আরশিতে কাকাতুয়া-৩

Moinus
মঈনুস সুলতান

মঈনুস সুলতান: মাস খানেকের ভেতর প্রেমজাই এর জীবনে মোড় ফিরলো। কীভাবে যেন তারও জুটলো একজন বয়ফ্রেন্ড। চাছাছোলা মস্তকের পুরুষটি বারান্দাঅলা হ্যাট পরে এসে হাজির হতো দিনদুপুরে। রাতবিরাতে আমি চিলেকোঠা থেকে নেমে করিডোরের কোণার কমন বাথরুম ব্যবহার করতে গেলে চোখে পড়তো প্রেমজাই এর বয়ফ্রেন্ড সানগ্লাস পরে ছায়ামূর্তির মতো টাকিলার বোতল আর লেবু হাতে যাচ্ছে কিচেনের দিকে।

একদিন ভোরবেলা মই বেয়ে নামতেই দেখি জাম্পেস কাউচে দৈহিকভাবে অন্তরঙ্গ হয়ে বসে আছে প্রেমজাই ও তার পুরুষবন্ধু। আমি চোখ ফেরাতে গেলে প্রেমজাই ‘ওয়েট অ্যা মিনিট’ বলে উঠে কার্পেটে পড়ে থাকা ড্রেসিং গাউন তুলে কাঁধে জড়িয়ে কোমরে ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বলে, আই লাইক ইউ টু মিট মাই বয়ফ্রেন্ড।

তো আমি হাত-টাত মিলিয়ে পরিচিত হই তার পুরুষবন্ধু হেক্টরের সাথে। তার উর্ধাঙ্গ আদুল, লোমভরা বুকে অসংখ্য কাটাকুটি ও জখমের দাগ। ইংরেজী সে বলে খুবই সামান্য। তবে আমাকে আন্তরিকভাবে টাকিলা পানের আমন্ত্রণ জানায়।

জানতে চায় কি কাজ করি? মাস্টার্স প্রোগ্রামের ছাত্রত্ব ছাড়া আমি মূলত বেকার জানতে পেরে মেক্সিকো থেকে ফার্ম ওয়ার্কার হিসাবে আগত হেক্টর চুকচুক করে আপসোস প্রকাশ করে। বলে, চলে এসো আমার সাথে, ফার্মে আপেল কুড়াবে, ঘন্টাওয়ারী মাইনা এরা মন্দ দেয় না। আমি রাজি না হলে হেক্টর একটু হতাশ হয়ে টিপয়ের তলা থেকে টেনে বার করে ছোট্ট একটি পিঞ্জিরা। তার আগল খুলে দিয়ে ঠোঁট সুঁচালো করে শিস দিতেই ডানা ঝটপটিয়ে খানিক উড়ে এসে তার কাঁধে বসে বর্ণিল একটি পাখি। প্রেমজাই উৎসাহের সাথে ধুসরে সাদাটে হলুদ মাখানো খেচরের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়।

এটি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান কাকাটিয়েল। জুটিঅলা কাকাতুয়ার চোখের নিচে অরেঞ্জ বর্ণের দুটি কিউট বৃত্ত। পাখিটি হেক্টরের কাঁধ ছেড়ে উড়ে এসে ল্যান্ড করে প্রেমজাইয়ের ড্রেসিং গাউনের ঢোলা পকেটে। ওখানে পা রেখে সে বোতাম খুঁটতে শুরু করলে, আমি তাদের গুডবাই বলি। সিঁড়ি ধরে একতলায় নেমে আসতে আসতে কেন জানি একটু ঈর্ষা হয়। কিন্তু হেক্টরের সাথে পাল্লা দিতে গেলে আমাকে গলায় গোখরা সাপ প্যাঁচিয়ে ঘোরাফেরা করতে হয়। সে যোগ্যতা আমার নেই, তার নীরবে কপাট খুলে নেমে আসি ফুটপাতে।

