ধর্ষণ প্রতিরোধে করণীয় যা হতে পারে

Sina Akhter
সীনা আক্তার

সীনা আক্তার: প্রায় প্রতিদিন নারী ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে যা আশঙ্কাজনক। নারী-কিশোরী ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা – এসব যৌন সহিংসতায় সচেতন সকলেরই উদ্বিগ্ন হবার কথা। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতার তুলনায় এর থেকে পরিত্রাণের কোন তৎপরতা তেমন দেখা যাচ্ছে না, যা নারীদের জন্য আতঙ্কের ব্যাপার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন, এই ছয় মাসে সারাদেশে ৩০৪ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮২ জন, ৫৭ জনকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ৪৫ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী একই সময়ে ৩০৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৭ জন আত্মহত্যা করেছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এই পরিসংখ্যানের বাইরে আরো অনেক ঘটনা আছে যা অপ্রকাশিত, প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনা নেই। অনেক কারণে ধর্ষণের মত অপরাধ অগোচরে থেকে যায় বা বিচার প্রক্রিয়ায় আসে না। যেমন, লজ্জা এবং ভূক্তভোগীর প্রতি সমাজ-সংস্কৃতির নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী; ধর্ষকের হুমকী এবং নিরাপত্তার অভাব; পরিবার এবং বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের থেকে যথেষ্ট সহানুভূতি-সহযোগিতার অভাব; শিক্ষা-সচেতনতার অভাবে ভুক্তভোগী নিজেই ধর্ষণের ঘটনাকে অনুধাবন করতে না পারা, যেমন প্রেমিক দ্বারা ছলনামূলক যৌন সম্পর্ক, বাল্যবিবাহে তথাকথিত স্বামী কর্তৃক শারীরিক সম্পর্কএবংপুরুষ কর্তৃক ছেলে শিশু-কিশোরের সাথে যৌন সম্পর্ক ।

সেইসব ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয় যখন:বিবাহিত-অবিবাহিত যে কোন অবস্থায় নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে; নারীর অনুমতি ব্যতীত; আঘাত-ভয় দেখিয়ে অনুমতি গ্রহণ, বিয়ে হবে/করবে এই প্রলোভনে অনুমতি গ্রহণ এবং ১৪ বছরের কম বয়সী নারীর সাথে সম্পর্ক – অনুমতি থাকুক বা না থাকুক। একইভাবে, পুরুষ দ্বারা পুরুষ/ছেলে শিশু-কিশোরের সাথে যৌন সম্পর্ক। ধর্ষণের বিস্তাররোধ করতে মূলত দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, এক. ধর্ষণ প্রতিরোধ করা এবং দুই. ধর্ষকের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। আমার মতে প্রতিরোধ হচ্ছে সর্বত্তম পন্থা।

ধর্ষণ প্রতিরোধ

যে কোন পরিস্থিতিতে নিরাপদে থাকা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রথমত ব্যক্তির নিজের। তবে এ জন্য ব্যক্তিটির বা নারীর প্রয়োজনীয় সচেতনতা, শারীরিক এবং মানসিকভাবে যথেষ্ট সক্ষমতা থাকতে হবে। আর এই সচেতনতা এবং সক্ষমতা তৈরী করার দায়িত্ব পরিবার, স্কুল, সংশ্লিষ্ট সরকারী বিভাগ এবং বেসরকারী সংগঠনসমূহের। বিশেষভাবে, আত্মবিশ্বাসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার দক্ষতা তৈরী হয় পরিবার এবং স্কুলের সঠিক শিক্ষায়।

কারণ এ সবগুণাবলীর বিকাশ ঘটে ছোটবেলায় কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ বিষয়গুলি কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় জানি না। যৌন সহিংসতা, এর নেতিবাচক প্রভাব, শাস্তি এবং করণীয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং সচেতনতা প্রাক-কৈশোর ছেলে-মেয়েদের থাকা জরুরী, কারণ সচেতনতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে। এই বয়সেইপরিবারে এবং স্কুলে ‘লিঙ্গের ভিন্নতা/যৌনতা এবং সম্পর্ক’ (Sex and relationship)বিষয়ে ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদান সময়ের দাবী। এতে সুস্থ সম্পর্ক বিষয়ে ধারনা এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্মান-সহানুভূতি তৈরী হয়।

