“গন উইথ দি উইন্ড”

Moon 2আফরোজা সোমা: সৈয়দ বানু তখনাে বেঁচে। তখনাে শরীরে তরুণ ঘোড়ার মতন জোর। ঝড়-তুফানে গাছের ডাল-পালা ভেঙে পড়লে, বাঁশের মুথা তুলে রাখলে সেইগুলাে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে তখনাে সৈয়দ বানুই লাকড়ি বানায়।

সৈয়দ বানুর চার নাতি। তাদের মধ্যে তিন জন মেয়ে, একজন ছেলে। চার নাতি-নাতনি, ছেলের বউ, আর বাড়িতে বেড়াতে আসা মেঝো নাতি রুমা’র এক বান্ধবী, সব মিলিয়ে সাত জন।
সন্ধ্যার পর, উঠানে খেজুরের একটা পাটি বিছিয়ে সেটায় তারা সকলইে শুয়ে আছ। তাদের মুখােমুখি একটা বিরাট আসমান। সেই আসমান ভেসে যাচ্ছে জােৎস্নায়।

অতাে বড় চান্নি! এমন পসর! বহু বছর সৈয়দ বানু দেখে নাই।

সৈয়দ বানুর ছেলের বউ রহিমা বেগম দেখে নাই। ‍”কী পসর! আসমান ভাইস্যা যাইতেসে জােসনায়।”

উঠোনের দক্ষিণ কোণে লাগােয়া যে নারিকেল গাছটা আছে, সেটার মাথায়, পাতায় পাতায় চাঁদের আলো উছলে উছলে পড়ে।

শুয়ে শুয়ে তারা দেখে, কিমুন লিরলির‍ানি বাতাস বইতাসে। বাতাসে নারিকেলের পাতা ঝিরঝিরাইয়া লড়তাসে। পাতা লড়ার শব্দে গানের মতন একটা কিমুন গুঞ্জরণ শব্দ অইতাছে।

নারিকেলের পাতায় জােছনা এমন মাখামাখি হয়ে থাকে যে দেখলে মনে হয়, পাতার মধ্যে একটা মায়া বইসা রইছে। বাতাসে সেই পাতা লড়লে মনে অয়, মায়ার জগত কিমুন জানি লইড়াচড়্যা ওঠে।

বাতাসে নারিকেলের চিরল চিরল পাতাগুলাে হেলে-দুলে দুলে-দুলে নড়ে। দুলে দুলে ধীরে ধীরে থামে। আর এগুলাে নড়ার এবং থামার ছন্দের সাথে সাথে পাটিতে যারা শুয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে তাদের সবার ভেতরে, আলাদা আলাদা করে আস্ত একেকটা মায়ার দুনিয়া চক্ষের সামনে কিচ্ছার বর্ণনার মতন বাস্তব হয়ে উঠে।

সেই পূর্ণিমা রাতটা ছিল নব্বই দশকে। কিন্তু সেটা ছিল কত সাল? ৯৬ বা ৯৭ না-কি? কী জানি! খেয়াল নাই। কারােরই নাই। না রহিমা বেগমের, না সোমার।

তবে, সৈয়দ বানুর বড় নাতি সােমা তখন হাই স্কুলে পড়ে। ঘটনা তার খেয়াল আছে। এতই স্পষ্ট খেয়াল যে, পূর্ণিমা রাতে পাটি পিছিয়ে শুয়ে থাকার সেই দৃশ্য সে আজো চােখ খােলা রেখেই অবিকল দেখতে পায়। এমনকি যে কোনো চাঁদের আলোতেই সে দেখতে পায় যে, উঠোনে ঝলমল করছে নানান বয়সী কয়েকটা মুখ। চাঁদের আলোয় তারা আর কেউ তারা না থেকে সবাই হয়ে উঠে অন্য মানুষ। ঠিক যেমন মানুষ কিচ্ছায় বর্ণিত থাকে।

সেই দিন এমনই চাঁদ ছিল, এতাে বড়, এতাে আলাে ছিল যে, এর আগে জীবনে আর যত পূর্ণিমা দেখেছে সৈয়দ বানুর বড় নাতি সেইসব আর কিছু তার পূর্ণ গােচরে নাই। এমনকি সেই রাতের পরে আরো যত পূর্ণিমা সে দেখেছে জীবনভর সেই সব-ও তার গোচরে আসে কম। পূর্ণিমা রাতের কথা মনে হলে, পূর্ণিমার মাদকতার কথা মনে পড়লে, তার কেবলি মনে পড়ে, কোনো এক পূর্ণিমার আলােয় পরিবারের সকলে এক সাথে নারিকেলের পাতার মতন হলে-দুলে উঠেছিল উঠোনে বিছানো খেজুরের পাটির উপর।