কিছুদিনের মধ্যে প্রেমজাই লেখাপড়াতে আগ্রহ হারায়। নন-ডিগ্রি কোর্সের ক্লাসগুলোতে সে আর রেগুলার এটেন্ড করছে না। মাঝে মাঝে দুপুরবেলা বাড়ি ফিরলে দেখি সে কিচেনে রান্নাবান্না করছে, আর বারস্টুলে সানগ্লাস পরে বসে হেক্টর,কাকাতুয়াকে সে খাওয়াচ্ছে একটি দুটি করে সূর্যমুখি ফুলের বীজ। প্রেমজাই আমার সাথে আর কথাবার্তা তেমন বলে না। তবে ভালোমন্দ কিছু রান্না করলে বিড়ালকে খাবার দেবার মতো করে চিলেকোঠার দোরগোড়ায় রেখে যায় এক বাটি থাই গ্রীনকারি, বা তম-ইয়াম-কুঙ বলে চিংড়িমাছের স্যুপ, সাথে পিরিচে একদলা জেসমিন রাইস।

হেক্টর সপ্তাখানেকের জন্য মেক্সিকো সিটিতে ফিরে গেলে কাকাতুয়ার কাস্টডি পায় প্রেমজাই। কিন্তু সপ্তা তিন গড়িয়ে মাস খানেক হতে চললো হেক্টর আর ফিরলো না। সে কোন ঠিকানা বা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে যায়নি যে প্রেমজাই তার সাথে যোগাযোগ করে জেনে নিতে পারবে তার হয়েছে কি?

তো কাকাতুয়া প্রেমজাই এর সাথেই আছে। সে শিখে নিচ্ছে একটি দুটি থাই শব্দ বা বাক্য। একাকী উড়ে বেড়ায় দোতালার সর্বত্র। প্রেমজাই আজকাল জাম্পেস কাউচে বসে থাকে বিষন্ন। মিনি বুমবক্সে সে অহরহ শুনে আলবার্ট থংচাই বলে এক থাই পপ সিংগারের লিরিক। টেবিল ল্যাম্পের শেডের প্রান্তে বসে মৃদু সিঙসঙ স্বরে কাকাতুয়া অণুকরণ করে থাই গায়কের সেরেনাদ। আমি পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে ‘ওয়েট অ্যা মিনিট’ বলে আমাকে দাঁড় করিয়ে সে পাখিটি দেখিয়ে বলে,‘ইজ নট হি অ্যা ডার্লিং বার্ড?’ ‘অবকোর্স হি ইজ’ বলে আমি সায় দিলে সে উৎসাহিত হয়ে বলে,‘আমি তার নাম দিয়েছি পাকপাও। থাই ভাষায় পাকপাও এর অর্থ হচ্ছে ঘুড়ি। সারাক্ষণ উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে তো।’ কাকাতুয়াটি যেন তার কথা বুঝতে পেরেছে এমন ভঙ্গিতে গ্রীবা বাঁকা করে থাই ভাষায় বলে,‘কবচাই জিং জিং’ বা ‘থ্যাংক ইউ ট্রুলি’। পাখির পাঁকামিতে প্রেমজাই হেসে ফেলে ফিক করে।

পরদিন এরকম করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছি। প্রেমজাই আবার আমাকে থামায়। বলে, ‘লুক পাকপাও চমৎকার একটি ট্রিক শিখেছে।’ বিষয় কি? পাখি আবার কি শিখলো? প্রেমজাই কাঠের সুদর্শন কারুকাজ করা ফ্রেমের একটি আয়না তুলে ধরে। আয়নাটির নিচের দিকে মেকাপের টুকিটাকি রাখার জন্য ছোট্ট একটি ট্রে আটকানো। ‘কিস দ্যা বার্ড ইন দি মিরর’ বলতেই পাকপাও ট্রে তে পা রেখে বসে আরশিতে তার প্রতিবিম্ব মনযোগ দিয়ে দেখে। খানিক নিরিখ করে সে অবশেষে প্রতিবিম্বের ঠোঁটে রাখে তার ঠোঁট। প্রেমজাই খুশি হয়ে তাকে কয়েকটি সূর্যমুখি ফুলের বীজ খেতে দেয়।

