ইভটিজিং এবং প্রজন্মের কিশোরীরা-১

eve teasing 2সুমন্দভাষিণী: আবারও এক কিশোরী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো বখাটেদের উৎপাত সহ্য করতে না পেরে। বিভিন্ন অনলাইনে মেয়েটির ছবি দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম, কী সুন্দর গোলগাল মুখটা মেয়ের, মায়াময়। এমন একটি মেয়ে, যার বয়স কিনা মাত্র ১৫ বছর, তা শেষ হয়ে গেল মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানেই! জীবন কি এতোটাই ঠুনকো আর অসাড় হতে পারে!

খবরে জানলাম, খোদ রাজধানীর খিলাগাঁওয়েই ঘটেছে ঘটনাটা। পাড়ারই এক ছেলে মেয়েটিকে আসতে-যেতে উত্যক্ত করতো, মেয়েটির পরিবার থেকে এ নিয়ে বিচার চেয়েও প্রতিকার পায়নি। বরং ছেলেটির পরিবার আরও শাসিয়ে দিয়েছে মেয়েটির পরিবারকে। এমনও বলতে শুনেছি মেয়েটির এক আত্মীয়ের মুখে যে, ছেলেটি নাকি বলেছে, ‘এর আগে দুটো খুন করেছি, আরেকটা করলেও কিছুই হবে না, ধর্ষণ করলেও কিছু হবে না’।

দেশটা আসলে মগের মুল্লুকই হয়ে গেছে। নইলে এমন একটি হুমকি দিয়েও পার পেয়ে যায় কেউ কেউ, আর কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আহা, কত স্বপ্নই না দেখতে পারতো মেয়েটি, জীবনটাও অনেক সুন্দর হতে পারতো। তা না হয়ে সে নিজেই শেষ করে দিল সব।

কিন্তু এজন্য মেয়েটি বা ছেলেটি যতটা না দায়ী, আমি বলবো তার চেয়েও বেশি দায়ী আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, আমাদের ভঙ্গুর রাজনীতি, আমাদের পারিবারিক শিক্ষা। মেয়েটি হয়তো তার পরিবার থেকে সেই সহানুভূতি বা সাপোর্টটুকুই পায়নি। বিশ্বব্যাপী মেয়েদের শতকরা ৮০ ভাগই কমবেশি ইভ টিজিং এর শিকার হচ্ছে। কোথাও এর হার বেশি, কোথাও হয়তো কম। তবে কেবলমাত্র এশিয়ার দেশগুলোতেই মেয়েরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় বলে এতোদিন যে একটা ধারণা প্রচলিত ছিল, তা পাল্টে দিয়েছে সাম্প্রতিক কালের এই জরিপ।

জরিপে বলা হয়েছে, এই ধরনের হয়রানি এখন কেবল আঞ্চলিক সমস্যাই নয়, এটা বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বব্যাপী শতকরা প্রায় আশি ভাগ নারী এবং ভিন্ন সেক্সের অন্য লোকজনও রাস্তাঘাটে উত্যক্ত হচ্ছে নানাভাবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে আত্মাহুতির ঘটনাও হরহামেশাই ঘটছে।

এসব হয়রানির মধ্যে রাস্তাঘাটে শিস বাজানো থেকে শুরু করে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, হাসির জন্য আমন্ত্রণ, ফোন নম্বর দাবি, অথবা বেশ্যা বলে গালিও হতে পারে। এবং এটার শেষ হতে পারে মারাত্মকরকমের অপরাধ সংঘটনের মধ্য দিয়ে।

নারায়ণগঞ্জের সিমির আত্মহত্যার ঘটনা একসময় তোলপাড় তুলেছিল। একই সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় যে পরিমাণ ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সরকারও তখন কিছুটা নড়েচড়ে বসেছিল। ভাবা হয়েছিল, এবার হয়তো কমবে এই প্রবণতা।