সেই দিনের চাঁদ কি আসলেই আলাদা ছিল খুব? না-কি খুব আলাদা ছিল পাটির পরিবেশ? কী জানি! হয় চাঁদ, নয় পাটি, কিন্তু চাঁদ ও পাটির ঘটনা মনে রয়ে গেছে।

সেই রাতে চাঁদের আলােয় সৈয়দ বানুর মন যেমন কেমন-কেমন করে উঠে, একই রকমভাবে কেমন-কেমন করে উঠে তার ছেলের বউ রহিমা বেগম-এর মনও। আবার সৈয়দ বানুর বড় নাতির মনও নারিকেলেরে পাতার সঙ্গে হেলে-দুলে উঠে অকারণ।

ঘরের ভেতরে হারিকেন নিভু নিভু আলােয় রেখে দিয়ে উঠোনে খেজুর পাতার পাটির উপর গা লাগালাগি করে শুয়ে থাকে ওরা সাতজন। শুয়ে শুয়ে আসমানের দিকে অপলক তাকিয়ে তারা সকলেই ‘চান্নি’ দেখে।

চান্নির মধ্যে কী দেখে তারা? কেউ জানে না। না সৈয়দ বানু, না রহিমা বেগম, না সােমা, না তার ছােটাে আরাে তিন ভাই বােন। কিন্তু তারা সকলেই যার যার মতন করে চান্নির দিকেই তাকিয়ে থাকে, অপলক।

চান্নির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সােমা তার দাদিকে বলে, ও দাদু, একটা গীত কও।

সুপারি গাছের খােল দিয়ে নিজের হাতে বানানাে বিছুন (হাত পাখা) নাড়াতে নাড়াতে নাতির দিকে তাকিয়ে সৈয়দ বানু বলে, ধুর যা! আমি কি গীত কইতারি নি! কিচ্ছু মনও নাই গা।

নাতি কয়, হ! কও না একটা গীত। ঝালো ব্যাডার মুখটা যে আইস্যা বরণ করে হেই গীতটা গাও।

আইচ্ছা তে, খারাে, কইতাছি, বলে সৈয়দ বানু।

তারপর দুই এক মিনিটের নীরবতার পর বিছুন নাড়াতে নাড়াতে সৈয়দ বানু ঝালাে ব্যাডার গীতটা ধরে। কোনো এক জেলেকে নিয়ে গীতটা গাইতে গাইতে একটা জায়গায় গিয়ে গলার সুরটা খেই হারিয়ে ফেলে, গলার স্বরটা ধীরে ধীরে নেমে যায়। তারপর সৈয়দ বানু বলে, আর ত মনও নাই গা…

তখন নাতিরা বলে, থাউক, এইডা আর কওয়ন লাগদাে না। আরেকটা কও।

ঘাের পূর্ণিমায়, সন্ধ্যা রাতে, উঠোনে খেজুর পাটি বিছিয়ে নাতি-নাতনিরা শুয়ে থাকে। সৈয়দ বানু শোয়া থেকে উঠৈ পাটিটার কাছেই একটা পিঁড়ি পেতে বসে। মাঝে মাঝে চাঁদের দিকে দেখে, মাঝে মাঝে ঘোরায় হাতের পাখা। আবার যখন ধীরলয়ে মৃদুবায়ু বওয়া হাতের পাখা ঘোরানো থামিয়ে দিয়ে বলে, কিমুন সুন্দর লিরলিরানি বাতাস! শইলডা জুড়াইয়া যায়।

চান্নি দেখতে দেখতে সােমা কি তার মা-কেও বলেছিল একটা গীত গাওয়ার কথা? সেই কথা তো আজ আর মনে পড়ে না। তবে, অনুমান করে বলা যা যে, মেয়েটার যা চরিত্র তাতে গীত গাইতে বলারই কথা।  আর যদি সে নাও বলে থাকে তাহলেও, সােমার মা কি দুই-একটা গীত গেয়েছিল? সোমার মায়ের যে চরিত্র তাতে এমন চান্নি রাতে উঠোনে পাটির উপর শুয়ে শুয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সােমার মায়ের তো একটা গীত বলারই কথা।
যদি গীত গেয়েই থাকে, তাহলে সােমার মা কােন গীতটা গেয়েছিল? মনে নাই। তবে মনে হয়, ‘নামাে কুলি’ গীতটাই গেয়েছিল। কারণ এই গীতটাই সােমার মাকে গাইতে বেশি শােনা যায়।