হেক্টর আর ফিরে আসেনি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেমজাই এর বসবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে আসে। সে টোফেল পরীক্ষায় চতুর্থ বারের মতো অসফল হয়েছে। তার ভিসা এক্সটেনশন হচ্ছে না। আর এখনই ব্যাংকক রিটার্ণ গেলে আগে যেখানে সে চাকরি করতো তাও হয়তো ফিরে পাওয়া যেতে পারে। খুব দোলাচলের ভেতর এক সন্ধ্যায় সে মই বেয়ে উঠে আসে চিলেকোঠায়। পিরিচে করে সে নিয়ে এসেছে সে শুকনা ঝরা গোলাপের পাপড়ি। লাল গোলাপটি হেক্টর তাকে দিয়েছিল। শুকনা পাপড়িগুলো সিল্কের রুমালে প্যাঁচিয়ে পুটলি বাঁধতে গিয়ে প্রেমজাই আকুল হয়ে কাঁদে। সে ফিরে যাচ্ছে ব্যাংককে দিন তিনেক পর। এ শুকনা কটি পাপড়ি ছাড়া তার কাছে হেক্টরের আর কোন স্মৃতিই থাকবে না।

একটি সমস্যা দেখা দেয় কাকাতুয়া পাকপাওকে নিয়ে। তাকে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি প্রেমজাইকে পরামর্শ দেই প্যাটস্টোরে গিয়ে হয় পাখিটিকে বিক্রি করে দিতে, অথবা খুঁজে দেখতে জানাশোনা কেউ যদি পাকপাও’কে দত্তক নিয়ে লালন-পালন করতে রাজি হয়। এ দু প্রস্তাবের কোনটাতেই প্রেমজাই রাজি হয় না। সে কেঁদে বলে, তার ধারনা কিছুদিন পর হেক্টর ফিরে আসবে। আর পাকপাও এর সন্ধানে এ বাড়িতে তার ফিরে আসা খুবই যুক্তিসঙ্গত। তার দাবি আমি কিছুদিন পাকপাও এর তত্ত্বতালাবি করবো, ইতিমধ্যে হেক্টর ফিরে আসলে পাখিটি তাকে ফেরত দেবো। আমি নিমরাজি হই।

তখন প্রেমজাই আমাকে কাঠের কারুকাজ করা আয়না দেখিয়ে বলে পাকপাও আয়নায় মুখ দেখতে ও প্রতিবিম্বের পাখিকে চুমো খেতে খুবই ভালোবাসে। আমি যেন প্রতিদিন দুতিন বার আরশিতে পাকপাও এর মুখ দেখার ব্যবস্থা করি। এতে কাকাতুয়ার মন ভালো থাকবে।

এ প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে প্রেমজাই এর কাছে আয়নাটি চাইলে সে বলে, ‘সরি, এ আয়নাটি আমি আমার দিদি মা’র কাছ থেকে উপহার হিসাবে পেয়েছি। এটি তোমাকে দেয়া যাচ্ছে না। তবে শহরের একটি দোকানে সাউথ ইস্ট এশিয়ান আর্ট অবজেক্ট বিক্রি হয়। ওখানে এ ধরনের আয়না আছে কয়েকটি। তুমি কাইন্ডলি একটি কিনে নিও। তুমি কি আমার পাকপাও এর জন্য একটি থাই স্টাইলের আয়না কিনতে পারবে না? আই অ্যাম রিয়েলি সরি, দিদিমা’র কাছ থেকে পাওয়া আয়নাটা যে দিতে চাচ্ছি না।’ তো আমি অবশেষে একটি আয়না কেনার প্রতিশ্রুতিতে রাজি হই।

