রোজ নামচা-২৩ (শেকড়ের খোঁজে- ১)

Leena Haq
লীনা হাসিনা হক

লীনা হাসিনা হক: এর আগে রোজ নামচার ১০ এবং ১৬ পর্বে লিখেছিলাম আমাদের স্টুডেন্ট ইন্টার্ন রাজেশের কথা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেনিশ পরিবারের দত্তক সন্তান ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের পুরোনাম রাজেশ জেসপার লিবেখ হলম্যান। রাজেশ তার ভারতীয় মা-বাবার রাখা নাম, বাকিটা ডেনিশ নাম।রাজেশের সাথে আমার সম্পর্কটা কাজের ক্ষেত্র ছাড়িয়ে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্কের বাঁধনে বাধা পড়েছে। রাজেশ আমার আরেকটি ছেলের জায়গা নিয়ে নিয়েছে। প্রথম দেখাতেই শাড়ী পড়া আমার মধ্যে সে তার মায়ের ছায়া দেখতে পেয়েছে- যেই মাকে তার মনে পড়ে না, যেই মায়ের কোনও ছবি তার কাছে নাই, কারো কাছে সে শোনেনি যেই মায়ের গল্প, শুধু তার থেকে তিন বছরের বড় বোন বাসন্তীর কাছে জেনেছে তাদের মা শাড়ী পড়তো আর চুলে মাদ্রাজী নারীদের চিরন্তন ফুল সজ্জা ছিল।

কিভাবে যে তাঁতের শাড়ী আর খোলা চুলের চশমা পড়া আমি তার মায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলাম তা কেইই বা বলতে পারে!রাজেশ গিয়েছিল চেন্নাই তার শেকড়ের সন্ধানে। সূত্র বলতে যেই চাইল্ড হোম থেকে তাদের দুই ভাই বোনকে দত্তক নেয়া হয়েছিল সেই হোমের ঠিকানা, ফোন নম্বর। কিন্তু সেখানে যোগাযোগ করে জানা গেল, চাইল্ড হোম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এই বছর থেকেই কিন্তু ফাইলপত্র অন্য আরেকটি অফিসে রাখা হয়েছে। পুরনো দু একজন স্টাফও ওই অফিসে জয়েন করেছে।

রাজেশের খুবই মন খারাপ। নিজের শেকড় খোঁজার শেষ আলোটুকুও যেন নিভে যাচ্ছিলো তার সামনে থেকে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে নুতন অফিসের মেইল আর টেলিফোন নম্বর জোগাড় হল। প্রায় দু মাসের চেষ্টায় রাজেশ আর তার বোন যেই সময় হোমে ছিল সেই সময়কার একজন পুরনো স্টাফের সন্ধান পাওয়া গেল!ঠিক হল রাজেশ যাবে চেন্নাই জুলাই মাসে। এদিকে আমারও চোখের অসুবিধাটা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ডাক্তার বললেন গিয়ে দেখিয়ে আসতে। আমার হাসপাতালও চেন্নাইতে। আনন্দিত রাজেশ জানালো, সে আমার সাথেই যাবে। তাকে বুঝাই, আমি থাকবো হাসপাতালে, তোমার কোনও কাজে আসতে পারবো না তো। সে তত বলে, সমস্যা নাই- যে দুই চারটা বাংলা কথা সে শিখেছে তার মধ্যে একটা হল ‘ সমস্যা নাই’, ডেনিশ উচ্চারণে সে বলে,’ছমসা নাই’!  জুলাই মাসের গণগণে এক দুপুরে দিল্লী থেকে উড়ে গেলাম বঙ্গোপসাগরের তীরে চেন্নাই। আমি গিয়ে ঢুকলাম হাসপাতালে। রাজেশকে ট্যাগ করে দিলাম মাহেশ্বরী নামে সেই চাইল্ড হোমের একজন কর্মকর্তার সাথে। এই তামিল ভদ্রমহিলা প্রায় ২২ বছরের বেশী সময় ধরে চাইল্ড হোমের সাথে জড়িত। রাজেশ এবং তার বোন বাসন্তীর দত্তক গ্রহণের সময়টাতে ছিলেন উনি।

