দাম্পত্য ধর্ষণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ হওয়া জরুরি

Udisa
উদিসা ইসলাম, সাংবাদিক ও লেখক

উদিসা ইসলাম: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ছয় মাসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন বয়সের ৩০৯ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৭৭টি ঘটনায় মামলা হয়েছে।

গত ছয় মাসে এই হলো বাংলাদেশে ধর্ষণের চিত্র। ধর্ষণকে আমরা সামাজিক রাজনৈতিক আইনি নানা ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝে থাকি। তবে বোঝাবুঝিতে কিছু সমস্যা সাধারণত থেকে যায়, কারণ আমরা চাই যত কম কথা বলে এই বিষয়গুলো বুঝে ফেলা যায়।

আর বর্তমানে কাগজে-কলমে আলোচনায় খুব ক্ষীণ স্বরে একটা বিষয় ‘আলোচনা হতে পারে’ বলে বিবেচিত হচ্ছে সেটা হলো দাম্পত্য ধর্ষণ। যে ছকটা উপরে দেয়া হয়েছে সেখানে নানাবিধ ধর্ষণের কথা উল্লেখ থাকলেও যেটা অনুপস্থিত সেটা হলো দাম্পত্য ধর্ষণ।

আমরা জানি নারীর অধিকার রক্ষায় কর্মরত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিষয় নিয়ে অনেক আগে থেকে কথা তুলতে শুরু করেছেন। তবে বিষয়টার মূল জায়গা, এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম কথা বলা হয়।

কোন পরিস্থিতিকে আমরা ধর্ষণ বলব?

কোন নারীর সম্মতি ছাড়া তার সাথে কোন পুরুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ বলে। আরও সহজ কওে বলা যায়, যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি না থাকলেই তা ধর্ষণ হবে। ধর্ষণের সময় নারী যদি কোন বাধা না দেয় বা প্রতিরোধ নাও করে তাহলে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে যেকোনোভাবে অসম্মতি জানালেই সেটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে অর্থাৎ নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকেই ধর্ষণ বলে ধরা হবে।

লক্ষ করুন এখানে কেবল নারীর ধর্ষণের কথা বলা হচ্ছে। দাম্পত্য ধর্ষণকে চিহ্নিত করতে গেলে এই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দাম্পত্য ধর্ষণ কি?

দাম্পত্য ধর্ষণ শব্দটার ভিতরই এর ব্যাখ্যা আছে। সমাজের ’বৈধ’ আইনি সম্পর্কের ভিতর যৌন আচরণ নিয়ে যখন প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয় তখন সেটাকে দাম্পত্য ধর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যেটা মোটেই প্রকাশিত কোন বিষয় নয়।

সম্মতি ব্যতিরেকে স্বামী/স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন ঘটলে সেটাকে দাম্পত্য ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এটা একটা বোধ, যে বোধ স্বামী/স্ত্রীর মধ্যে তৈরী হতে হয়। অসম্মতির বোধ। এই বোধটা যে পরিস্থিতিতে তৈরী হয় যে পরিপ্রেক্ষিতে সেটাই একটা ধর্ষণমুখী পরি প্রেক্ষিত তৈরী করে। যদি সেই বোধ তৈরী না হয়, সেক্ষেত্রে সেই ধর্ষণকে কেবল শারিরীক নিপীড়ন হিসেবেই চিহ্নিত করা হতে পারে, যেমনটা বর্তমানে আমাদের দেশে হয়ে থাকে।

দাম্পত্য ধর্ষণ সম্ভব?

খুবই সম্ভব। বরং যে বোধটার কথা বলা হলো সেটাই তৈরি করা সম্ভব না। অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে। আমরা যতবেশি কথা বলব ততোবেশি এই বোধটা পরিস্কার হবে এবং রোজ যে অনেকেই এর শিকার হচ্ছেন সেটা বলার ক্ষেত্রে সরব হবেন, দ্বিধাহীনভাবে।

বিবাহিত নারীদের এ বিষয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলে অফিসিয়ালি সদুত্তর পাওয়া যায় না (ব্যতিক্রম আছে)। কারণ এখানে যাকে সে ‘ক্রিমিনাল’ হিসেবে জানে তার সাথে নানাবিধ কারণে তাকে একসাথে থাকতে হচ্ছ্ েফলে তার সরব হওয়ার সুযোগ কম। শিক্ষিত সমাজের একটা অংশ যারা নারী আন্দোলন ও অধিকার নিয়ে সরব তারা বলছেন দাম্পত্য ধর্ষণ সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের আইন বলছে সম্ভব না।

দাম্পত্য ধর্ষণ কি অপরাধ?

