সাহেরা কথা-১৭

Bangali nari
ছবিটি প্রতীকী

উইমেন চ্যাপ্টার: একাকি জীবনে কতজন সাহেরার কথা লেখা হবে? এই লেখার তো কোনো শেষ নেই। সম্পর্কগুলো বড় অদ্ভুতভাবে একে-অন্যকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে চায়, কোথাও বন্ধন থাকে, কোথাও বা অবন্ধনই নিয়ম হয়ে উঠে।

নাম তার জানা হয়নি কখনও। সানির মা হিসেবেই পাড়ায় পরিচিত। আমি ডাকি খালা বলে, আমার ছেলেও খালা ডাকে। উনিও আমাকে খালা ডাকেন, আর ছেলেকে ডাকেন ‘ভাইয়া’ বলে। আমিও কখনও জানতে চাইনি রক্ত-চামড়ার মানুষটার নাম বলে একটা পোশাকি পরিচয় আছে। তাকে জেনেছি মানুষ হিসেবে, অসাধারণ মায়া-মমতায় ঘেরা একজন গৃহকর্মী, কাজ করেন বিভিন্ন বাসায়। পাড়ার মানুষজন ঠাট্টা করে তাকে বলে ‘ইস্পাত দিয়ে তৈরি মেয়েমানুষ’। আমি সেটার আধুনিকায়ন করে দিয়েছি ‘ইস্পাত লেডি’ বলে। সত্যিই তাই।

বয়স কত হবে, ৪৩-৪৪-৪৫ বছর! এর চেয়ে বেশি নয়। যেহেতু ‘যুদ্ধের’ সময় তিনিও কোলে ছিলেন, ওভাবেই বয়সটা আন্দাজ করে নিই আমি। ঋজু দেহ, এতোটুকু মেদ বলতে কিছু নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে ছয় তলা উঠছেন দিনে ১০ থেকে ১২ বার, ক্লান্তি নেই, হাঁফিয়েও উঠেন না। কখনও কোনো কাজে তার না নেই।

পাড়ার মানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় এই সানির মা আজ চলে গেছেন। স্বামী দারোয়ানের কাজ করতেন, আর খালা নিজে তিনটা-চারটা বাসায় দিনভর কাজ করে গ্রামে মাথা রাখার জায়গা করেছেন। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় তার বাড়ি, যেখানে তার এতোদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা একটা বিশাল টিনের ঘর আছে, ভিটেটা উনি সিমেন্ট দিয়ে পাকা করেছেন, বাকিটা টিনের। স্বপ্নের বাড়ি, জমি আছে ৪০ কাঠার মতোন। সারা বছরের খোরাকি দিয়েও ধান বিক্রি করতে পারেন।

এর আগেও প্রতিবার বাড়িতে যাওয়ার সময় তিনি ‘নিজের বাড়ির’ জন্য, ‘নিজের সংসারের’ জন্য নতুন হাড়ি-পাতিল, স্টিলের বাসন-কোসন কিনে নিয়ে গেছেন। আমার সঙ্গে প্রায়ই মীনা বাজারে গিয়ে এটা-সেটা নেড়ে-চেড়ে দেখতেন, আমি তাকে বলেছি, এসবই আমি নিউমার্কেট থেকে আপনাকে কম দামে কিনে দেব। আমারও সময় হয় না, উনাকেও কিনে দেয়া হয় না। পরে নিজের ঘর থেকেই দিয়ে দিই এটা-সেটা সংসারের হাবিজাবি জিনিসপত্র।

প্রতিবারই বাড়ি থেকে ফিরে বলতেন, ‘ঢাকায় আইলে পড়ে শকুনের চোক পড়ে বাড়ির উফরে, চুরি কইরা লইয়া যায় সব মালপত্র’। তাই তিনি সেবার বাড়ি গিয়ে একটা ট্রাংক কিনে সেখানে তালাবন্ধ করে এসেছেন তার ‘সম্পদটুকু’। সংসারের দিকে অসম্ভব ঝোঁক খালার। বাড়িতে তিন ছেলে থাকে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, আর তার স্বামী, যাকে আমি চাচা বলে ডাকি, সেই তিনিও আগেও বাড়ি চলে গেছেন। ঢাকায় আর থাকবেন না, এমন ঘোষণা তারা দিয়েছিলেন বেশ অনেক আগেই। কিন্তু আমাদের মতোন লোকজনের চাপে পড়ে খালাকে বার বার চলে আসতে হয়েছে ঢাকায়।