কিন্তু না, কমেনি। কয়েকদিন থেমে থেকে আবারও শুরু হয় নতুন কোনো ঘটনা।

পরবর্তীতে আমরা আরও কিছু ঘটনার সাক্ষী হই। ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ পর্যন্ত দিতে হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। এর মধ্যে নাটোরের একজন শিক্ষক ছাত্রীকে হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটেদের হাতে প্রাণ হারান। ফরিদপুরে এক মা তার মেয়েকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় মোটর সাইকেলের নিচে পিষ্ট করে সেই মাকে মেরে ফেলে বখাটেরা।

ওই সময়ে বখাটেদের ঔদ্ধত্যের আরও কিছু খবর আসে গণমাধ্যমে। কিন্তু কোনটারই সঠিক বিচার হয়েছে কিনা তা আমরা আর জানতে পারি না। শুধু ইভ টিজিং শব্দটাকে তখন প্রাতিষ্ঠানিক একটা রূপ দেয়া হয়েছিল। আর এই প্রাতিষ্ঠানিকতায় আইনের কিছু ধারাও বলবৎ করা হয়, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই আইনগুলোর কোন সুনির্দ্দিষ্ট প্রয়োগের খবর আমরা পাইনি। বিষয়টা অনেকটা এরকম, ‘আইনের কথা খাতায় আছে, বাস্তবে নেই’।

বখাটেদের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু না এইদেশে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এর শিকার হচ্ছে। আমাদের ছোটবেলায় শুনেছি, বড় বোনেরা স্টুডিওতে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক সাবধানী হতো, নেগেটিভ পর্যন্ত নিয়ে আসতো। তখন স্টুডিও থেকে নেগেটিভ জোগাড় করে ছবির সাথে ছবি লাগিয়ে কত মেয়ের সংসার যে ভেঙ্গেছি বখাটেরা, তার ইয়ত্তা নেই। মেয়েটির জীবন দুবির্ষহ হয়ে উঠতো এসব ঘটনায়। বাসায় কিশোরী মেয়ে থাকা মানেই উড়ো চিঠির আনাগোণা ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

কল্পনা নামের একটি মেয়ে বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে উঠার সময়টা আতংকে জড়োসড়ো হয়ে থাকতো। বেশিদিন আগের কথা না, আজ থেকে ৩৩ বছর আগের কথা বলছি। যে ঘরটায় বসে সে পড়তো, তার রাস্তার দিকে জানালা তাকে সবসময় বন্ধ রাখতে হতো, কোন কারণে সেটা খোলা থাকা মানেই পড়ার টেবিলের ওপর উড়োচিঠির উপস্থিতি। এবং কোন কারণে সেই চিঠি বড় ভাইদের হাতে পড়লে আর রক্ষে নেই, যেন কল্পনাই দায়ী এই চিঠির জন্য। বিষয়টা এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, কল্পনা পড়ার ঘরে আসাই বন্ধ করে দিয়েছিল প্রায়। আর বাসার সবার থমথমে ভাব তাকে কুঁকড়ে রাখতো প্রতিনিয়ত। অথচ এই চিঠিগুলির সাথে কল্পনার কোনরকম যোগসাজশ ছিল না, নিচে নাম থাকতো না বলে কল্পনা জানতোও না এই চিঠি কার, কে লিখেছে। কিন্তু সে নিজেও নিজেকে দায়ী ভাবতো, তার হঠাৎ বড় হয়ে উঠাটাই যেন কাল ছিল।

একদিনের ঘটনা। তখনও বিদ্যুত আসেনি বাসায়। সামনের দিকে জানালা বন্ধ। নি:শ্বাস নেয়ার উপায় নেই। তাই সে কিছুক্ষণের জন্য সাহস করে বাসার মেইন গেইটের দিকের জানালাটা খুলে পড়ছিল। হঠাৎই একটা শব্দ। তাকিয়ে দেখে, জানালার পর্দাটা উধাও। কে যেন ওটা টান মেরে খুলে নিয়েছে। ভয়ে সে জানালা বন্ধ করে দিলেও শান্তি পাচ্ছিল না। পরদিন দুপুরবেলা সে পর্দাটা আবিষ্কার করে পড়ার ঘরে জানালার কাছে। ভয়ে ভয়ে সে ওটা খুলে দেখে সিগারেটের আগুন দিয়ে সেখানে তার নামের পাশে আরেকটি ছেলের নাম লেখা। তখন কোনকিছু লুকানোরও কোন উপায় ছিল না। কোনরকমে বিছানার নিচে গুঁজে রেখে পরদিন সে এটা কোমরে বেঁধে স্কুলে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেখানেও বিড়ম্বনা। টিচারদের জোড়া জোড়া চোখ এড়ানো ছিল খুবই কঠিন।