দাম্পত্য ধর্ষণ আমাদের দেশে এটা এখনও অপরাধ হিসেবে বিবেচানায় আসেনি। যতক্ষণ না এটাকে অপরাধ বিবেচনা করা যাবে ততক্ষণ নারী তার সাথে ঘটে যাওয়া এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলবে না। কারণ, সে নিজেও কনভিউজড থাকে, এটাকে অপরাধ বলে কিনা। তার সাথে যা ঘটছে তা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর তার জানা দরকার।

আমাদের দেশের কোন আইন এখনও এটাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নেয়নি। দাম্পত্য ধর্ষণ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী একটি অপরাধ এমনকি বেইজিং ঘোষণা ও প্ল্যাটফর্ম ফর একশন ওয়ানেও এটাকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

দাম্পত্য ধর্ষণকে অপরাধে অন্তভ’ক্ত করা দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ম্যাক্সিকো, আমেরিকা, ইংল্যা- যেমন আচে আমাদেও আশেপাশে আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া, নেপালের মতো দেশগুলোও কিন্তু এখন এটাকে অপরাধ বিবেচনায় নিতে শুরু করেছে।

কি পরিমাণ ঘটে তার কোন হিসাব আমরা রাখি না। আইসিডিডিআরবি ২০০৫ সালে একটি সার্ভে করেছিলো। যেখানে দেখা গেছে ৮০ শতাংশ স্বামীরা স্বীকার করছেন তারা একবারের জন্য হলেও ধর্ষণ করেছেন। এমনকি ৪০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন তারা কেবল মাত্র আনন্দ পাওয়ার জন্য স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছেন। আমাদের দেশে দাম্পত্য ধর্ষণের পরিমান কি ধরনের তার হিসেব রাখা এখনও নিয়মিত নয়। তবে নানাভাবে এর উল্লেখ করা শুরু হয়েছে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক এ- হেল্থ সার্ভে বলছে, ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর দ্বারা শারিরকি ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। আবার দেখুন, ধর্ষণ কিন্তু বলা হচ্ছে না। এরপর চার বছর পর ২০১১ সালে ভায়োলেন্স এগইন্সট ইউমেন সার্ভে বলছে, এক তৃতীয়াংশ নারী স্বামীর দ্বারা ধর্ষনের শিকার। মানে স্বামীর দ্বারা যে ধর্ষণ হচ্ছে এবং হওয়া সম্ভব সেটা আমরা বিবেচনায় নিতে শুরু করেছি।

দাম্পত্য ধর্ষণে ভিকটিমের ওপর কি ধরনের প্রভাব পড়ে?

যখন স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে ধর্ষণের বোধ তৈরী হয় কিন্তু বলার জায়গা থাকে না তখন তার ভিতর ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হয়। যেখান থেকে বের হওয়ার পথ হিসেবে বিচ্ছেদ একমাত্র সমাধান হয় বটে কিন্তু কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুযোগ নেই। সাধারণত যার মধ্যে ধর্ষনের বোধ তৈরী হয় তা ট্রমার পরিমান ’অপরিচিতদেও দ্বারা’ ধর্ষনের চেয়ে বেশি। কারণ সমাজ তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক সবচেয়ে নিরাপদ এবং ’বৈধ’। সেখানেও সে যখন নিরাপদ বোধ করে না তখন অন্যান্য সব সম্পর্কে সেই প্রভাব পড়ে। যার ফল স্বরুপ পরবর্তী প্রজন্মও প্রভাবিত হচ্ছে।

দাম্পত্য ধর্ষণকে স্বীকৃতি দিতে বিতর্ক কোথায়?