হয়তাে গলার স্বরটা একটু কেমন চিকন করে কেমন একটা গুনগুন করা সুরে সােমার মা গেয়েছিল, “নামাে কুলি আষাঢ়ে, নামাে কুলি জমিনে, খাইয়া যাও গাে কুলি সরলি বাটার পান…”।

গীতটা গাইতে গাইতে হয়তো একটা পর্যায়ে সোমার মায়ের স্বরটাতে অচিন একটা দেশের আকুলতা এসে ভর করেছিল।

কুলি মানে হলো কােকিল পাখি। যাকে ডাকছে এক নারী। ডাকছে নিকটে আসতে। বাটায় রাখা পান খেয়ে যেতে। হয়তাে, পান বানিয়ে দিতে গিয়ে গীতের সেই নারী তার কুলিকে দু’টো  মনের কথা বলতো। অথবা হয়তো কিছুই বলতাে না, এমন চান্নি ফসর  রাতে নিকটে বসে হয়তাে প্রাণের কুলিকে কেবলি দেখতাে দুই নজর। কী জানি!  গীতের নারী আর কুলির মধ্যে কী ঘটতো তা নিশ্চিত না হলেও সােমার মা গীত গাইলে যে, প্রথমে এই গীতটাই গাইতো তাতে কােনাে সন্দেহ নাই।

কুলির এই গীতটা অবশ্য সবচে’ ভালো গাইতো সোমার বুড়িমা। মানে সোমার মায়ের নানী। সেই বুড়িমা’র গলা এমনি মাদকতা মেশানো ছিল যে, সে যখন কুলির গীতটা গাইতো খুব ছোটো বয়সেও সেই কুলির জন্য সোমার মনটা কেমন-কেমন করে উঠতো!

আহারে! এমন চান্নি রাতে গীত গাইলে সোমার মা যে প্রথমে কুলির গীতটাই গাইতো এতে কোনো সন্দেহ নাই। হয়তো উনি ওই গীতটাই গেয়েছিলেন। গেয়েছিলেনই। উনার যা চরিত্র তাতে পাটিতে শুয়ে গীতটা না গেয়ে পারতেন না।

সেই পূর্ণিমা সন্ধ্যায় সােমার ছােটাে বােন রুমা, রুমার বান্ধবী মুক্তি, তারা ছােটাে দু’টো শিশু, চান্নি দেখে দেখে নিজেদের মধ্যে কী যেনো গুজুর গুজুর করে তারা। রুমা’র ছােটাে হলাে রােমেন। তার চােখ দু’টো খুব বড় বড়। টলটলে চোখ।  বড় বড় টলটলে চােখ মেলে সে চান্নির দিকে কী দেখে সেটা সে জানে আর তার মাবুদে জানে। আর চার ভাই-বােনের মধ্যে রিমু হলাে সবার ছােটাে। ছােটাে মানে বয়সে একেবারেই বাচ্চা। হাঁটে, দৌড়ায়, কথা বলে। ওই টুকুই। স্কুলে বোধহয় ভর্তি হয় নাই সে। ফলে, চান্নি রাতে সে কী দেখেছে, বা আদৌ কিছু দেখেছে কি-না এটা বলা মুস্কিল।

সােমা’র বাপ তখনাে বাইরে, টাউনে। মানে শহরে। সে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১২টার আগে না।

আর এমন সুন্দর চান্নি উঠার কারণে সােমার অস্থিরতা দেখে তার রোজকার সন্ধ্যেবেলার পড়ালেখা থেকে আজকে তাকে রেহাই দিয়েছে মা। ফলে আজকে তার ঈদের রাত। না, তা না। ঈদের রাতের থেকেও বেশি।। কারণ ঈদের রাতে বাড়িতে থাকে বহু ব্যস্ততা। সন্ধ্যেবেলা থেকেই অন্তত ১৫-১৬ জাতের পিঠা ভাজা-ভাজি করতে বসে রহিমা বেগম। আর এছাড়া অন্য কাজকর্ম তো আছেই।

কিন্তু আজকের রাতে কােনাে কাজ নাই। তাড়াহুড়া নাই। আজ পাটি বিছিয়ে শুধুই চান্নি দেখার রাত। গীত শােনার রাত। নারিকেল গাছার পাতায় পাতায় গান বেজে উঠলে তাকে প্রাণে ধরে রাখার রাত।