আরেকদিন একটি চিঠি দিয়ে যায় ডাকপিয়ন। প্রতিদিনই তো কত চিঠি আসে বাসায়। কিন্তু এটা যেন অন্য চিঠি। বড় ভাইয়ের মুখ থমথমে। কল্পনা ঠিক বুঝে যায়, কিছু একটা ঘটেছে, যার সাথে সে ‘রিলেটেড’। কিন্তু সে আঁচ করতে পারছে না কী হতে পারে!

দুপুরে খেতে বসে মায়ের সাথে বড় ভাইয়ের টুকরো কথা কানে আসে কল্পনার। মা আস্তে করে বলছেন, ‘কি করবি ভাবলি? বড় ভাই বলছে, ‘কী করার আছে? আশকারা দিয়ে তুমিই মাথায় উঠাইছো, তুমিই সামলাও’। মা বলেন,’ আমি আশকারা দিলাম কই? এটা এভাবে ছাড়াটা ঠিক হবে না’। বড় ভাইয়ের তখনকার উত্তর শুনে কল্পনার আর বুঝতে বাকি থাকে না কিছুই। বড় ভাই বলে,’ আমি কি করবো? ঘটনা তো সত্যও হতে  পারে!’ তখন থেকেই কল্পনা ঘরময় সেই চিঠিটা খুঁজতে শুরু করে, এটা তাকে পেতেই হবে। অবশেষে সে পেয়েও যায়। দৌড়ে টয়লেটে ঢুকে সে। তখনকার সময়ে একমাত্র টয়লেটই ছিল নিরাপদ জায়গা। চিঠিটি পড়ার পর সে যেন চলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। কী বলবে সে, কাকে বলবে? বাসায় মা বা ভাইবোন কেউই তার কথা শুনবে না, এটা নিয়মবিরুদ্ধ। কৈশোরকালে একটা মানুষও সে পায়নি নিজ বাসায়, যাকে সে তার কথাগুলো বলতে পারে।

চিঠিটা ছিল অনেকটা এরকম: ‘আপনাদের মেয়েকে সামলান। সকালবেলা সে প্রতিদিন পাড়ার একটি ছেলের সাথে গার্লস স্কুলে দেখা করতে যায়, সেখানে তারা যৌনসম্পর্কও করেছে। আপনাদেরকে এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আপনাদের মেয়ে এতে করে গর্ভবতী হয়ে পড়তে পারে’। এতো বছর পর চিঠির ভাষাটা হুবহু মনে নেই, তবে সারমর্ম ছিল এটাই।

চিঠিটি পড়ার পর থেকে কল্পনার মাথা ঘুরছে। সেটা ওই চিঠির লেখকের জন্য বা লেখার ভাষার জন্য যতটা না, তার চেয়েও তার ভাইয়ের কথাটা মনে লেগেছে। ভাই বলেছে, ঘটনা সত্যিও হতে পারে। তার মানে তাকে বিশ্বাস করছে না বাসার কেউ। তারা ধরেই নিয়েছে কল্পনা এই কাজটি করতে পারে। ছোটবেলা থেকে অসম্ভব মেধাবী কল্পনা কখনও নিজে থেকে এমন একটি ঘটনা জন্ম তো দিতে পারবেই না, হজমও হবে না। আর সেই কল্পনা আজ কাঠগড়ায়। ছি:। ঘৃণায় কুঁচকে যায় তার মন। কোন বখাটে ছেলে কী ভেবেছে, কী করেছে তার জন্য নয়, পরিবারের সবার তার প্রতি ধারণা দেখে সে কতবার যে আত্মহত্যার কথা ভেবেছে, তার শেষ নেই। কিন্তু কী এক অসীম মনোবলের কারণেই কল্পনা আজও বেঁচে আছে। এবং ভালভাবেই আছে। পরিবারের সবার সাথে দূরত্ব সেই তখন থেকেই।