‘লিঙ্গের ভিন্নতা এবং সম্পর্ক’বিষয়ে শিক্ষাদানের অনেক ইতিবাচক দিকের মধ্যে একটা হচ্ছে যৌন সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন রোধ করা। আরো একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে নারীর শারীরিক সক্ষমতা। বিপদজনক পরিস্থিতিতে প্রথম করণীয় হচ্ছে দ্রুত স্থান ত্যাগ করা,কিন্তু আমাদের কিশোরী-নারীরা কি তেমন দৌড়াতে পারেন? নিয়মিত শরীরচর্চায় কেবল একজন দৌড়ানোর দক্ষতা অর্জন করতে পারে। স্কুলে শরীরচর্চা শিক্ষায় কিশোরীদের জন্য কি নিয়মিত কোন শারীরিক খেলাধুলা যেমন দৌড়ানো, ফুটবল, ক্রিকেট এর ব্যবস্থা আছে? শারীরিক সক্ষমতা সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন আবশ্যক, একইভাবে তা আত্মরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই স্কুলের পাঠ্যসূচীতে আত্মরক্ষামূলক বিষয় থাকা জরুরী, যেমন কারাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এ সবই আত্মবিশ্বাস উন্নয়নে সহায়ক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোরীদের স্কুল এবং পরিবার থেকে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরশীলভাবে অবস্থান নিতে তেমন উৎসাহ দেয়া হয় না। বরং পরোক্ষভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, প্রায়ই দেখা যায় নিরাপত্তার নামে মেয়েদের সার্বক্ষনিক অতি নিরাপত্তা এবং অতি রক্ষণশীল বলয়ের মধ্যে থাকতে হয়, পরিবার থেকে মেয়েকে সাধারনত বাড়ীর বাইরের কোন কাজে পাঠানো হয় না, একা বাড়ীর বাইরে যেতে বারন করা হয়ইত্যাদি। এই অতি নিরাপত্তায় (Over protection) মেয়েরা যথেষ্ট আত্মনির্ভরশীল হতে পারে না, ফলে অনেকবাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে শিখতে পারে না। বাড়ীর বাইরে হয়তো নিরাপত্তার ঝুকি আছে কিন্তু তা কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে ধারনা থাকা এবং প্রস্তুত থাকাটা বেশী জরুরী। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যক্তির করণীয়সমূহ:

– প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনা হবার সম্ভাবনা আছে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা যেমন, অপরিচিত ব্যক্তি, অনিরাপদ/নিরিবিলি স্থান। পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তির যৌন উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে চেষ্টা করা এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া।

-আস্থাশীল বন্ধু তৈরী করা এবং দলে চলাফেরা করার চেষ্টা করা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। একা চলার ক্ষেত্রে যদি মনে হয় কেউ পিছু নিয়েছে বা অনুস্মরণ করছে তাহলে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে নিরাপত্তার জন্য কাছাকাছি যেখানে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী, বেশী মানুষের সমাগম আছে সেখানে অবস্থান নেয়া এবং সাহায্যের আবেদন করা। ফোনে, টেক্স করে সাহায্য চাওয়া।

– বিপদজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রস্থান করা, দৌড়ানো এবং যত জোরে সম্ভব চিৎকার করে আশে পাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করা।

– ইলেকট্রনিক বিপদসঙ্কেত যন্ত্র (Personal Attack Rape Alarm) বা বিশেষ বাশিঁ বহন করা যা উচ্চশব্দে আওয়াজ তৈরী করতে পারে এবং প্রয়োজনে তা কাজে লাগানো।

– মরিচ গুড়ো/ঝাঁঝালো স্প্রে, প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষামূলক হাতিয়ার সঙ্গে রাখা এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা।

-বিপদে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করা। যেমন, আক্রান্ত হবার আগেই চাবির গোছা, ব্যাগ বা হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে আক্রমণকারীকে আঘাত করা, কারাতে কৌশল জানা থাকলে তা প্রয়োগ করা ইত্যাদি। পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য সবসময় বিকল্প পরিকল্পনা করা।

নারীর আত্মরক্ষার জন্য সরকার থেকে বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে মরিচ গুড়ো/ঝাঁঝালো স্প্রে এবং বিপদসঙ্কেত যন্ত্র/বিশেষ শব্দযুক্ত বাঁশীর ব্যবস্থা করা জরুরী মনে করি। এসব হাতিয়ার যেন অপব্যবহার না হয় সে বিষয়ে ব্যবহারকারীকে সচেতন করা আইন শৃংখলা বাহিনীর দায়িত্ব।