একশ্রেণীর মানুষ আছেন যারা আসলে কোনভাবেই দাম্পত্য সম্পকেৃ প্রশ্ন উঠুক তা চান না। এবং এই সম্পর্কে ধর্ষণ হতে পাওে এই ধারণা পোষণেও তাদেও আপত্তি আছে। কেননা স্বামী স্ত্রী যে স্তন্ত্র সত্তা হতে পাওে এটা তাদেও জ্ঞানচর্চায় নেই। তারা মনে করেন স্বামী যেভাবে চাইবেন সেভাবে আচরণ করতে না-পারার মতো কোন ঘটনা ঘটতে পাওে না। স্বামীর কোন আচরণ যদি আদৌ স্ত্রীর ভুল মনে হয় তাহলে সেটা গ্রহণ কওে নিয়ে স্বামীকে বুঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু এই আচরণের জন্য স্বামীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার কোন কারণ নেই।

বাংলাদেশে নারীর জন্য আইনের কোন অভাব নেই অনেক আইন নারীর অধিকার রক্ষার জন্য। কিন্তু এতো সুরক্ষার মধ্যেও নারী প্রতিকার পাচ্ছে কিনা, ৯৬ % মামলায় আমরা নিম্ন আদালতেই নিষ্পত্তি হতে দেখি, কোন বিচার ছাড়াই।

লক্ষ করবেন, নারীর অধিকার প্রশ্নে যখনই আইন হয়েছে সেটা পুরুষের জন্য ক্ষতিকর এই প্রপাগা-া চালানো হয়। নারী সেটার ভুল/মিথ্যা প্রয়োগ করবে, সুযোগ নিবে। নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ক্ষেত্রেও এমন প্রপাগা-া ছিলো। কিন্তু যদি পুরুষ নিদেৃাষ প্রমানিত হয় সেক্ষেত্রে সেই নারীর শাস্তির নজিরতো আমরা দেখি। ফলে ওই জায়গায় আটকে না থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই বিষয়ে কথা বলতে শেখাটা জরুরি।

ধর্ষণ বা ধর্ষণের শিকার বিষয়টি নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়

আমি যখন নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলি তখন এটা স্পষ্টতই মনে রাখতে হয়, পুরুষের অধিকার ক্ষুন্ন কওে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়। যদি কোন পুরুষ দাবি করেন তিনি ধর্ষনের শিকার হয়েছেন তবে তাকে প্রতিযোগিতায় না নেমে প্রতিবাদে সামিল হওয়ার আহ্বান জানাই। নারীরাও পুরুষদের ধর্ষণ করে না ভেবে খোদ দাম্পত্য ধর্ষনের বিষয়টিতে মনোযোগ দিয়ে সেটিকে আইনি কাঠামোর ভিতর ফেলার জন্য গঠনমূলক কাজ করাই আপাতত লক্ষ্য হওয়া দরকার।

কেন দাম্পত্য সম্পর্কে ধারাবাহিক ধর্ষণের অনুূভূতির পরও একসাথে থাকা

ধরুন কারোর ভিতরে দাম্পত্য সম্পর্কে ধর্ষণের অনুভূতি জন্ম নিয়েছে এবং তাকে তারপরও সেই সম্পর্ক চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কেন? এর নানা ধরনের কারণ থাকতে পারে তবে যেগুলো সাধারণত মোটা দাগে লক্ষ করা যায় তাহলো, এই অনুভূতির পরও একসাথে থাকতে হচ্ছে সামাজিক চাপ এড়াতে, খারাপ মেয়ের তকমা যেন গায়ে না লাগে সেইটা সামলে উঠতে, আসলে তার সাথে কি ঘটছে সেটা ঠিকঠাক বুঝতে না পারার কারণে, অর্থাৎ যদি দাম্পত্য ধর্ষণের সংজ্ঞা এবং আচরণ এবং করণীয় তার জানা থাকতো তাহলে সে এই না-বোঝার মধ্যে থাকতো না।

শুরুতে যে ধর্ষণের চার্ট দেখানো হয়েছিলো সেটা আদৌ আমাদের দেশের সার্বিক ধর্ষণের চিত্র নয়। এটা একটি সমীক্ষা মাত্র। কতগুলো বর্গ করে কেবল পত্রিকায় প্রকাশিত একটা অংশ মাত্র। এই পরিস্থিতিতে দাম্পত্য ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা, সরব হওয়া শুরু করাটাই চ্যালেঞ্জ। দাম্পত্য ধর্ষণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ না হওয়ার কারণে এখনও দাম্পত্য ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে আমার সুপারিশ দাম্পত্য ধর্ষণ নিয়ে কথা বলুন, কথা বলুন এবং কথা বলুন।

*লেখাটি বাংলাট্রিবিউনের আয়োজনে গোলটেবিল বৈঠকে সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ সূচনা-বক্তব্য হিসেবে পাঠ করা হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.