অদ্ভুত পূর্ণিমায় বিরাট বড় চান্নির নিচে, নারিকেল গাছের কয়েক হাত দূরে উঠােনের মধ্যে শুয়ে শুয়ে বাড়িতে চান্নি দেখে কেবল সােমার বাপ ছাড়া আর পুরা পরিবার।

উঠানের উত্তর-পশ্চিম কােণায় বাঁশের ঝাড়। সেই ঝাড়ে আছে বরাক বাঁশ, মোড়ল বাঁশ। বাতাসে দুলতে দুলতে ঝাড়ের বাঁশ কোনোটা নুয়ে পড়তে থাকলে বা এদিকে ওইদিক দুলতে থাকলে বাঁশ ঝাড় থেকে থেকে থেকেই কেমন একটা মটমট শব্দ করে। মটমট শব্দের মতনই সেই ঝাড় থেকে মাঝে মধ্যে আসে নানান রাতের পাখি ও পােকার ডাক। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক থেকে, কাঁঠাল গাছের উঁচু মাথা থেকে হঠাৎ হঠাৎ উড়ে আসে জােনাকি!

জােনাকি দেখে সৈয়দ বানু বলে, দেখ দেখ জুনি উইড়া যায়! চান্নির তলে জুনি উড়ে। জ্বলে আর নিবে। দেখ।

একে তাে চান্নি রাইত। তার উপরে এমন ফসর [পসর]।  বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে, সুপারির গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এঁকেবেঁকে পড়ছে। মনে হচ্ছে, রুপা গলিয়ে বানানো রঙ-এর বাটিতে এক চিমটি স্বর্ণচূর্ণ মিশিয়ে কেউ বুঝি সেই রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে জগতময়। সোনা ও রুপার মিশেলে গড়া সেই আলোয় উঠোন হয়ে ওঠে মহামায়া। উঠোনে পাটি পিছিয়ে সবাই মিলে শুয়ে শুয়ে গীত শুনতে শুনতে চান্নি দেখার ঘটনাটা হয়ে যায় মায়ার গল্প; যে গল্প কেবলি কেচ্ছায় বর্ণিত হয়; বাস্তবে সেই দৃশ্য যেনো হয় না বর্ণনা।

সেই রাতের সেই মায়াঘােরটা সৈয়দ বানুর বড় নাতি  সােমার মনের মধ্যে সেই যে ঢুকেছিল জাদুর মায়া হিসেবে, জাদুর সেই মায়া আজো কাটে নাই।

এই শরতে আজকে যখন ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা দেখতে কোনো কোনো চন্দ্রগ্রস্তরা জড়ো হবে কোনো বাড়ির ছাদে অথবা সংসদ ভবনের মাঠে আথবা হাতির ঝিলে  অথবা শহর থেকে দূরে মফস্বলের কোনো বাড়িতে অথবা গ্রামের কোনো পুকুর পাড়ে জড়ো হবে মানুষ, তখনো এই সোমা মেয়েটা নাই দেশের এক উঠোনে পাটি পিছিয়ে শুয়ে থাকবে চাঁদের নিচে।

শুয়ে থাকতে থাকতে সৈয়দ বানুর কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে, সৈয়দ বানুর সেই ঝালো ব্যাডার গীত। অথচ সৈয়দ বানু তো এই মাটির উঠোন ছেড়ে সেই কবেই চাঁদের দেশে নিয়েছে ঠাঁই!

রহিমা বেগম-এরও তাে আর আগের দিন নাই। গলায় সুর নাই। গীত নাই। পাটিতে শুয়ে থাকা সেই সব শিশুরাও আর নেই শিশু। সকলেই বড় হয়েছে।  সৈয়দ বানুর বড় নাতিটারই খালি আজো বয়স হলো না! এই ভাদ্র শেষে আসছে আশ্বিনেই ৩০ পূর্ণ করে ৩১শে পা দেবে সে। অথচ আজো, মনে মনে সে খালি গীত শুনতে চায়। পূর্ণিমা রাত হলেই এক পাটিতে শুয়ে গীত শুনতে শুনতে সবাই মিলে চান্নি দেখতে চায়।

কিন্তু সে বোঝে না যে,  সবাই মিলে এক পাটিতে শুয়ে গীত শুনতে শুনতে এক জীবনে কেবল একবারই চান্নি দেখা যায়। বার বার সেই উঠোনে যায় না ফেরা।

০৮.০৯.১৪

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.