ধর্ষণ পরবর্তী করণীয় এবং বিচার

ধর্ষণের শিকার নারীকে সহানুভূতির সাথে সহযোগিতা করা একটা মানবিক দায়িত্ব। কারণ ধর্ষণ নারীর দোষে ঘটে না, বরং ধর্ষক একজন ভয়ংকর অপরাধী। এজন্য ভূক্তভোগীর শারীরিক ওমানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে এবং আইনী সহযোগিতা পেতে আত্মীয়, বন্ধু এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর পক্ষ থেকে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। এ সময় যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার চাপ সহ্য করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে যা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করতে পারে। জীবন অনেক মূল্যবান, তাছাড়া আত্মহত্যা কখনো সমস্যার সমাধান না। সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক চাপের কারণেওঅনেক সময় ভূক্তভোগীর মানসিক বিপর্যয় ঘটে, ফলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা দুরূহ  হয় এবং এই সুযোগে অপরাধী পার পেয়ে যায়। এ বাধা দূর করতে ধর্ষণের শিকার নারীর কঠোর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করা অতি জরুরী। তাঁর পরিচয়মূলক তথ্য (Identical information) কখনোই প্রকাশ করা যাবে না। মিডিয়াসহ কেউ তা প্রকাশ করলে তার কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, প্রয়োজনে গোপনীয়তার আইন সংশোধন করে কঠোর করতে হবে। নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত হলে ভূক্তভোগী স্বস্তির সাথে বিচারের জন্য, শারীরিক ক্ষতি এবং মানসিক বিষন্নতা দূর করতে সাহায্যপ্রার্থী হবে। বলাইবাহুল্য, অপরাধীর বিচার এবং শাস্তি প্রদান ধর্ষণ নামক যৌন সহিংসতা রোধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু ভূক্তভোগীর জীবনে ধর্ষণের তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক-মানসিক-সামাজিক প্রভাবের তুলনায় প্রচলিত শাস্তির ধরন আমার যথেষ্ট মনে হয় না। অপরাধীর জন্য শাস্তির ধরনে পরিবর্তন দরকার মনে করি। যেমন, ‘পরিচয় এবং লজ্জা’ (Name & shame)এর আলোকে শাস্তির ধরন নির্ধারন করা উচিৎ, যাতে ধর্ষণকারী তার অপরাধের ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারে, সামাজিকভাবে ঘৃণিত হয়, এবং তাকে দেখে অন্যরা এই অপরাধ থেকে বিরত থাকে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বিচারে অভিযুক্ত ধর্ষণকারী, ধর্ষণ চেষ্টাকারী এবং যে কোন যৌন নিপীড়নকারী শাস্তি হিসাবে একটা ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন করবে।

উন্নত দেশে অপরাধীদের চলাফেরা নজরদারীর জন্য এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। ধর্ষণকারীর জন্য ডিভাইসটিতে বিশেষ শব্দ যুক্ত থাকবে এবং ডিভাইসটি হাত ঘরির মত ব্যবহার করতে হবে, যা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী তালাবদ্ধ করে দেবেন। এ ডিভাইস থেকে সবসময় শব্দটি সৃষ্টি হবে, যাতে নারীরা এই বিশেষ শব্দে সাবধান হয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারেন। চিহ্নিত অপরাধী হিসাবে সে সমাজে ঘৃণিত হবে। প্রচলিত ডিভাইসে শব্দ যুক্ত করে রূপান্তর করা খুব কঠিন হবার কথা না, আশা করি আমাদের প্রযুক্তিবিদরা এই কাজটি করতে পারবেন। কম্পিউটার দ্বারা তদারকি করা ডিভাইসটি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অফিস থেকে তদারকি করবেন। শুধুমাত্র রাত্রে ঘুমানোর সময় ডিভাইসটির শব্দ বন্ধ করা হবে অথবা ঘুমের সাথে সাথে ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে।

এটা একটা প্রস্তাব মাত্র, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। এ ডিভাইস বহনকারী পুনরায় যৌন সহিংসতা বা যৌন নিপীড়নের মত অপরাধ করলে তাকে প্রচলিত সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করতে হবে।

একটা সমন্বিত কর্মসূচী এবং তৎপরতার মাধ্যমেই ধর্ষণের মত অপরাধ কমানো বা রোধ করা যেতে পারে। এর জন্য দরকার সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা। সামাজিকভাবে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ধর্ষকের প্রতি সর্বোচ্চ ঘৃণা সৃষ্টি এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে ভূক্তভোগী, পরিবার, স্কুল, আইন শৃংখলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সকলকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকেই সক্রিয় হতে হবে।

০৮.০৯.২০১৪

 

ড. সীনা আক্তার। প্যারেন্টিং পেশাজীবী।

 

শেয়ার করুন:
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.