কল্পনার ঘটনা তিন দশক আগে ঘটলেও আমাদের সমাজটা এখনও পর্যন্ত বদলায়নি। এখনও আমরা ইভটিজিংয়ের জন্য ঘরের মেয়েটাকেই দায়ী করি, তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, পোশাক এসবকিছুকেই দায়ী করে মোটামুটিভাবে তাকে গৃহবন্দী করে রাখার প্রয়াস খুঁজি। কিন্তু ভেবে দেখি না, একটি তিনবছরের শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার কোন আচরণটা প্রলুব্ধ করেছিল ওই ধর্ষককে? বা কোন পোশাকটাই?

টিজিংয়ের সবচেয়ে শিকার আমাদের কিশোরী মেয়েরা। এমনিতেই উঠতি বয়স, শরীরে নানান পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে যে কিনা নিজেই হিমশিম খায়, সেই তখন চারদিকের লোলুপ দৃষ্টিগুলোর সামনে পড়ে অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়ে। কোনদিকে যাবে সে? কি করলে ভাল হবে? পরিবারের বড়রা তখন কমই তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, কাঁধে নির্ভরতার হাতটি রেখে সঠিক পথটি বাতলে দেয়। ফলে টিজিংয়ের শিকার কিশোরীটি না পারে কাউকে কিছু বলতে, না পারে সইতে।

আর রাষ্ট্রও যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন নাগরিক হয় নিজেই প্রতিবাদী হয়, নয়তো নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই হতে দেখি আমরা। আর এই গুটিয়ে যাওয়া থেকে সমাজে তৈরি হচ্ছে একধরনের ভারসাম্যহীনতা। ক্ষতিগ্রস্তরা নিজে থেকেই তাদের চলাফেরার গণ্ডি সীমিত করে ফেলে নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটা খুব বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। তবে এটা এভাবে বেশিদিন চলতে দেয়া যায় না, এর এখানেই সমাপ্তি হওয়া উচিত।

আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে হয়রানি যে কেবল রাস্তাঘাটেই সীমাবদ্ধ তা নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে হয়রানিও এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হয়রানি এখন শারীরিক-মানসিক সব গণ্ডিকেই পেরিয়ে গেছে। আর এর শিকার হয়ে কত মেয়ে যে অকালে চলে যাচ্ছে, তার হিসাব কি গণমাধ্যমে সঠিকভাবে আসে?

বিবিসি বাংলার ফেসবুক পেজে একজন প্রতিক্রিয়ায় লিখেছে, মেয়েরা শালীনতা বজায় রেখে চললেই বখাটেরা আর সুযোগ পাবে না। কল্পনা নড়েচড়ে বসে। ৩৩ বছর আগে তার পোশাক কেমন ছিল, ভাবতে থাকে। একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে প্রায় তিন বছর সে মোটামুটি বন্দী জীবনযাপন করেছে মানসিকভাবে, যার প্রভাব এখনও তার জীবনে স্থায়ী হয়ে আছে।

এই যে মেয়েটি মরে গেল, বোকা মেয়ে। জীবনটা এতো ঠুনকো নয় যে, কারও কথায় তা শেষ করে দিতে হবে। কল্পনা ভাবে, কেন সবাই তার মতোন বেঁচে থাকে না, তাহলেই তো সবাই মিলে এই ভঙ্গুর সমাজটাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিতে পারতো। তবে এটাও জানে, সমাজটাকে নাড়া দেয়ার মতো কিছু একটা করা উচিত এবং তা করতে হবে সবাই মিলেই। নইলে বোকা মেয়েগুলো কেবলই মরতে থাকবে। দরকার সম্মিলিত সামাজিক একটা আন্দোলনের, নাড়িয়ে দেয়ার মতো আন্দোলন।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.