৈশোরে শুরু হয়ে তরুণ বয়সেও কখনও সেটা উঁকিঝুঁকি মারে। তাই বলে কেউ তো নিজেকে হত্যা করতে পারে না। আত্মা অবিনশ্বর। আত্মাকে ধ্বংস করা যায় না। মৃত্যু হয় শুধু দেহের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের করিডর দিয়ে ওইদিন যখন হাঁটছিলাম, চারপাশের দেয়াল যেন গিলে খেতে চাইছিল আমাকে। টিস্যু দিয়ে মুখের ঘাম মুছলাম। হাতের তালু ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল।

ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সামনে বসেছিলেন নাজনীনের (নাজনীন আক্তার তন্বী) মা। আমাকে দেখে তিনি হাসলেন। পরিচিত কাছের মানুষকে দেখে সবাই যেভাবে হাসে। চন্দ্রমুখী দিনের বেশীরভাগ সময় নানীর কাছেই থাকতো। সেই ছোট্ট ফুলপরী চলে গেছে কোন এক স্বপ্নলোকে। মেয়ে পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে গিয়ে ফিরে এসেছে। অথচ তিনি স্বাভাবিকভাবে হাসলেন। জীবন আর মৃত্যুকে মা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলেও, মেয়ে সেটা পারেনি।

আইসিইউতে শুয়ে থাকা নাজনীনকে দেখে আমার বিশেষ কিছু মনে হয়নি। দুর্ঘটনায় হাত-পা ভেঙ্গে গেলে যেমন হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ বাধা। মাথায় দুই বেনী।

এক মাথা ঘন চুল নাজনীনের। বিসিডিজেসির প্রোগামে প্রথম ওকে চুলের জন্যেই মনে রেখেছিলাম। তারপর জানলাম ও মানবজমিনে কাজ করে। ওখান থেকে ২০০৪ সালের শেষ দিকে জনকণ্ঠে আসে। আমারও শুরুটা মানবজমিন থেকে।

পুরুষ সহকর্মীরা ডেকে বলল, এতদিনে মনিজার একজন কথা বলার সঙ্গী হলো! আমরা দুইজন হাসলাম। নাজনীন জনকণ্ঠে যোগ দিয়েছিল নারী ও শিশু রিপোর্টার হিসেবে। তারপর হলো সংসদ রিপোর্টার, এরপর কূটনৈতিক রিপোর্টার…সবটাই নিজের যোগ্যতায়। নিয়মিত বিটের বাইরে সুযোগ পেলেই নাজনীন বিশেষ রিপোর্ট করতো। ভালো কাজের একটা নেশা ছিল ওর মধ্যে। এইসব রিপোর্টের জন্য ও পুরস্কারও জিতেছে বেশ কয়েকবার।

রূপে-গুণে অনন্য একটা মেয়ে নাজনীন। মনটা পলিমাটির মতো নরম। কারো সামান্য উপকারে এত অসামান্য করে ধন্যবাদ জানাতে ওর মতো কেউ পারে না। সবার জন্য খুব মায়া। মাঝেমধ্যে অফিসের মিটিং শেষে ভরদুপুরে আমার বাসায় চলে আসতো ও। কেমন যেন মন ভরিয়ে দিত ওর নরম স্নিগ্ধ উপস্থিতি। আমি জনকণ্ঠ ছেড়ে ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে চলে যাবার পরেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ওর সঙ্গে।

নাজনীনের বিয়ে থেকে চন্দ্রমুখী হওয়ার প্রথম দিনটি পর্যন্ত সব কিছু স্পষ্ট মনে আছে। ইস্কাটনের আবীর জেনারেল হাসপাতালে চন্দ্রমুখীর জন্ম হয়েছিল। বাসার খুব কাছে হাসপাতালটার অবস্থান হওয়ায় সম্ভবত নাজনীনের পরিবারের সদস্যদের বাইরে আমিই প্রথম গিয়েছিলাম। নাজনীনের কোলে সেই নরম তুলতুলে শিশুটি। থাকবে না বলেই হয়ত ও এসেছিল চারদিক এমন আলোর বন্যা ভাসিয়ে দিয়ে।

চন্দ্রমুখী গোলাপফুলের মতো সেজে ওর নানু কিংবা খালামনির সঙ্গে মাঝেমধ্যে অফিসে আসতো আম্মুকে নিতে। দেখতাম ওর চাঁদমুখপানা। অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে নাজনীনের নিরন্তর পিছুটান ছিল মেয়ের জন্য। মাঝে মাঝে হেসে বলতো, জানেন আপু মেয়ে না অফিসে আসার আগে পা জড়িয়ে ধরে রাখে …যেন কোনভাবে আসতে না পারি…। ওর হাসির মধ্যে এক ধরনের বেদনা লুকিয়ে থাকতো।

চন্দ্রমুখী এখন আর তার কচি হাত দিয়ে চাপা ফুলের মতো আঙ্গুল দিয়ে আটকে দেয় না মায়ের বাইরে যাওয়া। সে এখন টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টারের মতো অনেক দূরের  নক্ষত্র।

তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার সন্তান

বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে; যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,

…………….

কখন মরণ আসে কে জানে- কালীদহে কখন যে ঝড়

কমলের নাল ভাঙে-ছিঁড়ে ফেলে গাঙচিল শালিখের প্রাণ

কেমন যেন বিষন্নতার রাগিনী বাজছে চারদিকে। ভায়োলিনের এক অদ্ভুত মনকাড়া সুর ব্যাথায় বেদনায় জর্জর করে তুলেছে প্রকৃতিকে। কেন এভাবে দুমড়ে মুচড়ে গেল নাজনীনের চিরচেনা পৃথিবী!