মাস দুই কেটে যায়। হেক্টর ফিরে আসেনি। তবে কাকাতুয়া পাকপাও এর সাথে আমার বন্ধন গাঢ় হয়েছে। এখন সে অবলীলায় আমার হাতে বসে তালু থেকে খুঁটে খায় সূর্যমুখি ফুলের বীজ। মাঝে-সাজে পাখিটির মন ভালো থাকলে থাই ভাষায় আলবার্ট থংসাই এর পপ গানের লিরিকও শোনায় একটু আধটু। আমি সারাদিন নানা ধান্দায় বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াই বলে পাকপাওকে খাঁচায় থাকতে হয়। তাকে পিঞ্জিরায় বন্দী করে রাখছি বলে একটু গ্লানিও হয়।

অবশেষে প্রেমজাই এর কাছ থেকে চিঠি আসে। সে জানতে চেয়েছে আমি পাকপাও’কে থাই স্টাইলের আয়না কিনে দিয়েছি কিনা? বিষয়টি আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার নিজের কোন আয়না ছিলো না। আর চুলদাড়িতে ভবসব নিজস্ব সুরত দেখার কোন প্রয়োজনও ছিলো না। তাই প্রেমজাই এর চিঠি পড়া মাত্র পাকপাও’কে কমন বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেই। কাকতুয়াটির আরশি-প্রীতি সত্যিই অসাধারণ। সে উড়ে উড়ে কেবলই দেয়ালের আয়নায় মুখ দেখে। চেষ্টা করে আয়নাতে পা ঠেকিয়ে পালক ছড়িয়ে বসে পড়ার। আমি তার পায়ের নিচে বাহু পেতে দিলে সে তাতে বসে তাকিয়ে থাকে প্রতিবিম্বের পাখিটির দিকে। তারপর ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেয় ছায়া-পাখির ওষ্ঠ।

বিষয়টিকে আর অবহেলা করা যায় না। সুতরাং পাকপাওকে পিঞ্জিরায় পুরে নিয়ে রওয়ানা হই শহরের দিকে। সাউথ ইস্ট এশিয়ান আর্ট অবজেক্টের দোকানে সত্যিই পাওয়া যায় থাই স্টাইলের কয়েকটি আয়না। এ আরশিগুলো অবিকল প্রেমজাই এর দিদিমা’র দেয়া আয়নার মতো। দাম উনচল্লিশ ডলার নাইটিনাইন সেন্ট। দামের দিকে তাকিয়ে পিঞ্জিরাসহ বেরিয়ে আসি দোকান থেকে।

শহরের পার্কের প্রান্তে এসে বনানীর নিবিড় ছায়ায় একটি বেঞ্চে বসে পিঞ্জিরা খুলে দেই। পাকপাও বেরিয়ে এসে আমার কাঁধে বসে। অবাক হয়ে সে দেখে চারদিকের ঝিরিঝিরি সবুজ পত্রালি। আমি থাই স্টাইলের আরশির দামের বিষয়টি ভাবি। আমার উপার্জন নেই বললেই চলে। কষ্টেসৃষ্টে ডলার চল্লিশেক হয়তো জোগাড় করতে পারবো। কিন্তু চল্লিশ ডলারে ইউজড্ বুক স্টোর থেকে কেনা যাবে গোটা দুই বই, সস্তা রেস্তোরাঁয় খাওয়া যাবে অন্তত দুতিনটি ডিনার। একটি আরশি কিনে এতগুলো টাকা খরচ করবো?

পাকপাও উড়ে গিয়ে একটি গাছের ডালে বসে। মৃদু হাওয়ায় খানিক দোলতে দোলতে আমার দিকে তাকিয়ে একটু শিস দিয়ে কিছু গায়। ফিরে এসে আবার কাঁধে বসে, টুকটাক কিছু শব্দ করে পরিষ্কার থাই ভাষায় বলে- কপচাই জিংজিং বা থ্যাংক ইউ ট্রুলি। তারপর উড়ে যায় সে। কিছুক্ষণ গাছপালার উঁচু ডালে ঝোলাঝুলি করে কীভাবে যেন হাওয়া হয়ে যায়। আমি অনেকক্ষণ বেঞ্চে বসে থাকি। শূণ্য পিঞ্জিরা হাতে অপেক্ষা করি,সন্ধ্যা হয়, কিন্তু পাকপাও আর ফিরে আসে না।

 

[email protected]

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.