যে বাড়িতে তার স্বামী দারোয়ান ছিলেন, সেই বাড়িওয়ালার ছেলে থাকেন মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। শেখেরটেক থেকে ৩০ টাকা রিকশা ভাড়া। প্রতিদিন খালাকে ৬০টাকা ভাড়া দিয়েই সেই বাসায় নিয়ে যাওয়া হতো কাজের জন্য, এতোটাই ভালবাসা কুড়িয়েছেন তিনি। কেউই ছাড়তে নারাজ।

শেখেরটেকেরই আরেকটি বাসায় তিনজন চাকুরিজীবী ছেলে থাকেন, তাদের রান্না করেন। খালা বাড়ি চলে গেলে এই তিনজন প্রতিদিন খাবার কিনে খান, কোনো কোনদিন না খেয়েও থাকেন। আমার অবস্থাও হয়ে পড়ে সঙ্গীন। বাসায় ফিরে খালার মুখটা না দেখলেই ভিতরটা হাহাকার করে উঠে। কত কথা যে বলি দুজনে, কখনও তিনি বলে চলেন, আমি শ্রোতা, কখনও আমি বলি, উনি শোনেন। উনার ঘরভরা মায়াময় সংসার থাকলেও, ঠিকই পালস বোঝেন আমার। গত এক বছরেরও বেশি সময়ে তিনি আমার সবটুকু মন জয় করে নিয়েছেন। জয় করেছেন আমার বিড়াল ‘হ্যাপির’ মনও।

খালার চলে যাওয়া মানে একসঙ্গে তিনটা বাড়ি অচল হয়ে পড়া।শুধুমাত্র হ্যাপিকে দেখে রাখার জন্যই বাড়ি চলে গিয়েও আবার ফেরত এসেছিলেন খালা। প্রতিদিন আমাকে মিস কল দিতেন হ্যাপির খবর দেয়ার জন্য, কবে আসবো, কী রান্না করে রাখবেন, সব খবর তিনি দিতেন। ১৫ দিন পর বাসায় ফিরে দেখি আমার ঘর চকচক করছে, সব ধুয়ে-পরিস্কার করে রেখেছেন খালা।

আজ চলে গেলেন, হয়তো আর ফিরবেন না তিনি। নিজের সংসারে ফিরছেন, তার এই আনন্দ আমি নষ্ট করি কি করে? যাওয়ার সময় কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল করে ফেলেছেন, চোখের জলের ভারে মাথা তুলে মুখের দিকেও তাকাতে পারেননি। আমার জন্য এতোটাই মায়া ছিল তার। বলতেনও। বলতেন, ‘আফনের লাইগাই জ্বালাডা বেশি, বার বার আইয়া ফরি তো আফনের কারণেই’।

এবারও যদিও বলে গেছেন, কোনো অসুবিধা হলেই ‘খবর দিবেন, আইয়া পড়বাম’, আমি বলি, ‘আমার তো এহনই অসুবিধা, যাইয়েন না’। চাচা নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে ফোন করতে গিয়ে গলা ধরে আসে। চাচা জানতে চান, আমি কাঁদছি কিনা। উত্তর না পেয়ে বলে চলেন, ‘খালা, অন্তরটা খুইলা দেখাইতে পারলে বুঝতেন, আফনের লাইগা কতডা মায়া পড়ছে, কিন্তু উফায়ও নাই, গ্রামের লুকজন খারাপ কয়, তারা কয়, বউরে ডাহাত (ঢাকায়) রাইখা আইছি ক্যারে’।

আমার গলা ধরে আসে, চোখ বেয়ে জল টপ টপ করে ঝরে পড়ে।

বলতে পারি না, হৃদয়টা কতটা খালি হয়ে গেল খালার চলে যাওয়াতে। কত মানুষই তো ঢাকার বাসায় কাজ করেন, আমার এখানেও করেছে, হয়তো আবারও কেউ না কেউ করবে, কিন্তু এমন ‘খালা’ কয়জন হয়? মনটা এমন খালি করেই বা যেতে পারে কজন?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.