অত্যন্ত দয়ালু এই নারী সেই ১৯৯৪ সালের ফাইল খুঁজে বের করলেন। ফাইলের ভেতরের কাগজপত্র থেকে পাওয়া গেল দত্তক গ্রহণের সরকারী আদেশনামা, দুই ভাই বোনের পাসপোর্টের কপি, জানা গেল রাজেশের বাবার এবং মায়ের পুরো নাম, কোথায় কি অবস্থায় তাদের দুই ভাই-বোনকে পুলিশ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে চাইল্ড হোমে রেখে যায় ইত্যাদি। পাওয়া গেলো, মায়ের ডেথ সার্টিফিকেট। কোনও আত্মীয়-স্বজন কোনও ঠিকানা কিছু পাওয়া গেলো না, শুধু জানা গেলো পুদুপেট বলে এলাকা থেকে তাদেরকে পাওয়া গিয়েছিল।রাজেশ যখন এসব বলে, তার মুখ মলিন, চোখ ছলছল করে। কি বলবো বুঝতে পারি না। আমিও বাইরে বের হতে পারছি না যে চাইল্ড হোমের লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলে কোনও ক্লু বের করার চেষ্টা করবো।

শুধু বলি, মন খারাপ করো না, আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেই আমি যাব হোমে, কিছু একটা করবোই। রাজেশকে বলি, সে বরং ঘুরে আসুক দু’একদিন কোথাও থেকে। রাজেশ রাজী হয় না। সে নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে চাইল্ডহোমে যায়, বসে থাকে, ফাইল উল্টায়, বিকেলে আমাকে দেখতে আসে। খায়ও না ঠিকমতো মনে হয়, এমনিতেই ছিপছিপে সে গড়নে, এই কয়দিনে যেন আরও শুকিয়ে গেলো,  চোখের নীচে কালি। হাসপাতালের কাছেই একটা হোটেলে থাকছে সে। ভাবি কি করা যায়!

হাসপাতাল থেকে যেদিন আমাকে ছাড়ল আমি সরাসরি গেলাম গিলডারস হোমের অফিসে। দেখা করলাম, জেনারেল সেক্রেটারির সাথে। উনি দেখতে দিলেন রাজেশের ফাইল। ফাইল উল্টাই, চিকিৎসা চলছে তখনো আমার, দৃষ্টি ভালো করে পরিষ্কার হয় নাই, কালো চশমা ভেদ করে প্রায় কিছুই পড়তে পারি না। রাজেশকে বলি আমাকে পড়ে শোনাতে।কোনও ক্লু পাই না- কোনও ঠিকানা কোনও কিছু না। শুধু কেস হিস্ট্রি বলে পুদুপেট পুলিশ ট্রেনিং একাদেমীর মাঠের ছাউনীর তলা থেকে ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসের বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় দুই ভাইবোনকে পুলিশ থানায় নিয়ে আসে। ওসি সাহেবের কাজিন সিস্টার সমাজকল্যাণ বিভাগের অনাথালয়ে কাজ করে সেই সূত্রে রাজেশ এবং বাসন্তীকে প্রথমে সরকারী চাইল্ডহোমে নেয়া হয়। মেডিক্যাল টেস্টে রাজেশের টিবি আছে বলা হলে তাদের দুই ভাইবোনকে এই বেসরকারী চার্চ পরিচালিত হোমে পাঠিয়ে দেয়া হয় চিকিৎসার জন্য। তারপরে ডেনিশ দম্পতি তাদের দত্তক নিলেন এইসব প্রসেসের কথা।

নাহ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।সিদ্ধান্ত নিলাম যাব পুদুপেট। উল্লেখ্য যে পুদুপেট এলাকায় আমাদের ঢাকার করাইল বস্তির মতন বিশাল বস্তি আছে, বলা হয়ে থাকেচেন্নাই শহরের বিভিন্ন ক্রাইমের সুতিকাগার এই পুদুপেট বস্তি। পরদিন গেলাম পুদুপেট। পুদুপেট পুলিশ ট্রেনিং একাডেমীর মাঠ থেকে শুরু। যত দক্ষিণে যাই নদী ঘেঁষে বস্তি এলাকার বিশাল বিস্তার। তাছাড়া সুনামীতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া বসতিগুলো আর আগের মতন নাই।

কাকে জিজ্ঞ্যেস করবো, কি জিজ্ঞ্যেস করবো! শুধু মাত্র রাজেশের বাবার নাম ‘শিবালিঙ্গাম’- পেশায় নরসুন্দর, তাও হোমের কেস ফাইল অনুযায়ী! পাড়া-প্রতিবেশী জানিয়েছিল রাজেশের মা মারা যাওয়ার পরে রাজেশের মাদকাসক্ত (কেস ফাইল অনুযায়ী) বাবা আরও নেশাগ্রস্ত হয়ে পরে এবং একদিন কোথাও চলে যায়, তারপরে নাকী আর কোনদিন তাকে দেখেনি।সারাদিন সেই বস্তিতে ঘুরাঘুরি করে ক্লান্ত-শ্রান্ত চোখের ব্যথা বাড়িয়ে হোটেলে ফিরে আসি। কোনও ক্লু পাওয়া গেলো না।