চন্দ্রমুখী চলে যাওয়ার কয়েক মাস আগেও একবার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তখনই ওকে শেষ দেখেছিলাম। পাখীর মতো একটা মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। নাজনীন কত মমতা ভরে মেয়ের ঠোঁটে গ্লিসারিন লাগিয়ে দিচ্ছিল। সেই মমতার বাঁধন ছিঁড়ে পাখী উড়ে চলে গেল একদিন।

নাজনীনের প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল, ওর জীবনে এমন ভয়ংকর কোনকিছু ঘটবে না। তাইতো মেয়ের মৃত্যু কোনভাবে মেনে নিতে পারিনি। চন্দ্রমুখী চলে যাবার আগের দিন হাসপাতালে নাজঈনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। ওইদিন ডাক্তাররা তাদের রিপোর্টে সব কিছু স্টেবল বলে উল্লেখ করেছিল। নাজনীনও বিশ্বাস করতো ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু। তারপরের দিনই ঘটতে লাগলো একের পর এক দুর্যোগ। চন্দ্রমুখীর মৃত্যু। তারপর সেই তীব্র শোক সামলাতে না পেরে নাজনীনের আত্মহত্যার চেষ্টা।

সৃষ্টিকর্তা নাজনীনকে ফিরিয়ে দিল। শুরু হলো ওর সেরে ওঠার সংগ্রাম। কিন্তু আগুনের দিন যেন শেষ হবার নয়।

নাজনীন যখন অপেক্ষা করছিল আরেক চন্দ্রমুখীর ফিরে আসার, তখন কাছের মানুষ হয়ে গেল অচেনা। সে তখন পুরনো সৈকত ছেড়ে নাও ভিড়িয়েছে নতুন বন্দরে।

‘জরায়ু ত্যাগের আগে বিস্তীর্ণ আলোকে এসে শিশু

সৃষ্টির সদর্থ বোঝে, নিজস্ব পিপাসা, ক্ষুধা পায়

অন্ধকারের সীমা ছেড়ে, চেয়ে দ্যাখে, আরো পরিসীমা

আকাশের নীলে, চাঁদে, নক্ষত্রের আহবানে নিহিত’

সেদিন ফোন করেছিলাম নাজনীনকে। ওর সেই কোমল-স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর। তবু হাজার মাইল দূর থেকে ওর বুকের গভীরে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস ঠিকই কানে বাজে। ‘যে আসছে তার বাবাও আমি, মাও আমি। তাই আমাকেই তো ভাবতে হবে সব কিছু।’ অনাগত শিশুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন কাটছে নাজনীনের দিনলিপি। বড় বেশী ত্যাগ করতে হল নরম এই মেয়েটাকে। এক জীবনে এত কষ্ট ওর প্রাপ্য ছিল না।

‘মাংকিজ প’ বা ‘বানরের থাবা’ নামে একটা গল্পের কথা অনেকদিন আগে কোথায় যেন উল্লেখ করেছিলাম। নাজনীন সেটা পড়ে আমাকে বলেছিল, জানেন আপু, গল্পটা আমিও পড়েছি। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পরে আপনার লেখা পড়ে মনে পড়ল। আর শিউরে উঠলাম।ইশ্‌ কি ভয়ংকর। মানুষের জীবনে এরকম যেন কোনদিন না হয়!

গল্পটা এমন ছিল, এক বৃদ্ধ দম্পতিকে একটি বানরের থাবা দিয়েছিল রহস্যময় এক আগন্তুক। ওই থাবা হাতে করে তিনটি ইচ্ছা পূরণের সুযোগ ছিল। বৃদ্ধ দম্পতি অনেকে ভেবে চিন্তে বিশাল অংকের একটা অর্থ পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তারপরের দিনই কারখানার মেশিনে আটকে মারা যায় বৃদ্ধ দম্পতির একমাত্র পুত্র। সন্তানের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষ ওই বিশাল অংকের টাকা দেবার ঘোষণা দেয় বাবা-মাকে।

নাজনীন, তুমি তো অনেক দিয়েছ। এবার তোমার নেবার পালা। প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর নয়। অনেক প্রতিদান জমা আছে তোমার জন্য। ফিরে এসো নাজনীন। ওয়াদারিং হাইটসের র‌্যাডক্লিফের মতো অসাধারণ প্রত্যাবর্তন হোক তোমার। মেধা আর মননের বিচ্ছুরণ দিয়ে আলোকিত করো চারদিক। ফিরে এসো আগুন হয়ে। ফিরে এসো দাবানল হয়ে….

‘আমি ঢালিবো করুণাধারা, আমি ভাঙ্গিব পাষাণকারা

আমি জগত ব্যাপিয়া, বেড়াবো গাহিয়া, আকুল পাগল পারা

কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া, রামধনু আঁকা পাখা উড়াইয়া,

রবির কিরণে দিবরে পরাণ ঢালি

শিখর হইতে শিখরে ছুটিব, ভুধর হইতে ভুধরে লুটিব

গেয়ে কলকল, হেসে খলখল, তালে তালে দেব তালি….

নাজনীন, তোমাকে এভাবে জেগে উঠতে হবে। তোমার জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন। নজরুল লিখে গেছেন…

‘আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেনি

তন্বীর চোখে বহ্নি’

নাজনীন তুমি একা নও, সবাই আছে তোমার চারপাশে

মনিজা রহমান : লেখক ও সাংবাদিক ([email protected])

(লেখাটি এর আগে সমকাল এ প্রকাশিত হলেও এখানে বিস্তারিতভাবে দেয়া আছে পুরো লেখাটা)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.