রাজেশের মুখ শুকনো,  চোখ অন্যমনস্ক! ভাবি, আমার চোখের ব্যথাতো ওষুধে কমে যাবে কিন্তু এই তরুণের মনের ব্যথা কি আদৌ কোনদিন কমবে? পরদিন আমার চোখের চেকআপ শেষে যাই পুলিশস্টেশনে। পুদুপেট পুলিশ স্টেশন। পুলিশ স্টেশনে গিয়ে পুরনো ফাইল থেকে পাওয়া সেই ওসি’র নাম ধরে খুঁজি। ভাগ্যক্রমে পাওয়া যায় তাঁকে, অবসরকালীন প্রস্তুতিতে আছেন, নিয়মিত অফিসে আসেন না, আজকে এসেছেন। যেহেতু তিনি ব্যক্তিগতভাবে রাজেশ আর বাসন্তীকে তার আত্মীয়ার মাধ্যমে হোমে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তাই মনে করতে পারলেন।

তবে পুলিশ অফিসার একটি চমকে দেয়া তথ্য জানান যে রাজেশের মায়ের মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিল, যতদূর তিনি মনে করতে পারেন পুলিশের সন্দেহ আত্মহত্যা ছিল, পোস্টমর্টেমও তাই বলেছিল। অবশ্য তারা অত ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’র সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। পাশে বসা রাজেশ, চোখ নিচু, তার হাতের উপরে হাত রাখি, একটু কাঁপছে ছেলেটির হাত! এই প্রথমবারের মতন মনে হয়, কি দরকার ছিল এখানে আসার! ছেলেটি নাহয় এটাই জানতো তাদের পরিবারের কোনও সন্ধান পাওয়া যায় নাই। এখন এ কোন ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হতে চলেছে এই তরুণ! আমিই কি দায়ী হবো না এই অনাকাংখিত বেদনা বৃদ্ধিতে!

ফিরে আসার পথে সারা রাস্তায় রাজেশ একটিও কথা বলে না! আমি নিজের মনে দংশিত হতে থাকি। হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা রাজেশের মায়ের ডেথ সার্টিফিকেটটা আবার দেখা উচিত, কোনও ঠিকানা আছে কিনা। ট্যাক্সি ঘুরাই হোমের দিকে। হোমের ইন চার্জ সহৃদয়তার সাথেই দেখতে দেন ফাইল। রাজেশ জানায়, একটা ঠিকানা দেয়া আছে। পুদুপেট এলাকার। কোনও ফটোকপি যেহেতু নেয়া যাবে না, রাজেশকে বলি ঠিকানাটা টুকে নিতে।যা হোক, একটা ঠিকানা অন্তত পাওয়া গেছে। রাজেশ বড্ড অন্যমনস্ক, খাবার প্রায় কিছুই খায় না, আমিও ওর মনের অবস্থা বুঝে কিছু বলি না।সন্ধ্যায় খেতে বের হই, রাজেশের হাত ধরে আছি আমি। আমাদের হোটেলের কাছেই সমুদ্র, হেঁটেই যাওয়া যায়। বলি চল যাই। বসি গিয়ে সমুদ্রতীরে। এই রাত ৮টায়ও লোক গিজগিজ করছে।

সাগরে জোয়ার শুরু হয়েছে। উত্তাল ঢেউ, উড়িয়ে নেয়া নোনা হাওয়া কিছুই যেন স্পর্শ করছে না পাশে বসে থাকা তরুণটিকে। হঠাৎই সে বলতে শুরু করে, ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী মৃত্যুর সময় আমার মায়ের বয়স ছিল ২৫ বছর, মানে এখন আমি যেই বয়সে। কেন ২৫ বছর বয়সী একজন তরুণী নিজে নিজের জীবন শেষ করে দিলো? তার কি মনে পড়েনি তিন বছর বয়সী বাসন্তী আর দেড় বছরের আমার কথা? কি সেই অসহনীয় কষ্ট তার ছিল যা সন্তানদের একা ফেলে যাওয়ার বেদনার চাইতেও বেশী ছিল?

আমি শুধু মনে মনে বলছিলাম, ঈশ্বর, যদি তুমি থাকো তবে এই তরুণের মনের বেদনা কমিয়ে দাও। না দেখা, না জানা মায়ের জন্য তার বেদনাবোধ হালকা করে দাও। প্লিজ ঈশ্বর! (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.